ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে মাঠে নেমেছেন প্রার্থীরা। উন্নয়ন প্রতিশ্রুতি, সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কা ও জনসংযোগে ব্যস্ত সময় কাটছে তাদের। নিজ নিজ এলাকায় আনুষ্ঠানিক প্রচারে নেমেছেন সকল প্রার্থী। সমর্থকদের সাথে নিয়ে ভোটারদের বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন তারা। দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। নির্বাচনী পরিবেশ সুষ্ঠু রাখতে প্রশাসনের কড়া নজরদারি এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিতের তাগিদ তাদের। সবাই বিপুল ব্যবধানে জয় পাওয়ার কথা ব্যক্ত করছেন। তবে প্রচারে নেমে সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকেই। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তুষ্ট কেউ কেউ।

সূত্র মতে, কর্তৃত্বপরায়ণ ফ্যাসিস্ট শাসনের দীর্ঘ ছায়া পেরিয়ে জাতি এগোচ্ছে এক বহুল প্রত্যাশিত নির্বাচনের দিকে। গত বুধবার মধ্য রাত থেকেই দীর্ঘ সেই অপেক্ষার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও নেমেছে ভোটের উত্তাপ। আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সব কিছু ঠিক থাকলে প্রায় দেড় দশক পর সে দিন দেশের মানুষ অবাধে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেতে যাচ্ছে। রাজনৈতিক বোদ্ধারা বলছেন, এই নির্বাচন কেবল একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয় বরং এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার জন্য এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ মোড়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিগত দেড় দশকে যে নির্বাচনগুলো প্রশ্নবিদ্ধ অংশগ্রহণ, অনাস্থা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে এবারের নির্বাচন জনগণের কাছে নতুন আশার প্রতীক হয়ে উঠেছে। জনগণ প্রত্যাশা করছে, এই নির্বাচন হবে অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য। এবারের নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলিয়ে মোট প্রায় দুই হাজার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মাঠে নেমেছেন। ৫৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি দল প্রার্থী দিয়েছে, যা সাম্প্রতিক নির্বাচনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এটি নিঃসন্দেহে নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় বহুমাত্রিকতা ও অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।

এবারের নির্বাচন পরিচালিত হবে ‘রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা ২০২৫’ অনুযায়ী। এই বিধিমালার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পোস্টারবিহীন নির্বাচন। বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এটি এক নতুন অধ্যায়। পোস্টার, পিভিসি ব্যানার, প্লাস্টিক ফেস্টুন নিষিদ্ধ করে পরিবেশবান্ধব প্রচারণার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এতে একদিকে যেমন পরিবেশ রক্ষা হবে, অন্যদিকে অর্থ ও পেশিশক্তির অপব্যবহারও কমবে বলে আশা করা যায়। একটি অবাধ নির্বাচনে আয়োজনের উদ্দেশ্যে শোডাউন, গাড়িবহর, মশাল মিছিল, ড্রোন ব্যবহার, আলোকসজ্জা, তোরণ নির্মাণ, সবই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন, তাও নির্দিষ্ট মাপ ও শর্তে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন কেবল রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল নয়। গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ, পর্যবেক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সক্রিয় ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যমের দায়িত্ব থাকবে তথ্যভিত্তিক, ভারসাম্যপূর্ণ ও দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশন করা। একই সঙ্গে ভুল তথ্য ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা। নাগরিক সমাজকে নজরদারি ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে হবে। নির্বাচন মানেই কেবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয় বরং এটি একটি জাতীয় উৎসব, এই ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দীর্ঘ কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনের অবসানের পর এই নির্বাচন হতে পারে নতুন বাংলাদেশের পথে এক শক্ত ভিত্তি।

সূত্র মতে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন কেবল একটি দাবি নয় বরং এটি একটি জাতির অধিকার। তাই এবারের নির্বাচনে ভোটারদের কাছে যে প্রধান ইস্যুগুলো প্রাধাণ্য পাচ্ছে সেগুলো হলো- দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সুশাসন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দুর্নীতি নির্মূল এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার। এছাড়া উন্নয়ন প্রকল্পের স্বচ্ছতা, মানবাধিকার পরিস্থিতি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মানোন্নয়ন ভোটারদের রায়ে বিশেষ গুরুত্ব পাবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর মানুষের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা । তার মধ্যে একটি হলো, যারা বিভিন্ন ধরনের অন্যায় করেছে, দুর্নীতি করছে, দুর্বৃত্তায়িত হয়েছে, লুটপাট করছে, মানবতাবিরোধী অপরাধ করছে, যারা গুম-খুনে জড়িত, যারা মানুষের অধিকার হরণ করেছে, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে-তাদের যেন বিচারের আওতায় আনা হয় এবং তাদের দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হয়। একইসঙ্গে আরও প্রত্যাশা হচ্ছে, বিগত আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকার গত ১৫-১৬ বছর ধরে জনগণের ওপর যে স্টিমরোলার চালিয়েছে, সেটির যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে। কেউ যেন অধিকার থেকে বঞ্চিত না হই, নানা অন্যায়-অবিচারের শিকার না হন।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এবারের নির্বাচনে ভোটারদের কাছে প্রাধান্য পাবে মানুষের ভোটাধিকার রক্ষা করা, দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন, লুটপাট, স্বজনপ্রীতি এগুলোর সাথে যারা জড়িত, তাদের বয়কট করা। যাদের কারণে কর্তৃত্ববাদী সরকার আবারও ফিরতে পারে তাদের ক্ষমতায় না আনা। ভোটাররা দেখবে রাজনৈতিক অধিকার, নাগরিক অধিকার নিশ্চিতে যারা বিশ্বাসযোগ্য, তাদের নির্বাচিত করা।

জানা গেছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রচারণায় বেশ কিছু বিষয়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। সেগুলো হচ্ছে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণ, মানুষের চোখে চারপাশের সমস্যাগুলো কী এবং তার বাস্তবসম্মত সমাধান কী হতে পারে, সমস্যা সমাধানে অ্যাপ চালু করা, দ্য প্ল্যান : ইয়ুথ পলিসি টক উইথ তারেক রহমান, কর্মসংস্থান, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, তথ্যপ্রযুক্তি, নারীর ক্ষমতায়নসহ নানা বিষয়। এরই মধ্যে নির্বাচনী সমাবেশে তিনি এর প্রতিফলন দেখাচ্ছেন। নানা পেশার মানুষকে মঞ্চে ডেকে এনে সমস্যাগুলো জানতে চাইছেন। যদিও অনেকেই বলছেন, অপ্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়ও এতে প্রাধাণ্য পাচ্ছে। যা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের চরিত্র হননের উদ্দেশ্যেই করা হতে পারে।

সূত্র মতে, এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের দলগুলোর মূল অঙ্গীকার হলো রাষ্ট্রীয় সংস্কার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশন সংস্কার এবং নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা দিয়ে ভোটারদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা তাদের অন্যতম অঙ্গিকার। জানা গেছে, জামায়াতে ইসলামী তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র গঠন, পাচার হওয়া টাকা ফেরত, শিক্ষা, নারীর কর্মসংস্থান ও ক্ষমতায়ন, যুবকদের কর্মসংস্থান এবং নিরাপত্তার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছে। ইশতেহারে দুর্নীতিকে লাল কার্ড দেখানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাবে বলে জানিয়েছেন জামায়াত নেতারা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক আহসান হাবিব বরুন বলেন, নিবার্চন কেবল ক্ষমতার পালা বদল নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সর্বস্তরের নাগরিকের বহু আশা ও চাওয়া পাওয়ার প্রতিফলন। এবারের নির্বাচন কেবল একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তা গণমানুষের চাওয়াকে কেন্দ্র করে একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে যেখানে ব্যক্তির ভোট প্রদানে কোনো হস্তক্ষেপ করা হবে না, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে, আইনশৃঙ্খলা পরিবেশ নিয়ন্ত্রিত থাকবে সঙ্গে গুজব ও অপপ্রচার কঠোরহস্তে দমন করা হবে এটাই প্রত্যাশিত।

সাইফ হাসান নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, একটি রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন, সুশাসন ও জবাবদিহিতামূলক শাসনব্যবস্থা যাদের দ্বারা সম্ভব, তারাই এবারর ভোটে এগিয়ে থাকবে। । ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়কালে জনগণের ভোটদানের অধিকার নিশ্চিত হয়নি, তাই ২০২৬ এর নির্বাচনে চাই সুষ্ঠু ভোটাধিকার। আগামী নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়- এটি হতে হবে আইনের শাসন, জনগণের অংশগ্রহণ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, নিরাপত্তা প্রদান, জবাবদিহিতার পুনর্গঠন। জবাবদিহিতামূলক শাসন না থাকলে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও বৈষম্য বৃদ্ধি পাবে।

আরেক শিক্ষাথী মরিয়ম আক্তার বলেছেন, অতীতে মারামারি, গুলীবিদ্ধ, প্রিসাইডিং অফিসারকে গুলী দেখিয়ে ভয় দেখানো, সাংবাদিকদের অনুমতি থাকা সত্ত্বেও ভিতরে প্রবেশে বাধা প্রদান, পুলিশ সদস্যদের টাকার মাধ্যমে জিম্মি করে রাখা, জাল ভোট, টাকার মাধ্যমে ভোট কিনে নেওয়া, ব্যালেট পেপার ছিনিয়ে নেওয়া এই যেন নৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল। কিন্তু আগামী নির্বাচনে প্রত্যাশা অনেক বেশি। নির্বাচন হতে হবে স্বচ্ছ, সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহে বাঁধা দিলে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে, প্রিসাইডিং অফিসারের ভোট গণনায় সিসিটিভি দ্বারা মনিটরিং করতে হবে, কোনো ত্রুটি পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ, জাল ভোটের ব্যাপারে সতর্কতা, মারামারি কিংবা হামলা সংঘটিত ব্যক্তিকে সরাসরি প্রশাসনের কাছ সোপর্দ করা, নির্বাচনী এরিয়ার মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রবেশ নিষিদ্ধ ইত্যাদি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যদি নির্বাচন সুষ্ঠু হয়, তবেই দেশের কাঠামো হবে উন্নত।