আলোচনা ছাড়াই এক তরফা আইন সংশোধন করে সংসদে উপস্থাপন ও আলোচনা ছাড়াই পাস করার প্রতিবাদে জাতীয় সংসদ থেকে ওয়াক আউট করেছে বিরোধী দল। শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা ৩৭ মিনিটের দিকে সংসদ অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করে তারা। ওয়াকআউটের আগে সরকারি দলের বিরুদ্ধে বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ তুলেন বিরোধীদলীয় নেতা। ওয়াকআউটের সময় শফিকুর রহমান বলেন, আজকে আমরা দুঃখ নিয়ে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করলাম। এর আগে বিরোধীদলীয় নেতা স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষতা হারানোর অভিযোগ তোলেন।
বিশেষ কমিটির বৈঠকের সমঝোতার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর বিল’ সংশোধিত আকারে পাসের প্রেক্ষাপটে উভয়পক্ষের দীর্ঘ বিতর্কের জের ধরে এ ওয়াকআউটের ঘটনা ঘটে। বিলটি পাসের সময় বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বেশ কিছু সংশোধনীর প্রস্তাব আনা হয়েছিল। কিন্তু স্পিকার সেই আপত্তি বা সংশোধনীগুলো গ্রহণ না করায় বিরোধীদলীয় নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং জোটসহ একযোগে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করার ঘোষণা দেন।
চলতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে এ নিয়ে চারবার ওয়াকআউট করলো বিরোধী দল। এর আগে সংসদ শুরুর দিন ১২ মার্চ প্রথমবার, ১ এপ্রিল দ্বিতীয়বার এবং গত ৯ এপ্রিল তৃতীয় দফায় বিভিন্ন ইস্যুতে তারা সংসদ কক্ষ ত্যাগ করেছিল। আজকের ঘটনাসহ তিন অধিবেশনে মোট চারবার এই প্রতিবাদী অবস্থান নিল বিরোধী দল।
সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘এখানে ট্রাস্ট মেইনটেইন (আস্থা বজায় রাখা) করা হয় না। এটা আমাদের দুঃখ। স্পিকার আপনি বলেছেন, জাস্টিস মেইনটেইন (ন্যায়বিচার বজায় রাখবেন) করবেন। আজকের দিনে আমরা জাস্টিস পেলাম না। সরকারিদল ট্রাস্টের জায়গা রাখলেন না। আমরা সহযোগিতা করেই যাচ্ছিলাম, কিন্তু আমাদের ব্ল্যাক আউট (বাধা দেওয়া) করা হলো।
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, বিশেষ কমিটিতে ৯৮টি অধ্যাদেশ কোনো পরিবর্তন ছাড়াই পাসের বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য হয়েছিল। কিন্তু বিলটি পাসের মাত্র ৩০ মিনিট আগে রহস্যজনকভাবে একটি সংশোধনী আনা হয়। সংশোধনীতে জাদুঘরের পরিচালনা পর্ষদের প্রধান হিসেবে বিশেষজ্ঞের পরিবর্তে সংস্কৃতিমন্ত্রীকে রাখার প্রস্তাব করা হয়।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এটি সরাসরি দলীয়করণের প্রতিফলন। আমরা চেয়েছিলাম সাহিত্য, ইতিহাস ও জাদুঘর বিশেষজ্ঞরা এটি পরিচালনা করবেন। এভাবে শেষ মুহূর্তে সমঝোতা ভেঙে সংশোধনী আনা রাজনৈতিক জোচ্চুরি।’ বিরোধিতার জবাবে সংস্কৃতি বিষয়কমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, ‘এই সংশোধনী সরকার আনেনি, এটি একজন বেসরকারি সদস্যের (আনিসুর রহমান) প্রস্তাব। আর পর্ষদের প্রধান হিসেবে মন্ত্রী থাকা একটি সাধারণ রেওয়াজ, এটি দলীয়করণ নয়।’
আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান যোগ করেন, ‘গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যেকোনো সদস্য সংশোধনী আনতে পারেন। এই সংশোধনীর মাধ্যমে সরকারকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যাতে পর্ষদের কেউ দুর্নীতি বা জুলাই অভ্যুত্থানের স্পিরিটবিরোধী কাজ করলে তাকে অপসারণ করা যায়।’
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান সরকারের এ অবস্থানে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আলোচনা ছাড়া শেষ মুহূর্তে সংশোধনী আনলে আস্থার সংকট তৈরি হয়। আজ রাত ১২টার মধ্যে অধ্যাদেশগুলো বিল হিসেবে পাস না হলে সেগুলো তামাদি হয়ে যাবে। আপনারা ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ (দুদক, মানবাধিকার কমিশন, তামাক নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি) আটকে রেখেছেন কেন?’
জবাবে আইনমন্ত্রী জানান, দুর্নীতি দমন কমিশন ও মানবাধিকার কমিশনসহ ১৬টি অধ্যাদেশকে আরও শক্তিশালী ও যুগোপযোগী করার জন্য আরও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এগুলো পরবর্তীতে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করেই আনা হবে।
আইনমন্ত্রীর আশ্বাসে সন্তুষ্ট হতে পারেনি বিরোধী দল। বিরোধীদলীয় নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বর্তমান সমঝোতাই যদি রক্ষা না হয়, তবে ভবিষ্যতের আলোচনার আশ্বাস অর্থহীন। আমাদের দাবির প্রতি সম্মান দেখানো হয়নি এবং স্বচ্ছতার অভাবে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।’ এই অভিযোগ তুলে তিনি বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সংসদ থেকে ওয়াকআউটের ঘোষণা দেন।
এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জুলাই গণঅভ্যুত্থান জাদুঘরের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘১৯৭১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত সব স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের ইতিহাস এখানে সংরক্ষিত থাকবে। এটি কোনো দলের নয়, এটি জাতির সম্পদ।
বিরোধী দলের অভিযোগ, সংসদের বিশেষ কমিটি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি হওয়া অধ্যাদেশ নিয়ে যে সমঝোতায় পৌঁছেছিল, সরকার তা মানেনি। বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল হুবহু পাসের সুপারিশ থাকার পরও অধিবেশনে ৮ ধারায় তিনটি সংশোধনী এনে তা সংশোধিত আকারে পাস করা হয়।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, নিয়ম অনুযায়ী তিন দিন আগে আমাদের ডকুমেন্টসগুলো দেওয়ার কথা ছিল। বাস্তবতা বিবেচনা করে ন্যূনতম এক দিন আগে দেওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিলটি যখন পাস হচ্ছে, তখন টেবিলে আমাদের কাগজ দেওয়া হয়েছে। একদিকে সংসদ চলছে, অন্যদিকে ডকুমেন্টস টেবিলে রাখা। আমরা তো অর্থনীতির ছাত্র নই, তাই এত দ্রুত এগুলো বুঝে ওঠা সম্ভব নয়। দুর্বল ছাত্র হওয়ার কারণে হাত উপরে তুলব না নিচে নামাব, সেটা বুঝতে পারিনি। না বুঝে ‘হ্যাঁ’ বলা যেমন অপরাধ, না বুঝে ‘না’ বলাও অপরাধ। এই অপরাধবোধ থেকেই আমরা চুপ থেকেছি।
জামায়াত আমীর বলেন, সরকারি দলের সদস্যরা হয়তো সবাই অর্থনীতির ছাত্র এবং অত্যন্ত মেধাবী। তারা কাগজ দেখামাত্রই বুঝে ফেলেছেন ভেতরে কী আছে। কিন্তু আমরা বুঝতে পারিনি, এটা আমাদের অক্ষমতা। এখন আমরা কী করব, আমাদের একটু পরামর্শ দিন।
বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংসদীয় বিশেষ কমিটিতে এই বিলগুলো পর্যালোচনার সময় বিরোধী দলের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। সেখানে সর্বসম্মতিক্রমে অধ্যাদেশগুলো বিল আকারে পাসের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। বিল পাস হয়ে যাওয়ার পর এখন কিছু বুঝলাম না বলা সাজে না। জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় চীফ হুইপ বলেন, মাত্র আধা ঘন্টা আগে আমাদের সংশোধনের ব্যাপারে জানানো হয়েছে। এভাবে আমাদের সাথে ছলচাতুরি এবং জোচ্চুরি করা হয়েছে।