বেগম খালেদা জিয়া। ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ হয়ে থাকবে একজন সংগ্রামী ও আপসহীন নেত্রীর প্রতীক হয়ে। গহীন আঁধার, মামলা, হামলা, বন্দীত্ব ও ষড়যন্ত্রের মধ্যে তার রাজনীতিতে টিকে থাকা নতুন দিনের সূর্যের মতোই ছিল। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, বাক স্বাধীনতাসহ দেশের মানুষের জন্য আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন তিনি। রাজপথে যেমনি বারবার হামলার শিকার হয়েছেন তেমনি শিকার হয়েছেন অসংখ্য মিথ্যা মামলাও। কথিক দূর্নীতির মামলায় তাকে নির্জন কারাগারেও আবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। বিশেষ করে গত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের আমলে তাকে অমানবিকভাবে হেনস্থা ও নির্যাতন করা হয়েছে।
একজন স্বামীকে হারিয়ে আসেন রাজনীতিতে, আরেকজন বাবাকে হারিয়ে। রাজনীতির অঙ্গনে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল শুরু থেকেই। তবে ক্রমে তা গড়ায় বৈরিতায়। ২০০৮ সালের পর সেই বৈরিতা নগ্নতায় রুপ নেয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খালেদা জিয়ার প্রতি ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আচরণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে অনেকটাই ব্যক্তিগত আক্রোশে রূপ নিয়েছিল, যার জেরে এক কাপড়ে সেনানিবাসের বাড়িছাড়া হতে হয় খালেদা জিয়াকে, বালুর ট্রাকে অবরুদ্ধ থাকতে হয় বাড়িতে, শেষে কারাগারেও যেতে হয়।
ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানে গত বছর ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর পাল্টে যায় দৃশ্যপট। খালেদা জিয়ার দেড় দশকের নিপীড়নের ঘটে অবসান। তারপর মুক্তি মিললেও অসুস্থতার কারণে রাজনীতিতে আগের মতো সক্রিয় আর হতে পারেননি বিএনপির চেয়ারপার্সন। ৭৯ বছরের জীবন পেরিয়ে গতকাল মঙ্গলবার চিরতরে বিদায় নিলেন তিনি। বিএনপি নেতারা অভিযোগ করে আসছেন, শেখ হাসিনার আমলে কারা নির্যাতনই খালেদা জিয়াকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী হলেও রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার বিচরণ ছিল না। ১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমান হত্যাকা-ের শিকার হওয়ার পরের বছর বিএনপিতে যোগ দেন তিনি। প্রথমে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারপার্সন হন, পরে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, শেষে চেয়ারপার্সনের দায়িত্ব নেন।
সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধের রাজপথের সেই সংগ্রামে নেমে খালেদা জিয়া গৃহবন্দীসহ নানা ধরনের নিপীড়নের মুখে পড়তে হয়েছিল। আবার ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পরও গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। এরপর ২০০৮ সালের মঈন ফখরুদ্দিনের জালিয়াতির নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে খালেদা জিযার বিরুদ্ধে শুরু হয় নির্যাতন।
২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতিতে খালেদা জিয়াকে। সেনানিবাসের ৬ শহীদ মইনুল রোডের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা বাংলাদেশের রাজনীতির এক বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ঘটনাটির সূচনা ২০০৯ সালের ৮ এপ্রিল, যখন তৎকালীন সরকার মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাড়িটির ইজারা বাতিল করে। সরকার দাবি করেছিল, ইজারা প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ছিল এবং সেনানিবাস এলাকার নিয়ম অনুযায়ী বাড়িটি রাজনৈতিক ব্যক্তিকে বরাদ্দ দেওয়া ছিল নিয়মবহির্ভূত। এই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই উচ্ছেদ-সংক্রান্ত নোটিশ জারি হয়। ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর সকালে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতিতে বাড়িটি খালি করার কাজ শুরু হয়। চারপাশে কড়া নিরাপত্তা, বাইরে বিএনপি সমর্থকদের উত্তেজনা এবং পরিবারের সদস্যদের ব্যথিত প্রস্থানÍসব মিলিয়ে দিনটি ছিল আবেগ ও রাজনৈতিক উত্তাপের। ওই দিন খালেদা জিয়াকে অনেকটা জোর করে বাড়ি থেকে বাইরে এনে গাড়িতে উঠিয়ে দেওয়া হয়। রাজনীতিকসহ নাগরিক সমাজ একে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে দেখেছেন। ব্যক্তিগত স্মৃতি, ইতিহাস, নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত মর্যাদার সঙ্গে জড়িত এই বাড়ি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া খালেদা জিয়ার জন্য ছিল গভীর মানবিক আঘাত, যা তার জন্য সবচেয়ে স্থায়ী ও বেদনাপূর্ণ দিক।
এক-এগারোর সরকারের আমলেই খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা হয়। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় ফিরে শেখ হাসিনা দ্রুতই খালেদা জিয়া ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে থাকা পুরোনো মামলাগুলো সক্রিয় করেন। শুধু মামলাগুলো সচল করা নয়Íতদন্ত, চার্জশিট, শুনানির তারিখ নির্ধারণ, এমনকি আদালতের বিশেষ ব্যবস্থাপনা সবকিছুই এমনভাবে সাজানো হয় যে তাতে বিরোধী নেত্রীকে ধাপে ধাপে কোণঠাসার করার প্রক্রিয়াটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায় ঘোষণার দিন আদালত এলাকায় সাংবাদিক ও কর্মীদের প্রবেশে বিধিনিষেধ, বিচারপতির বদলি এবং সরকারের প্রভাব নিয়ে ওঠা প্রশ্ন সবকিছুই রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থা প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের নজির হয়ে ওঠে। দীর্ঘমেয়াদি শাস্তি দিয়ে রাজনৈতিক মাঠ থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়াই ছিল মূল উদ্দেশ্যএমন অভিযোগ অনেক মানবাধিকার প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে।
২০১৮ সালে কারাদ-ের পর খালেদা জিয়াকে পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারের মহিলা ওয়ার্ডে রাখা হয়। ওই জায়গাটি কারাগার হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী ছিল না। পরিত্যক্ত ওই কারাগারে একমাত্র বন্দী হিসেবে ছিলেন তিনি। তার আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিসসহ নানা জটিল রোগ থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসায় ঢিলেমি, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সরবরাহে অনীহা, বারবার মেডিকেল বোর্ড পরিবর্তন এসব সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক শত্রুতারই ধারাবাহিকতা বলে মনে করা হয়।
রোগের তীব্রতা বেড়ে গেলে তাকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (পিজি) হাসপাতালে নেওয়া হলেও সেখানে ছিলেন নিরাপত্তাবলয় ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে। ২০২০ সালের ২৫ মার্চ কোভিড মহামারির শুরুতে দুই বছর ১ মাস ১৬ দিন পর তাকে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেওয়া হয়। গুলশানে নিজের বাসভবন ফিরোজায় ফিরলেও তিনি সেখানে ছিলেন গৃহবন্দী। বাইরে যাওয়া, রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ ছিল নিয়ন্ত্রিত। সভা-সমাবেশে অংশ নেওয়া বা দলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের অনুমতি ছিল না। বিএনপি, খালেদা জিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে উন্নত চিকিৎসার উদ্দেশে বিদেশে নেওয়ার অনুমতি চায় বহুবার, কিন্তু সরকার সাড়া দেয়নি। খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি দেওয়ার বিষয়ে চাপ বাড়লে ২০২৩ সালের অক্টোবরে লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার মেথডিস্ট সেন্ট্রাল হলে এক নাগরিক সংবর্ধনায় শেখ হাসিনা একটি মন্তব্য করেছিলেন, যা নিয়ে সমালোচনা ওঠে। শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘খালেদা জিয়ার বয়স এখন আশির ওপরে। রোজই শুনি এই মরে মরে, এই যায় যায়। বয়স তো আশির ওপরে। এমনিই তো সময় হয়ে গেছে। তাঁর মধ্যে অসুস্থ। এখানে এত কান্নাকাটি করে তো লাভ নাই।’
২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাস। সময়টা ছিল রাজনৈতিকভাবে উত্তেজনায় ঠাসা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ। বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল করে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করছে। এরই শেষ ধাপ হিসেবে বিএনপি ২৯ ডিসেম্বর ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ বা গণতন্ত্রের পদযাত্রা কর্মসূচি ঘোষণা করে। লক্ষ্য ছিল শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়। তবে সেই দিনের বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার ঢাকা ও সারা দেশকে কার্যত অবরুদ্ধ করে রাখে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিরোধীদের রাস্তায় নামতে দেয়নি। খালেদা জিয়ার বাসভবন ফিরোজার গেটের সামনে বালুর ট্রাক দিয়ে একটি শক্ত বেষ্টনী তৈরি করা হয়। এই বাধার কারণে তিনি নিজ বাসভবন থেকে বের হতে পারেননি। ওই দিন খালেদা জিয়াকে কিছুটা উত্তেজিত, অপমানিত দেখা যায়। পরে ২০১৫ সালে আবার বালুর ট্রাক রেখে গুলশানের কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করা হয়েছিল তাকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলেন, এই পরিস্থিতি কেবল একজন নারীনেত্রীর ওপর চাপ নয়, এটি ছিল রাজনৈতিক নিপীড়ন ও ক্ষমতার প্রদর্শন। সরকার এই কঠোর পদক্ষেপে মূলত প্রতিপক্ষকে নিস্তেজ করতে চেয়েছিল। তার স্বাভাবিক রাজনৈতিক কার্যক্রমকে সীমিত করে, জনগণের সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে রাজনৈতিক দমননীতি চালানো হয়েছিল। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে খালেদা জিয়া ছিলেন এক স্পষ্ট ‘ভিকটিম’।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মোট মামলা রয়েছে ৩৭টি। এর মধ্যে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় হয়েছে। বিচারের শেষ পর্যায়ে ছিল জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তাকে পাঁচ বছরের কারাদ- দেন নি¤œ আদালত। রায় ঘোষণার পরই তাকে পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। পরে খালেদা জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় ও আপিলে সাজা বাড়ানো হয়।
মামলাগুলোর মধ্যে পাঁচটি দুর্নীতি মামলা, চারটি মানহানির মামলা ও একটি রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা রয়েছে। বাকি মামলাগুলো হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও নাশকতার অভিযোগে। তার বিরুদ্ধে ঢাকা, কুমিল্লা ও খুলনায় বেশির ভাগ মামলা হয়েছে। মামলার মধ্যে রয়েছে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা, রাজধানীর দারুসসালাম থানায় ১১টি মামলা, রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানায় ৪টি মামলা, কুমিল্লায় ৩টি মামলা, রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে মামলা, নাইকো দুর্নীতি মামলা, গ্যাটকো দুর্নীতি মামলা, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি দুর্নীতি মামলা, গুলশানে বোমা হামলার অভিযোগে মামলা, মানহানির দুই মামলা, ৪২ জনকে হত্যার অভিযোগে মামলা, মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের নিয়ে কটাক্ষ, বঙ্গবন্ধুর অবদান প্রশ্নবিদ্ধ করার অভিযোগে মামলা, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও জাতিগত বিভেদ সৃষ্টির অভিযোগে দুই মামলা, নড়াইলে মানহানির মামলা, মিথ্যা’ জন্মদিন পালনের অভিযোগে মামলা বাংলাদেশের মানচিত্র, জাতীয় পতাকা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগে মামলা উল্লেখযোগ্য। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রায় ২৫ মাস কারাভোগের পর, করোনা মহামারির মধ্যে পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের নির্বাহী আদেশে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ তিনি বাসায় ফেরেন।