সংসদ রিপোর্টার
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যবৃন্দ গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনে শপথ গ্রহণ করেছেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন জাতীয় সংসদ ভবনে অবস্থিত শপথ কক্ষে শপথ পাঠ করান। তিন ধাপে অনুষ্ঠিত শপথ অনুষ্ঠানে প্রথম ধাপে তারেক রহমান, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মির্জা আব্বাসসহ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যবৃন্দ সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তবে তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেননি। সেই সাথে বিএনপির মিত্র গণঅধিকার পরিষদ ও গণসংহতি আন্দোলনের দুইজনও এ শপথ নেননি।
এরপর দ্বিতীয় ধাপে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানসহ দলীয় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যবৃন্দ সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানাসহ স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যগণ সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
সর্বশেষ তৃতীয় ধাপে নাহিদ ইসলাম, আবুল হাসনাত, আখতার হোসেনসহ জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যবৃন্দ সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এরপর অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা শপথ নেন।
গতকাল মঙ্গলবার সকালে ১০টা ৪০ মিনিটে জাতীয় সংসদের শপথ কক্ষে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান শুরু হয় কুরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে।
প্রথমে নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপির নির্বাচিত প্রার্থীদের সংসদ সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করান প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন।
দেশের আইনসভার সদস্যরা তাদের দায়িত্ব পালনের শপথ নেন আগের সংসদের স্পিকারের কাছ থেকে। তবে চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেছেন, ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু হত্যা মামলায় কারাগারে। সে কারণে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা এবার শপথ নিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছ থেকে।
বিএনপির নবনির্বাচিতরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন না বলে অনুষ্ঠান শুরুর আগেই ঘোষণা দেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদ।
বিএনপির সিদ্ধান্ত তুলে ধরে সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত নেই বলে বিএনপির সংসদ সদস্যরা এ পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন না।
তিনি বলেন, আমরা কেউ সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হইনি এবং সংবিধানে এটা এখনও ধারণ করা হয়নি। গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হলে, সেটা সংবিধানে আগে ধারণ করতে হবে এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যকে শপথ নেওয়াবেন, সেটা বিধান করতে হবে এবং কোনো রকম ফর্মÑএটা সংবিধানে নেই।”
সাদা একটি ফর্ম দেখিয়ে তিনি বলেন, “এই ফর্মটি তৃতীয় তফসিলে আছে, সাদাটা। এই রকম তখন একটা ফর্ম সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে আসবে। সেগুলো সাংবিধানিকভাবে জাতীয় সংসদে গৃহীত হওয়ার পরে তখন জাতীয় সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ নেওয়ার বিধান করা যাবে বিধায় আমরা এখন সাংবিধানিকভাবে এই পর্যন্ত এসেছি।”
দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা তুলে ধরে সালাহউদ্দিন বলেন, বিএনপি সংবিধান মেনে চলছে এবং আগামী দিনেও চলবে।
সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়ে বের হয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীও সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন।
তিনি বলেন, এটাতো সাংবিধানিকভাবে করতে হবে। সংবিধান পরিবর্তনের আগে সেটা এই মুহূর্তে করার সুযোগ নেই। সাংবিধানিকভাবে সংসদ চলতে হবে তো।
বেলা সোয়া ১২টায় জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিতরা শপথ অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে অংশ নেন। তারা এমপি ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যের শপথ নেন। দেরি করে আসায় ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেনও তাদের সঙ্গে দ্বিতীয় পর্বের শপথে অংশ নেন।
১২টা ২২ মিনিটে সংসদ সদস্য হিসেবে তারা শপথ নেন। ১২টা ২৪ মিনিটে শপথপত্রের নির্ধারিত স্থানে স্বাক্ষর করেন তারা। ১২টা ২৭ মিনিটে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে তাদের শপথ শুরু হয়।
তবে এর আগে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিয়েই শপথকক্ষ ত্যাগ করেন রুমিন ফারহানা ও ইশরাক।
সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের শপথবাক্যে বলা হয়, “আমি (সদস্যগণের নিজ নাম) সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্য হিসেবে সশ্রদ্ধচিত্তে শপথ করিতেছি যে, আমি যে কর্তব্যভার গ্রহণ করিতে যাইতেছি তাহা আইন অনুযায়ী ও বিশ্বস্ততার সহিত পালন করিব। আমি বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষণ করিব এবং পরিষদ সদস্যরূপে আমার কর্তব্য পালনকে ব্যক্তিগত স্বার্থের দ্বারা প্রভাবিত হইতে দেব না।”
সংসদের শপথ কক্ষে তৃতীয় পর্বে দুপুর ১টা ২২ মিনিটে প্রথমে ত্রয়োদশ সংসদের সদস্য হিসেব শপথ নেন এনসিপির নির্বাচিত ছয়জন। ১টা ২৫ মিনিটে তাদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ পড়ান সিইসি।
সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি নূর ও সাকি
সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যের শপথ নেননি বিএনপির মিত্র গণঅধিকার পরিষদ ও গণসংহতি আন্দোলনের দুইজন।
দুপুর ১ টা ৩৫ মিনিটে চতুর্থ দফায় পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসনে নির্বাচিত গণঅধিকারের সভাপতি নুরুল হক নূরসহ মোট ছয়জন নির্বাচিত প্রার্থী সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। তবে তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি।
এরপর বেলা পৌনে ২টায় পঞ্চম দফায় সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ (বাঞ্ছারামপুর) আসন থেকে নির্বাচিত গণসংহতির প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি। তিনিও সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি।
৩৫ বছর পর ফের শপথ পড়ালেন সিইসি
স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার না থাকায় এবং রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তি কেউ নির্ধারিত না হওয়ায় সংবিধান মেনে এবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ান।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী বলেন, এরশাদ সরকারের পতনের পর প্রধান বিচারপতি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন; তখন সিইসি ছিলেন বিচারপতি আব্দুর রউফ। পঞ্চম সংসদ নির্বাচনের পর বিবদমান পরিস্থিতিতে নবনির্বাচিতদের সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ পাঠ করান তৎকালীন সিইসি। এরপর এবার একইভাবে সিইসি শপথ পাঠ করালেন।
ইসির সাবেক কর্মকর্তা মিহির সারওয়ার মোর্শেদ বলেন, ১৯৯১ সালে তখন স্পিকার ছিলেন মো. শামসুল হুদা চৌধুরী। আওয়ামী লীগ তার অধীনে শপথ নিলেও বিএনপি আপত্তি জানিয়েছিল-স্বৈরাচারের স্পিকারের অধীনে কোনো শপথ তারা নেবে না।
স্বৈরাচারের ‘দোসর’ হিসেবে তখনকার স্পিকারের কাছে বিএনপি শপথ নিতে রাজি না হওয়ায় আদালতের মতামত নেওয়া হয়। তখন সিইসি শপথ পড়ান।
৩৫ বছর পর আবার সিইসির কাছেই শপথ নিলেন বিএনপির নির্বাচিতরা। এবার সিইসি সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ-এ দুটি পদের শপথ পাঠ করিয়েছেন। তবে বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি।
জাতীয় সংসদের সচিব কানিজ মওলা শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। পবিত্র কুরআন থেকে তেলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। জাতীয় সংসদের সিনিয়র ইমাম কারী মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ এবং আবু রায়হান কুরআন তেলাওয়াত করেন।
উল্লেখ্য যে, শপথ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর ২০৮ জন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ৬৮ জন, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর ৬ জন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর ১ জন, খেলাফত মজলিস-এর ১ জন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস-এর ২ জন, জাতীয় পার্টি বিজেপি-এর ১ জন ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ৭ জন শপথ কক্ষে শপথ গ্রহণ করেন।
শপথ শেষে রীতি অনুযায়ী নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যগণ শপথ বইয়ে স্বাক্ষর করেন। এ সময়ে সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।