ছুটি কাটিয়ে ঈদের খুশি নিয়ে কর্মস্থলে ফিরছে কর্মজীবী মানুষ। বিশেষ করে বেসরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ীসহ স্বল্প আয়ের মানুষ কাজের তাগিদে ঢাকায় ফিরছে। পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটি কাটিয়ে ঢাকায় ফেরা মানুষজন এবারের ঈদ যাত্রা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
গতকাল বুধবার সকাল থেকে দেশের বিভিন্ন জেলার বাসগুলো যাত্রী নিয়ে সায়েদাবাদ, গাবতলি, কল্যাণপুর, মহাখালী আন্তঃজেলা টার্মিনালে আসে। তবে বাসগুলোতে যাত্রীদের চাপ তেমন ছিল না।
পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা বলছেন , এবার ঈদে টানা নয়দিনের ছুটি পেয়েছেন সরকারি চাকরিজীবীরা। আবার বেসরকারি চাকরিজীবীদের অনেকে গড়ে চারদিন ছুটি পেয়েছেন। তারা আগামী শুক্রবার থেকে ঢাকায় ফেরা শুরু করবেন। এরমধ্যে যাদের ছুটি আরও কম, তারা বুধবার থেকেই ঢাকায় আসছেন। তাদের যাতায়াতে যানজটসহ অন্য কোনো ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে না।
সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে ঢাকায় ফেরার যাত্রী বেশি দেখা গেছে। মহাখালী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল থেকে ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, জামালপুর, কিশোরগঞ্জ, সিলেট, সুনামগঞ্জ, বগুড়া রুটে যাত্রীরা যাতায়াত করেন। অপরদিকে সায়েদাবাদ বাস টর্মিনালে চট্রগ্রাম বিভাগ ও সিলেট বিভাগের জেলাগুলো এছাড়া ঢাকা বিভাগের কয়েকটি জেলার বাস যাতায়াত করে থাকে ।
বুধবার সরেজমিনে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বাসে সায়েদাবাদ ,মহাখালী টার্মিনাল তথা ঢাকায় ফিরছেন লোকজন। অনেকে আবার পরিবার ছাড়াই ঢাকায় ফিরছেন। এসব যাত্রীদের অধিকাংশই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকুরে বলে জানা গেছে।
ময়মনসিংহ সদর থেকে ইউনাইটেড ট্রান্সপোর্টে ঢাকায় ফেরেন মেহেদী হাসান। তিনি কারওয়ান বাজারে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চাকরি করেন। আলাপকালে তিনি বলেন, ঈদ উপলক্ষে চারদিনের ছুটি পেয়েছি। গ্রামে পরিবারের সঙ্গে ঈদ করেছি। আনন্দ করেছি। আগামীকাল থেকে অফিস খোলা। তাই ঢাকা ফিরতে হয়েছে।
সকালে টাঙ্গাইল থেকে রওয়ানা দিয়ে দুপুরে ঢাকায় ফিরেছেন বিনিময় বাসের চালক রুস্তম আলী। তিনি বলেন, এবার ঈদযাত্রায় সড়কে যানজট ছিল না। যাত্রী পরিবহন করে খুবই ভালো লাগছে। যাত্রীরাও সন্তুষ্ট। এখন ফেরার পথেও সড়কে যানজট নেই। বুধবার যারা ঢাকা ফিরেছেন, তাদের অধিকাংশ চাকরিজীবী। বৃহস্পতিবার বা পরদিন শুক্রবার ঢাকা ফেরা যাত্রীর সংখ্যা বাড়বে।
ঢাকা-হালুয়াঘাট-ঢাকা রুটে নিয়মিত যাত্রী পরিবহন করে শ্যামলী বাংলা। এ বাসে যাত্রীদের একজন শাহীন আহমেদ। তিনি ধানমন্ডির একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। শ্যামলী বাংলা পরিবহন থেকে নামেন মহাখালীর আমতলীতে।
ঈদ উদযাপন সম্পর্কে জানতে চাইলে শাহীন বলেন, অন্য যেকোনো বছরের তুলনায় এবার ঈদযাত্রা স্বস্তির ছিল। পরিবারের সঙ্গে ঈদ করে এখন ঢাকায় ফিরছি। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে কর্মস্থলে যোগ দেবো।
আকাশপথে কক্সবাজার ও ঢাকামুখী যাত্রীর চাপ
এদিকে ঈদুল ফিতরের তৃতীয় দিনে আকাশপথে ঢাকামুখী যাত্রীদের চাপ বেড়েছে। যাত্রীচাপ আছে পর্যটন নগরী কক্সবাজারেও। আগাম যারা টিকিট কেটেছিলেন তারাই বুধবার দিনভর যাতায়াত করছেন। বুধবার বিকেলে এয়ারলাইন্স খোজ নিয়ে এসব তথ্য জানা গেছে। এবার ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটি মিলেছে। আগামী সপ্তাহে অফিসগুলো খুলবে। লম্বা ছুটি পেয়ে গ্রামে যাওয়া অনেকে বুধবার ফিরে আসছেন ঢাকায়। আবার কেউ কেউ ঢাকায় ফিরে ঘুরতে যাচ্ছেন কক্সবাজারে।
দেশের অন্য জেলাগুলো থেকে সরাসরি কক্সবাজার রুটে ফ্লাইট না থাকায় কেউ কেউ প্রথমে ঢাকা এসে পরে ফ্লাইট বদলে কক্সবাজার যাচ্ছেন। সবমিলে বুধবার আকাশপথে ঢাকায় ফেরার চাপ আছে। উত্তরের জেলা সৈয়দপুর ও রাজশাহী থেকে বিমানে ঢাকায় ফেরার বেশি তাড়া লক্ষ্য করা গেছে।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) কামরুল ইসলাম বলেন, আমাদের কক্সবাজার রুটে আজ বাড়তি ফ্লাইট নেই। এরপরও যাত্রী চাপ রয়েছে। তবে ঢাকায় ফেরার যাত্রীর চাপ রয়েছে।ঈদ পরবর্তী সময়ে এবার কক্সাবাজার রুটেও বাড়তি ফ্লাইট চালাচ্ছে না বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স।
ঈদ উদযাপন করে ট্রেনে চড়ে ঢাকায় ফিরছে মানুষ। বুধবার ভোর থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঢাকাগামী ট্রেন ছেড়ে আসতে শুরু করে। দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত ফিরতি যাত্রার যাত্রী নিয়ে ঢাকায় ফিরেছে ৮টি আন্তঃনগর ট্রেন।তবে ঈদের ছুটি শেষ না হওয়ায় ফিরতি ট্রেনে যাত্রীদের তেমন ভিড় নেই। কোনো শিডিউল বিপর্যয়ও নেই। এতে ঢাকায় ফেরা যাত্রীরা স্বস্তির যাত্রার কথা জানিয়েছেন।
ট্রেনে এখনো ফেরার চেয়ে ঢাকা ছাড়ছে বেশি মানুষ
অন্যদিকে, ঈদের তৃতীয় দিনেও ঢাকা থেকে অনেক মানুষ গ্রামে যাচ্ছেন। তাদের অধিকাংশই হয়তো ঈদে ছুটি পাননি, কিংবা বিশেষ কারণে যেতে পারেননি। এখন তারা পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপনে যাচ্ছেন। বুধবার দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশন ঘুরে এমন চিত্র দেখা যায়। স্টেশনে দায়িত্বরত কর্মকর্তারা জানান, বুধবার ভোর থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত ফিরতি যাত্রায় ঢাকায় এসেছে ৮টি আন্তঃনগর ট্রেন।অন্যদিকে সকাল ৬টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত ঢাকা থেকে সারাদেশে বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে গেছে ১৯টি ট্রেন। এগুলোর মধ্যে ১৫টি আন্তঃনগর এবং চারটি কমিউটার ট্রেন। ভিড়-বিলম্ব না থাকায় ফিরতি যাত্রায়ও স্বস্তি। ঈদযাত্রার মতো ট্রেনে ফিরতি যাত্রায় স্বস্তির কথা জানিয়েছেন যাত্রীরা। শিডিউল বিপর্যয় এবং ভিড়ে ঠেলাঠেলি করার মতো পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি তাদের।
দুপুর পৌনে ২টার দিকে সিল্কসিটি ট্রেনে চাটমোহর থেকে ঢাকায় ফেরা শাহীন আলম বলেন, ট্রেন একেবারে রাইট টাইমে এসেছে। কোনো ভিড় নেই। হ্যাসেল ফ্রি। এমন ভোগান্তিহীন যাত্রা করা গেলে ভাড়া কিছুটা বেশি নিলেও সমস্যা নেই।
দুই মেয়ে এবং স্ত্রীকে নিয়ে রাজশাহী থেকে ঢাকায় ফেরা আসাদুজ্জামান খান বলেন, ছুটি শেষ হয়নি। তবুও আগেই চলে এলাম। পরে ভিড় আরও বাড়তে পারে, সেজন্য ফিরতি যাত্রার টিকিট আগেই করে রেখেছিলাম। নিরিবিলি বাচ্চাদের নিয়ে আসতে পারলাম
এদিকে, ঈদের তৃতীয় দিনেও ঢাকা থেকে গ্রামের উদ্দেশ্যে যাচ্ছে অনেক মানুষ। তাদের অনেকে ঈদে ছুটি পাননি। অনেকে আবার বিশেষ কারণে যেতে পারেননি।
চট্টগ্রাম অভিমুখী সুবর্ণ এক্সপ্রেসে ঢাকা থেকে নিজ গ্রামে যাচ্ছেন আসমা আক্তার। তিনি একটি পোশাকের শো-রুমে বিক্রয়কর্মীর কাজ করেন। ঈদের আগেরদিন অর্থাৎ চাঁদরাতেও কাজ করতে হয়েছে। ফলে ঈদে গ্রামে পরিবারের কাছে যেতে পারেননি। মাঝে একদিন বিশ্রাম নিয়ে আজ গ্রামে ফিরছেন।
আসমা আক্তার বলেন, ঢাকায় সহকর্মীদের সঙ্গে ঈদ করেছি। এখন গ্রামে যাচ্ছি। ঈদের আগে ছুটি ছিল না। ঈদের পর থেকে ছুটি পেয়েছি। এক সপ্তাহের জন্য গ্রামে যাচ্ছি। ঈদে আমাদের ছুটিটা এমনই।
জানতে চাইলে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার শাহাদাত হোসেন বলেন, এবার ঈদযাত্রা একেবারেই ভোগান্তিহীন হয়েছে। ফিরতি যাত্রাও আশা করি স্বস্তিদায়কই হবে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। যাত্রীরা যাতে নিরাপদে ও স্বস্তিতে ফিরতে পারেন, সেটা নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।
তিনি বলেন, ফিরতি যাত্রাটা মূলত আজ শুরু হয়েছে। কিছু আন্তঃনগর ট্রেন গতকাল সন্ধ্যা বা রাত থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে এসেছিল। সেগুলো ভোরের দিকে পৌঁছেছে। এখনো যাত্রীদের তেমন ভিড় নেই। টিকিট ছাড়া কোনো যাত্রীকে ভ্রমণ করতে দেওয়া হচ্ছে না। ফলে বগিতে তেমন ঠেলাঠেলি বা গাদাগাদি নেই।