আজ ১০ ডিসেম্বর, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হবে নানা কর্মসূচিতে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসের বাণী দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্ম ইউনূস, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন। বাংলাদেশে এবছর এমন এক সময় মানবাধিকার দিবস পালিত হচ্ছে, যখন ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনার মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিচার করে মানবাধিকার সমুন্নত করার ধাপে এগিয়ে যাচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এবছরের মানবাধিকার দিবসের প্রতিপাদ্য ‘মানবাধিকার আমাদের নিত্যদিনে অপরিহার্য’।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক অনুচ্ছেদে বড় বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে, ‘জন্মগতভাবে সকল মানুষ স্বাধীন এবং সমান সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তা কতটুকু প্রযোজ্য তার হিসাব করা মশকিল বলেই হয়তো ২০২৪ সালে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন এবং বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে। আজ সেই মানবতাবিরোধী অপরাধীরা বিচারের কাঠগড়ায়।

১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর ঘোষিত মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের সম্মানার্থে ১০ ডিসেম্বরকে ‘বিশ্ব মানবাধিকার দিবস’ হিসাবে পালন করা হচ্ছে ১৯৫০ সাল হতে। মানবাধিকারের সংজ্ঞা ও সীমারেখা নিয়ে বড় বড় কথা বলা হলেও জনস্বীকৃত অধিকারগুলো অবলীলায় হরণ ও দমনের ঘটনা ঘটছে দেশে দেশে। এর বাইরে নয় বাংলাদেশও।

বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বলা হচ্ছে, ফশাসনব্যবস্থায় পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়েছে। তবে কিছু বিষয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে। দেশের ২০২৪ সালের পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মানবাধিকারবিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আগের সরকারের আমলে মানবাধিকার-সংক্রান্ত যেসব বিষয়ে উল্লেখ করার মতো গ্রহণযোগ্য খবর রয়েছে, সেগুলো হলো নির্বিচারে বা বেআইনি হত্যাকাণ্ড, গুম, নির্যাতন কিংবা নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ বা শাস্তি, নির্বিচারে গ্রেপ্তার বা আটক, বিদেশে থাকা সমালোচকদের সরকারিভাবে হয়রানি, মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর গুরুতর বিধিনিষেধ, যার মধ্যে রয়েছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বা সহিংসতার হুমকি, সাংবাদিকদের অযৌক্তিকভাবে গ্রেপ্তার বা বিচার করা এবং সেন্সরশিপ, শ্রমিক সংগঠনের স্বাধীনতার ওপর উল্লেখযোগ্য বিধিনিষেধ, শ্রম অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তি বা শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্যদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বা হুমকি, শিশুশ্রমের সবচেয়ে খারাপ ধরন উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বিদ্যমান থাকা।

বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবেদনে জুলাই ও আগস্টে সাবেক ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের নানা ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার জাতিসংঘের সঙ্গে একযোগে কাজ করছে। অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে দেশের প্রচলিত বিচারব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালÑউভয়কে কাজে লাগানো হচ্ছে।

এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাক্তির আইনগত পরিচয় মানবাধিকার সুরক্ষার অন্যতম মৌলিক স্তম্ভ। কেবল জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন নিশিচতকরণের মাধ্যমে এই অধিকার সুরক্ষা সম্ভব। নিবন্ধনহীন ব্যক্তি রাষ্ট্রের চোখে অদৃশ্য এবং মৌলিক সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

বর্তমানে বাংলাদেশে জন্ম নিবন্ধনের গড় হার ৫০ শতাংশ অর্থাৎ এখনো অর্ধেক মানুষকে নিবন্ধন না থাকার কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক অধিকার পেতে বেগ পেতে হচ্ছে। নিবন্ধনহীনতা দেশে শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, মানবপাচারসহ বিভিন্ন ধরনের মানবধিকার লঙ্ঘনকে ত্বরান্বিত করছে। একইভাবে, মৃত্যু নিবন্ধন না থাকায় উত্তরাধিকার প্রমাণে জটিলতা সৃষ্টি হয়। আত্মীয়দের মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। বর্তমানে দেশে অর্ধেকেরও বেশি মানুষের মৃত্যু নিবন্ধন নেই। বিশেষ করে গ্রাম, চরাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা ও নগরের বস্তি এলাকায় এই হার অনেক কম।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন ২০০৪ সংস্কার করে পরিবারের পরিবর্তে সকল স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিবন্ধনের দায়িত্ব দিলে, দেশের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে জন্ম নেওয়া প্রায় ৬৭ শতাংশ শিশু স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধনের আওতায় চলে আসবে। এতে সিআরভিএস দশকের শতভাগ নিবন্ধন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ এবং এসডিজি ১৬.৯ (সবার জন্য বৈধ পরিচয়পত্র) অর্জন ত্বরান্বিত হবে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস ২০২৫ উপলক্ষে এক প্রতিক্রিয়ায় গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক, এবিএম জুবায়ের বলেন, “মানবাধিকার লঙ্ঘন শুরু হয় পরিচয়হীনতা থেকে। আইন সংস্কারের মাধ্যমে নিবন্ধন কার্যক্রম জনবান্ধব করতে হবে, যাতে কোনো মানুষই পরিচয়হীন না থাকে এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আইনি সুরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিসহ সকল মৌলিক অধিকার সমানভাবে ভোগ করতে পারে।