‘জাতীয় নির্বাচন ২০২৬: চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বিশিষ্টজনরা বলেছেন, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড প্রয়োজন। সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিতে সব ভোটকে সিসিটিভির আওতায় আনা জরুরি। পাশাপাশি কালো টাকার প্রভাব ও নির্বাচনী সন্ত্রাস ঠেকাতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং অপব্যবহার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তারা বলেন, বিদেশি শক্তির প্রভাব এবং বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচারের মাধ্যমে রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। একই দিনে গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়া প্রশাসন এখনো সম্পূর্ণভাবে নিরপেক্ষ নয় এবং গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও পূর্ববর্তী সরকারের প্রভাব বিদ্যমান।
গতকাল শনিবার বিকাল ৩টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের ইলেকশন ওয়ার্কিং অ্যালায়েন্স (EWA)-এর আত্মপ্রকাশ ও গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন তারা। সাবেক সচিব প্রফেসর ড. মো. শরিফুল আলমের সভাপতিত্বে অবস্থানপত্র উপস্থাপন করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মো. শাফিউল ইসলাম । আলোচনা করেন রাষ্ট্র বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. দিলারা চৌধুরী, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সাবেক চাকসু ভিপি এডভোকেট জসিম উদ্দিন সরকার, সাবেক সচিব মো. আবদুল কাইয়ুম, সাবেক জেলা ও সেশন জজ ও কলামিস্ট ইকতেদার আহমেদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সহকারী মহাসচিব মাওলানা আবু নুমান, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি, ব্যারিস্টার নাসরিন সুলতানা মিলি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সহকারী মহাসচিব মাওলানা আহমদ আব্দুল কাইয়ুম, খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক প্রফেসর কাজী মিনহাজুল আলম, আপ বাংলাদেশের নাঈম আহমাদ, সাংবাদিক একরামুল হক সায়েম, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক মিলি রহমান, প্রকৌশলী মারদিয়া মমতাজ প্রমুখ।
প্রফেসর ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, অভ্যন্তরীণ সংকট ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা থেকে উত্তরণের জন্য আগামী জাতীয় নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য রাজনৈতিক ঐক্য গঠন এবং একটি অনুকূল নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টি অপরিহার্য। তিনি বলেন, বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলো ইস্যুভিত্তিক আলোচনায় না গিয়ে যেকোনো মূল্যে নির্বাচনে জয়লাভের প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে বড় বাধা।
তিনি বলেন, বিদেশি শক্তির প্রভাব এবং বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচারের মাধ্যমে রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। একই দিনে গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, প্রশাসন এখনো সম্পূর্ণভাবে নিরপেক্ষ নয় এবং গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও পূর্ববর্তী সরকারের প্রভাব বিদ্যমান।
সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, জাতিসংঘের সংজ্ঞা ও নির্বাচন কমিশনের বিধি অনুসারে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেই তা সুষ্ঠু নির্বাচনের মানদন্ডে পৌঁছায় না। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের মূলনীতিগুলো বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিচার করে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন , রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে এবং নির্বাচনের পরও তাদের সেই সনদের শর্তাবলী মেনে চলতে হবে। আলাল বলেন, অতীতের মতো আর কোনো কলঙ্কিত নির্বাচন দেশের জনগণ কখনোই দেখতে চায় না।
অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন সরকার অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিতে সব ভোটকে সিসিটিভির আওতায় আনা জরুরি। পাশাপাশি কালো টাকার প্রভাব ও নির্বাচনী সন্ত্রাস ঠেকাতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং অপব্যবহার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
তিনি বলেন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষ, দক্ষ ও পেশাদার ভূমিকা একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ প্রেক্ষিতে তিনি লটারির মাধ্যমে জেলা প্রশাসক, ইউএনও, পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বদলির দাবি জানান।
জুলাই সনদ ও ঘোষণার দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, দলীয় ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও সরকার পরিচালনার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্রীয় কাঠামো প্রতিষ্ঠা হবে-যেখানে নতুন কোনো ধরনের ফ্যাসিবাদের জন্ম হবে না।
তিনি বলেন , জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের হত্যাকারীদের বেশিরভাগই এখনো গ্রেপ্তার হয়নি; তাই তাদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একই দিনে আয়োজনকে তিনি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং জামায়াতে ইসলামী গণভোট আগে সম্পন্ন করার দাবি জানায়।
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদী বলেন, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত নির্বাচনী ব্যয়ের সীমা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন এবং উল্লেখ করেন এটি কীভাবে মনিটর করা হবে, তা জনগণ জানতে চায়। তিনি প্রবাসীদের এনআইডি না থাকলে পাসপোর্টের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি পাশাপাশি প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বডিক্যাম ব্যবহারের জোর দাবি জানান।
বিশিষ্ট কলামিস্ট ও সাবেক রেজিস্ট্রার জেনারেল ইকতেদার আহমদ বলেন, অতীতের ১২টি জাতীয় নির্বাচনের মধ্যে মাত্র ৪টি যথার্থ হয়েছে বাকিগুলো নানা বিতর্কে জড়িত হয়েছে। তাঁর মতে, নির্বাচন যদি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য না হয়, তবে নির্বাচন কমিশনের নির্বাচন করা বা ফলাফল বাতিল করার সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখন পর্যন্ত কোনো নির্বাচন কমিশন সাহসিকতা প্রদর্শন করতে পারেনি।
প্রফেসর ড. মো. শাফিউল ইসলাম বলেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তরের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ, যেখানে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন রাষ্ট্র পুনর্গঠনের পূর্বশর্ত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিভিন্ন খাতে গৃহীত সংস্কার প্রচেষ্টা, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্ধারিত জাতীয় নির্বাচন এবং প্রস্তাবিত গণভোট সব মিলিয়ে এ নির্বাচনকে শুধু ক্ষমতা হস্তান্তরের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়, বরং গণতান্ত্রিকশাসন, সাংবিধানিক সংস্কার ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনর্নিমাণের এক বিস্তৃত ধাপে উন্নীত করেছে।
ইলেকশন ওয়ার্কিং অ্যালায়েন্স কো-চেয়ারম্যান ড. গোলাম রহমান ভূঁইয়া বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন কেবল নির্বাচন কমিশনের একার পক্ষে সম্ভব নয় এতে সরকারি প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, পর্যবেক্ষক সংগঠন ও নাগরিক সমাজসহ সকল অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এই দায়িত্ববোধ থেকেই নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নিবন্ধিত পর্যবেক্ষক সংগঠনসমূহ, বিভিন্ন উন্নয়ন ও সেবা সংস্থা, পেশাজীবী ও নাগরিক সমাজের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে ইলেকশন ওয়ার্কিং অ্যালায়েন্স । এর মূল উদ্দেশ্য হলো জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে অবাধ, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের সংস্কৃতি গড়ে তোলা এবং বাংলাদেশে সুশাসন ও জবাবদিহিমূলক শাসন প্রতিষ্ঠায় অবদান প্রাখা। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের বিধান অনুসারে আগামী জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করাও অ্যালায়েন্সের অন্যতম দায়িত্ব। তিনি অ্যালায়েন্স এর সদস্যদের পরিচয় করিয়ে দেন।