এইডস একটি নীরব ঘাতক। মানব সভ্যতাকে যে রোগগুলো হুমকির সম্মুখীন করে তুলেছে, তার মধ্যে এইডস অন্যতম। এ রোগের ভাইরাসে আক্রান্ত হলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যায়। তখন যেকোনো সংক্রামক জীবাণু সহজেই এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিকে আক্রমণ করতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে এ রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, যা স্বাস্থ্য খাতের জন্য নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এইচআইভি ভাইরাস ছড়ানোর প্রধান করেণগুলো হলো, এইচআইভি পজিটিভ ব্যক্তির সঙ্গে অনিরাপদ যেকোনো ধরনের যৌন মিলন। দূষিত রক্ত বা রক্তজাত পণ্য গ্রহণ। মাদক গ্রহণকারীরা একে অপরের ব্যবহৃত সুচ বা সিরিঞ্জ পুনরায় ব্যবহার করা। এইচআইভি আক্রান্ত মায়ের কাছ থেকে গর্ভাবস্থায়, প্রসবের সময় বা বুকের দুধ খাওয়ানো।

এদিকে দেশে এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা শুরুর আগেই ‘ভাইরাল লোড’ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এইডস ও এসটিডি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি (এনএএসসি)। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনা অনুযায়ী, এই পরীক্ষা করা উচিত ওষুধ শুরুর ছয় মাস বা এক বছর পর। এর ফলে অনেক সময় কীট এর মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। এজন্য অনেক ক্ষেত্রে আগেই কীট এর প্রয়োগ করা হয়। যা স্বাস্থ্য সম্মত নয়, বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

এইডস রোগের ইতিহাস মোটামুটিভাবে বিংশ শতাব্দীর শেষভাগের ঘটনা, যদিও এইচআইভি ভাইরাসটি তার অনেক আগে থেকেই মানবদেহে বিদ্যমান ছিল। বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, এইচআইভি ভাইরাসটি প্রথম ১৯২০-এর দশকে পশ্চিম আফ্রিকার শিম্পাাঞ্জি থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়েছিল। শিম্পাঞ্জির শরীরে সিমিয়ান ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস নামে একটি ভাইরাস ছিল, যা মানুষের শরীরে অভিযোজিত হয়ে এইচআইভিতে পরিণত হয়। এই ভাইরাসটি ধীরে ধীরে কয়েক দশক ধরে আফ্রিকাজুড়ে এবং পরবর্তীতে হাইতি ও অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু এই সময়ের মধ্যে রোগটি চিকিৎসকদের নজরে আসেনি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং ইউএনএইডসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশে প্রথম এইচআইভি রোগী শনাক্ত হওয়ার পর থেকে ৩০ নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত বাংলাদেশে এইডসে আক্রান্ত ব্যক্তির মোট সংখ্যা ১৭ হাজার ৪৮০। আর এ বছর ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত শনাক্ত ১ হাজার ৮৯১ জন। একই সময়ে দেশে এইডসে মারা গেছেন ২১৯ জন। দু-এক বছর এইডসে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা কমে গেলেও বেড়ে যাওয়ার প্রবণতাই ছিল বেশি। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, দেশে বর্তমানে প্রায় ১৬,৮৬৩ জন এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তি রয়েছে, যাদের মধ্যে অনেকে এখনও শনাক্ত হননি।

আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্টি অ্যালকোহল এর প্রেসিডেন্ট মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, এইচআইভি/এইডস একটি দীর্ঘস্থায়ী কিন্তু নিয়ন্ত্রণযোগ্য স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হয় এবং বিশ্বজুড়ে এর প্রতিরোধ ও নিরাময়ের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সচেতনতা এবং নিরাপদ জীবনধারা মেনে চলার মাধ্যমে এইচআইভি সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব। এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি সহানুভূতি দেখানো এবং সঠিক তথ্য প্রচার করা উচিত, যাতে তারা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা পেতে পারে।

জানা গেছে, দেশে এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা শুরুর আগেই ‘ভাইরাল লোড’ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এইডস ও এসটিডি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি (এনএএসসি)। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনা অনুযায়ী, এই পরীক্ষা করা উচিত ওষুধ শুরুর ছয় মাস বা এক বছর পর। বিশেষজ্ঞদের মতে, শনাক্তের পরপরই এই পরীক্ষা করা চিকিৎসা বিজ্ঞানের নৈতিক পরিপন্থি এবং এতে সরকারের অর্থের অপচয় হচ্ছে। অন্যদিকে রোগীদের ভোগান্তি বাড়ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভাইরাল লোড কিট কেনার পর তা মেয়াদোত্তীর্ণের ঝুঁকিতে পড়ায় দ্রুত সময়ে ব্যবহার নিশ্চিত করতে এইচআইভি চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়। গত ২৩ জুন জাতীয় এইডস/এসটিডি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির উপপরিচালক জুবাইদা নাসরীন সই করা চিঠিতে লিখেছেন, ভাইরাল লোড টেস্টিং কিট আশানুরূপ ব্যবহার না হওয়ায় প্রোগ্রামের গুণগত মানের অবনতি এবং ভাইরাল লোড কিটের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর দায় সংশ্লিষ্ট সবার ওপর বর্তাবে। চিকিৎসাকেন্দ্রের একাধিক কর্মকর্তা জানান, মৌখিকভাবে তাদের বলা হয়েছে পরীক্ষাগুলো করা হলেও নিবন্ধন খাতায় তা না তুলতে।

জাতীয় এইডস/এসটিডি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সাবেক পরিচালক ডা. শাহ মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন দীর্ঘদিন এই ভাইরাস প্রতিরোধ ও মোকাবিলায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, সাধারণত শনাক্তের ছয় মাস বা এক বছর ওষুধ ঠিকভাবে খাওয়ার পর রোগীর ভাইরাল লোড পরীক্ষা করা হয়। শুরুতেই এই পরীক্ষা করার চিকিৎসাগত কোনো যুক্তি নেই। এতে রোগীর উপকার হয় না, বরং সরকারি অর্থের অপচয় হয়। বাংলাদেশে ভাইরাল লোড কিট আসে ভারত থেকে। গত বছর এপ্রিলে এনএএসসি ১০ হাজার কিট কেনে, যার মেয়াদ শেষ হয় চলতি বছরের ২ নভেম্বর। ফলে স্বল্পমেয়াদি কিট দ্রুত ব্যবহারের জন্য দেশের ১৪টি চিকিৎসাকেন্দ্রে নির্দেশনা পাঠানো হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশের ১৪টি সেন্টারে প্রায় আট হাজার ২৪৫ এইচআইভি এইডস রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে এক হাজার ৮৫০ জন, যশোরে ২৪৫ জন, বগুড়ায় ৩৪০ জন, বরিশালে ১৬০ জন, কুমিল্লায় ৪৭০ জন, মৌলভীবাজারে ১৬০ জন, সিরাজগঞ্জে ২৫৫ জন, ঢাকা সংক্রমণ ব্যাধি হাসপাতালে এক হাজার ৩২০ জন, খুলনায় ৫৫০ জন, কক্সবাজারে ৪০১ জন, উখিয়ায় ৮৮০ জন, সিলেটে ৫৩৭ জন, চট্টগ্রামে ৬১৮ জন ও ময়মনসিংহে ১৮১ জন রয়েছেন। এসব রোগীর এই পরীক্ষা করা জরুরি।

জাতীয় এইডস/এসটিডি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির উপপরিচালক জুবাইদা নাসরীন বলেন, ভাইরাল লোড কিটের মেয়াদোত্তীর্ণ ঠেকাতেই শনাক্তের শুরুতে এই পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তিনি বলেন, ডব্লিউএইচ’র সব নিয়ম আমরা তো মানি না। কিছু বিষয়ে আমরা নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নিই। এইচআইভি রোগীর চিকিৎসা পদ্ধতি উন্নত করার জন্য স্বল্পমেয়াদি এই পরীক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত এই পরীক্ষা চলমান থাকবে। শুরু হয়েছে গত জুন থেকে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. আবু জামিল ফয়সাল গণমাধ্যমকে বলেন, অল্প টাকা দিয়ে স্বল্পমেয়াদি কিট কেনা হয়েছে। এখানে পরিকল্পনা ও তদারকিতে বড় ঘাটতি রয়েছে এবং অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষার পর নিবন্ধন খাতায় না তোলা মানে অনিয়ম ও দুর্নীতির ইঙ্গিত দেয়। তিনি বলেন, শুধু পরিকল্পনা ও তদারকির অভাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, ফলে মানুষ সেবাবঞ্চিত হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই প্রোগ্রামের সিনিয়র ম্যানেজার মো. আখতারুজ্জামান বলেন, উৎপাদনের পর ১৮ মাস এই কিট ব্যবহার উপযোগী থাকে। কিট কেনার পর দেশে আসতে সময় লাগে চার মাসের বেশি। ফলে ব্যবহারের সময় কমে যায়। তাই শনাক্তের শুরুতেই পরীক্ষা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এইডস প্রোগ্রামের পরিচালক ডা. মো. খায়রুজ্জামান বলেন, ভাইরাল লোড কিটের মেয়াদোত্তীর্ণ বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এইডস এর জন্য আনা কিট নিয়েও নানা সমস্যা রয়েছে। এর মধ্যে অনেক কিটউ মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যায়। জানা যায়, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৮২, মৌলভীবাজারে ৩৩, কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ১৫, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ১৪ ও যশোরে ২০টি মেয়াদোত্তীর্ণ কিট মজুত পাওয়া গেছে।

স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, সীমান্তবর্তী এলাকায় মাদক পাচার ও সেবন, অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক এবং বিদেশফেরত কর্মীদের মধ্যে সচেতনতার অভাব এ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। বাংলাদেশে এখনও এইচআইভি নিয়ে ব্যাপক কুসংস্কার রয়েছে। অনেকেই পরীক্ষা করাতে চান না, আবার আক্রান্তরাও লুকিয়ে থাকেন। ফলে চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হয় এবং সংক্রমণও বেড়ে যায়। যশোরের এক রোগী জানান--বিদেশে কর্মরত অবস্থায় ভাইরাসে আক্রান্ত হলেও দীর্ঘদিন তা বুঝতে পারেননি তিনি। দেশে ফেরার পর অসুস্থ হলে পরীক্ষা করে জানা যায়, তিনি এইচআইভি পজিটিভ। কিন্তু সামাজিক লজ্জা ও ভয়ের কারণে তিনি দীর্ঘদিন চিকিৎসা নেননি। ফলে পরিবারের আরো সদস্য সংক্রমণের শঙ্কায় পড়েছেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রতি বছর নীরবে বাড়ছে এইচআইভিতে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা। ধ্বংস হচ্ছে পরিবার। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে নতুন রোগী শনাক্তের হার প্রায় দ্বিগুণ। আর বড় উদ্বেগের বিষয়, এসব রোগীদের মধ্যে সমকামিতার হার সবচেয়ে বেশি। তথ্য বলছে, শনাক্ত রোগীদের বড় অংশ তরুণ যুবক । এর মধ্যে সমকামিতা, ড্রাগ-ইনজেকশন ব্যবহারকারী, যৌনকর্মী কিংবা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শনাক্তকরণ, সচেতনতা ও চিকিৎসা সব ক্ষেত্রেই ঘাটতি থাকায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের কয়েকটি জেলায় সংক্রমণের হার তুলনামূলক দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে সিরাজগঞ্জ, যশোর, রাজশাহী, খুলনা এই এলাকাগুলোতে গত দুই বছরে নতুন রোগী শনাক্তের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে কিছু কিছু ক্ষেত্রে।

অনেকেই বলছেন, দেশে এইডস শনাক্ত হলেও ওষুধ সেভাবে পাওয়া যায় না। অনেক জেলায় কাউন্সেলিং সেন্টার নেই আবার থাকলেও পর্যাপ্ত নয়, কোথাও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই, কোথাও গোপনীয়তা নিশ্চিত না হওয়ায় রোগীরা যেতে চান না।

ঢাকার মহাখালী সংক্রামক ব্যাধী হাসপাতালের দায়িত্বরত এইডস পরামর্শদাতা মো: লিটন বলেন,রোগী চিকিৎসার জন্য আসতেই চান না। কারণ তারা ভয় পান এ খবর যদি পরিবার বা এলাকাবাসী জেনে যায়, তাহলে অপমানিত হতে হবে। এই ভয়টাই সবচেয়ে বড় বাধা। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এখনই উদ্যোগ না নিলে আগামী ৫ বছরে দেশের এইডস সংক্রমণ দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর মহাখালী সংক্রামক ব্যাধী হাসপাতালে ২৭৩ জন রোগীর মধ্যে ১১৭ সমকামী। যা বেশিরভাগ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। যশোর জেলায় এবছর ২৬০ জন এইচআইভি পজেটিভ। এর মধ্যে সদরেই ১২৭ জন। বাকিগুলো বিভিন্ন জেলায়। এদের মধ্যে সমকামীতার হার বেশি আর সব ছাত্র । তথ্য বলছে, গতবছর ২৫ জন এইচআইভি ধরা পড়লে এর মধ্যে ১২ জনই সমকামী আর ছাত্র । এদিকে চলতি বছরে ৪৯ জনের মধ্যে ২২ জন ছাত্র সমকামী। পরামর্শ দাতারা বলছেন, ছেলেদের মাধ্যমে এইচআইভি বেশি ছড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়ন্ত্রণে রাখতে কাউন্সেলিং এর বিকল্প নেই।