রাষ্ট্রীয় শোক আজ

দুপুর দুইটায় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জানাযা

দাফন করা হবে কবি কাজী নজরুলের কবরের পাশে

রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিজিবি মোতায়েন

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও জুলাই বিপ্লবের অন্যতম সংগঠক শরিফ ওসমান হাদীর লাশ ঢাকায় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের হিমঘরে রাখা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা পৌনে ৬টায় তার লাশ বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩৮৫ ফ্লাইটটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। এরআগে বাংলাদেশ সময় দুপুর ২টা ৩ মিনিটে সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে রওনা হয় বিমানটি। গুলীবিদ্ধ হয়ে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকার সাত দিনের মাথায় বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সম্মুখসারির এই জুলাই যোদ্ধা।

বিমানবন্দরে শহীদ হাদীর লাশ গ্রহণ করেন- অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, মোস্তফা সারোয়ার ফারুকী, বশির আহমেদ ও ডা. সায়েদুর রহমান। এছাড়া ছিলেন- বাংলদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন, ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম, এনসিপির সদস্য সচিব আক্তার হোসেন, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ, ইনকিলাব মঞ্চের বুরহান উদ্দিন ও জাবের। একই সঙ্গে হাদীর বোন-জামাই আমিরুল ইসলামও উপস্থিত ছিলেন। অপরদিকে হাদীর লাশের সঙ্গে সিঙ্গাপুর থেকে আসেন তার বড় ভাই আবু বকর। বিমানবন্দরে ওসমান হাদীর কফিন ধরে কেঁদেছেন উপস্থিত জাতীয় নেতারা। এসময় সেখানে এক আবেগ ঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

জানা গেছে, শরিফ ওসমান হাদীর জানাযা আজ শনিবার দুপুর দুইটায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হবে। গতকাল শুক্রবার প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, জানাজায় অংশগ্রহণে আগ্রহীদের কোনো প্রকার ব্যাগ বা ভারী বস্তু বহন না করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হচ্ছে। একই সঙ্গে এসময় সংসদ ভবন ও আশপাশের এলাকায় ড্রোন ওড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে বলে জানান উপ-প্রেস সচিব। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও জুলাইযোদ্ধা শরিফ ওসমান হাদী। পরিবারের দাবির ভিত্তিতে শহীদ ওসমান হাদীকে কবি নজরুল কবরের পাশে দাফন করার এবং মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে জানাজার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার প্রেক্ষিতে শুক্রবারের পরিবর্তে শনিবার মিছিলসহ সেন্ট্রাল মসজিদে আনা হবে বলে জানানো হয়। শৃঙ্খলার সঙ্গে আন্দোলন জারি রাখার আহ্বান জানায় ইনকিলাব মঞ্চ। স্ট্যাটাসে বলা হয়, যেন কোনো গোষ্ঠী অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে আন্দোলন স্তিমিত করতে না পারে। একইসঙ্গে সহিংসতার সুযোগ ও না পায়। লাশ দেখার কোনো সুযোগ থাকবে না। এদিকে শুক্র ও শনিবার শৃঙ্খলার সঙ্গে আন্দোলন জারি রাখার আহ্বান জানায় ইনকিলাব মঞ্চ। এক স্ট্যাটাসে বলা হয়, যেন কোনো গোষ্ঠী অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে আন্দোলন স্তিমিত করতে না পারে। একইসঙ্গে সহিংসতার সুযোগ ও না পায়। লাশ দেখার কোনো সুযোগ থাকবে না।

গত শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর) রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে গুলী করা হয় রিকশায় থাকা শরিফ ওসমান হাদীকে। মাথায় গুলীবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক একটি অস্ত্রোপচারের পর ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান জুলাইয়ের এই বিপ্লবী।

জন্ম, পরিবার, শৈশব ও শিক্ষা জীবন:

দেশের রাজনীতির সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাম শরিফ ওসমান হাদী। ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী আন্দোলনের সব সময় ছিলেন প্রতিবাদ মুখর। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের তরুণ রাজনৈতিক কর্মী, বক্তা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আত্মপ্রকাশ করা রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম ইনকিলাব মঞ্চ-এর মুখপাত্র। স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি রাজপথ, ক্যাম্পাস ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসেন। ওসমান হাদীর জন্ম ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলায় এক ধর্মভীরু মুসলিম পরিবারে। তার বাবা ছিলেন একজন মাদ্রাসা শিক্ষক ও স্থানীয় ইমাম। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। শৈশব থেকেই পারিবারিক পরিবেশে ধর্মীয় শিক্ষা, শৃঙ্খলা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার চর্চা তার ব্যক্তিত্ব গঠনে ভূমিকা রাখে। হাদীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার শুরু নলছিটির একটি মাদ্রাসায়। তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত সেখানে পড়াশোনার পর তিনি ঝালকাঠি এন এস কামিল মাদ্রাসায় ভর্তি হন এবং আলিম পরীক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি রাজধানী ঢাকায় এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই তার রাজনৈতিক চিন্তা ও নেতৃত্বগুণ আরও বিকশিত হয়।

আন্দোলনের রাজনীতিতে উত্থান: ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল ওসমান হাদীর রাজনৈতিক জীবনের মোড় ঘোরানো অধ্যায়। ওই সময় তিনি ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন এবং ঢাকার রামপুরা এলাকায় সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। তরুণদের সংগঠিত করা, মিছিল-সমাবেশে বক্তব্য দেওয়া এবং রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি তুলে ধরার মাধ্যমে তিনি দ্রুত পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।

ইনকিলাব মঞ্চ: জুলাই অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ছাত্রজনতার অভিজ্ঞতা ও দাবির ভিত্তিতে ওসমান হাদীর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ইনকিলাব মঞ্চ। সংগঠনটির ঘোষিত লক্ষ্য হলো-সব ধরনের আধিপত্যবাদ ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা। গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ, ন্যায়বিচার ও রাজনৈতিক জবাবদিহিকে এই প্ল্যাটফর্মের মূল ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়। ওসমান হাদী বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিক সম্মেলন ও জনসভায় দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে পুরোনো ধারার রাজনীতির কঠোর সমালোচনা করেন। ২০২৫ সালে আওয়ামী লীগকে সন্ত্রাসী ও রাষ্ট্রদ্রোহী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করার দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে ওসমান হাদী ছিলেন অন্যতম আলোচিত তরুণ নেতা। ‘ন্যাশনাল অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট ইউনিটি’ ব্যানারের অধীনে পরিচালিত এই আন্দোলনে ইনকিলাব মঞ্চ সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।

ঢাকা-৮ আসনে প্রার্থিতা: ২০২৫ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা ৮ আসন থেকে সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেন ওসমান হাদী। মতিঝিল, শাহবাগ, রমনা, পল্টন ও শাহজাহানপুর নিয়ে গঠিত এই আসনে তিনি প্রচলিত রাজনীতির বাইরে গিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি মতবিনিময়, ‘চাসিঙ্গারা’ আড্ডা এবং পথসভা আয়োজনের ঘোষণা দেন। তার এই ভিন্নধর্মী প্রচারণা গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে একাধিকবার প্রাণনাশের হুমকি পাওয়ার কথা আগেই জানিয়েছিলেন ওসমান হাদী। ১২ ডিসেম্বর ২০২৫, জুমার নামাজের পর রাজধানীর বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলীতে তিনি গুরুতর আহত হন। প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর নেওয়া হলেও ১৮ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন।

বিজিবি মোতায়েন: শরিফ ওসমান হাদীর লাশ দেশে আসার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার বিকালে বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম এক বার্তায় এ তথ্য জানান। বার্তায় বলা হয়- বিমানবন্দর এলাকা, কারওয়ানবাজার ও হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল এলাকাসহ নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।