দেশের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রস্তাব গৃহীত
ফেব্রুয়ারিতে গণভোট ও জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণা
দিলেও সরকার আশানুরূপ পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেনি
জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা জামায়াতে ইসলামীকে বর্তমান অবস্থায় পৌঁছাতে বিশেষভাবে সাহায্য করেছেন। এ জন্য তিনি মহান আল্লাহর অশেষ শুকরিয় আদায় ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, জামায়াতে ইসলামী ১৯৪১ সালে কার্যক্রম শুরুর পর অনেক বাধার সম্মুখীন হয়েছে, এখনো হচ্ছে। হকের পথে চললে বাধা আসবেই। রাসূল (সা.) এর প্রতি সাহাবায়ে কেরামের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আনুগত্য প্রশ্নাতীত ছিল। তাঁরা আল্লাহর ওয়াস্তে রাসূল (সা.) এর প্রতি সর্বোচ্চ কুরবানির নজরানা পেশ করেছেন। গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর মগবাজারস্থ আল-ফালাহ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সমাপনী অধিবেশনে বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আমীরে জামায়াত বলেন, বিভিন্ন ফেতনা-ফ্যাসাদের বিষয়ে আল্লাহর বিধান ও রাসূল (সা.) এর সুন্নাতের আলোকে সাহাবায়ে কেরাম যে ভূমিকা পালন করেছেন আমাদেরকে সে নীতি, পদ্ধতি ও ঐতিহ্য অনুসরণ করে চলতে হবে। আল কুরআন তিলাওয়াত বিশুদ্ধভাবে শেখার ব্যাপারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। কুরআন মেনে চলার ব্যাপারে এটাই প্রথম পদক্ষেপ। তিনি বলেন, পারস্পরিক সম্প্রতি ও দায়িত্ববোধের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সচেতন থাকতে হবে। আমাদের সকল ক্ষেত্রেই দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্য সুদ, ঘুষসহ যা হারাম করেছেন তা বর্জন করতে হবে।
বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য প্রদান করার ব্যাপারে কোনো কোনো সময় কেউ কেউ সংগঠন ও আন্দোলনের প্রতিষ্ঠিত নীতি ও পদ্ধতির পরিপন্থি ভূমিকা পালন করেন, তাদেরকে সতর্ক ও সাবধান হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। খলিফাতুল মুসলিমীন হযরত ওমর (রা.) হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) এর ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন, তা থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করে চলতে হবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দুনিয়ার সকল ইসলামী আন্দোলন ও সংগঠন বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনের দিকে গভীর আবেগ ও আস্থার সাথে তাকিয়ে আছে। আমাদের এ বিষয়ে সতর্ক থেকেই সামনে এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তি হল ইসলামী নীতি ও আদর্শ। আমাদের নৈতিকতার বন্ধন যেন কখনো শিথিল না হয় সেদিকে নজর দিতে হবে। ভালো ও নেক কাজের ব্যাপারে আমরা প্রতিযোগিতা করবো। খারাপ কাজ থেকে সবসময়ই দূরে থাকব। ইসলামী আন্দোলনকে বিজয়ী করার জন্য আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী আর্থিক কুরবানী করতে হবে। যে কোন ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ও অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণ করতে হবে এবং বুদ্ধিমত্তা ও সাহসের সাথে সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যেতে হবে। সমাপনী বক্তব্য শেষে আমীরে জামায়াত সবাইকে নিয়ে দেশ এবং জাতির সার্বিক মুক্তি ও কল্যাণের জন্য আল্লাহর কাছে কান্না জড়িত কণ্ঠে দোয়া করেন।
মজলিসে শূরার অধিবেশনে মুহ্তারাম আমীরে জামায়াতের পরিচালনায় ১ম ও ২য় পর্যায়ে কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার নির্বাচিত সদস্যগণ শপথ গ্রহণ করেন। এছাড়া জনাব এটিএম আজহারুল ইসলাম কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। আমীরে জামায়াত মজলিসে শূরার সাথে পরামর্শ করে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান না হওয়া পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ বিগত সেশনে যিনি যে দায়িত্বে ছিলেন সেই দায়িত্ব পালনের জন্য নির্দেশনা প্রদান করেন।
সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রস্তাব গৃহীত : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার বার্ষিক অধিবেশন গতকাল শনিবার সংগঠনের আমীর ডা. শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে মগবাজারস্থ আল-ফালাহ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দেশে বিরাজমান সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে নিম্নোক্ত প্রস্তাব গৃহীত হয়:- বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার এ অধিবেশন গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছে যে, সরকার আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে একই দিন গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার কথা ঘোষণা করলেও অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার মত আশানুরূপ পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেনি।
উল্লেখ্য যে, দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য বর্তমান সরকারের দায়িত্ব নির্বাচনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ ৮ দলের পক্ষ থেকে নির্বাচনের পূর্বে গণভোট, পিআর পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন, পলাতক আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের গণহত্যা, দুর্নীতিসহ জুলুম-নির্যাতনের বিচার, জাতীয় পার্টিসহ ১৪ দলের কার্যক্রম স্থগিত করে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য নির্বাচনী মাঠ সমতল করার দাবি জানিয়েছিল। কিন্তু সরকার ৮ দলের সে দাবি পাশ কাটিয়ে গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন একই দিনে অনুষ্ঠিত করার ঘোষণা দিয়ে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। জুলাই ঘোষণার ভিত্তি হল গণভোট। গণভোটে জুলাই সনদ পাশ হলেই তার আইনি ভিত্তি রচিত হবে এবং সেই জুলাই সনদের ভিত্তিতেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। একই দিনে গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন হলে গণভোটের ফলাফল কী আগে ঘোষণা করা হবে? নাকি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল আগে ঘোষণা করা হবে? যদি গণভোটের ফলাফল আগে ঘোষণা করা হয় এবং তাতে যদি ‘না’ ভোট জয়ী হয় তাহলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কি হবে? একটি বড় দলের কেউ কেউ ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন। অন্যদিকে পরাজিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ, জাপাসহ ১৪ দল, সিপিবিসহ কিছু বাম দল ইতোমধ্যেই ‘না’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা গণভোটে সংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোটকে বিজয়ী করার জন্য দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার এ সম্মেলন মনে করে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও কালো টাকার প্রভাব মুক্ত করে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে টেকসই করে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার জন্য পিআর পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কোন বিকল্প নেই। জামায়াতে ইসলামী পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনের দাবিতে এখনো অটল আছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোট ও পিআর পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং আওয়ামী লীগ, জাপাসহ ১৪ দলের রাজনীতি স্থগিত করার দাবি মেনে নেয়ার জন্য জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সরকারের নিকট জোর দাবি জানাচ্ছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার এ অধিবেশন উদ্বেগের সাথে আরও লক্ষ্য করছে যে, ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের নেতাদের বিচার চলাকালে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক তৎপরতা স্থগিত করা হলেও তারা তাদের শরিক দল জাপাসহ ১৪ দলের অপতৎপরতা থেমে নেই। তারা নানাভাবে গোপনে ও প্রকাশ্যে তাদের ফ্যাসিবাদী কর্মকা-ের তৎপরতা অব্যাহত রেখে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটিয়ে নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। এমনকি জাতীয় পার্টির নেতারা বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে টকশোতে অংশগ্রহণ করে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। আওয়ামী লীগ জাপাসহ ১৪ দলের সন্ত্রাসীরা একটি বড় দলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থেকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে। দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ এখনো সরকার সৃষ্টি করতে পারেনি। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক হত্যা, খুন-খারাবি অব্যাহত আছে।
গত ২৭ নভেম্বর পাবনা জেলার ঈশ^রদীতে জামায়াতের মিছিলে বিএনপির সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্রসহ বিভিন্ন অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে হামলা চালিয়ে জামায়াতে ইসলামীর ৬০/৭০ জন নেতাকর্মীকে আহত করেছে। অনেকের অবস্থাই মারাত্মক। ঐ ঘটনায় দৈনিক দেশ বুলেটিনের ঈশ^রদী প্রতিনিধি সাঈদ হাসানও হামলাকারীদের হাত থেকে রেহাই পায়নি। ঈশ^রদী থানার ওসির বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও সাম্প্রতিক সময় চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ, নোয়াখালী সদর, জামালপুরের মেলান্দহ, ফেনী সদর, নওগাঁ সদর, লক্ষ্মীপুর সদর, নারায়গঞ্জের আড়াই হাজার, মৌলভীবাজারের বড়লেখা, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট, ঝিনাইদহের মহেশপুরসহ বিভিন্ন স্থানে জামায়াত নেতাকর্মীদের উপর বিএনপির সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়েছে। এমনকি তারা জামায়াতের মহিলা কর্মীদের দাওয়াতি কাজেও বাধা দিচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কিভাবে আশা করা যায়? এ থেকেই প্রমাণিত হয় যে, সরকার এখনও নির্বাচনের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেনি।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করছে যে, পাবনার ঈশ^রদীতে জেলা আমীরসহ জামায়াতের লোকদের উপর বিএনপির সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা করেছে। অথচ দু’একটি পত্রিকায় আজ ২৯ নভেম্বর প্রকাশিত রিপোর্টে লেখা হয়েছে যে, ‘পাবনার ঈশ্বরদীতে পিস্তল হাতে ভাইরাল যুবক জামায়াত কর্মী’। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা এ ধরনের ভিত্তিহীন ও মিথ্যা তথ্য সন্ত্রাসের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে এ ধরনের তথ্য সন্ত্রাস চালানো থেকে বিরত থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট পত্রিকা কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা অভিমত ব্যক্ত করছে যে, নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য অবিলম্বে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের তালিকা তৈরি করে তাদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে হবে এবং সকল অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে।
আমরা সম্প্রতি লক্ষ্য করছি যে, মানিকগঞ্জের আবুল সরকার নামক একজন বাউল আল্লাহ এবং রাসূল (সা.) সম্পর্কে গর্হিত অন্যায় ও অশ্লীল মন্তব্য করে এ দেশের মুসলিম জনগণের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছে। তার পরিপ্রেক্ষিতে জনগণের আন্দোলনের মুখে সরকার তাকে গ্রেফতার করতে বাধ্য হয়েছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, বাউল আবুল সরকার পলাতক আওয়ামী লীগের দোসর। তাকে অবশ্যই উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে। তার পক্ষ নিয়ে কিছু লোক দেশে পরিকল্পিতভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তাদের এ ধরনের অপতৎপরতা বন্ধ করার জন্য বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সরকারের নিকট জোর দাবি জানাচ্ছে। জনগণের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার এ অধিবেশন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ ৮ দলের ৫ দফা গণদাবি মেনে নিয়ে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সরকারের নিকট জোর দাবি জানাচ্ছে। প্রেস বিজ্ঞপ্তি