প্রায় দুই দশক পর রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভা ঘোষণা করেছেন। যেখানে জ্যেষ্ঠ নেতাদের পাশাপাশি দলের মধ্যম সারি ও নবীনদের বড় একটি অংশকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দলের স্থায়ী কমিটির অধিকাংশ সদস্যকে মন্ত্রিসভাসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে প্রবীণ কয়েখজন নেতা এখনো মন্ত্রীসভার বাইরে আছেন। এর মধ্যে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এখনো সরকারের বাইরে আছেন।
খালেদা জিয়ার দুইবারের মন্ত্রিসভায় স্বাস্থ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় সামাল দেওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক হিসেবে তার পরিমিতিবোধ দলের সবার মুখে মুখে। তিনি সর্বজন শ্রদ্ধেয়। সর্বশেষ ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনেও সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ড. খন্দকার মোশাররফ। ফলে নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সমাজের সচেতন জনগোষ্ঠীর অনেকেরই নজর এখন তার দিকে। প্রবীণ এ নেতাকে কোথায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তা নিয়ে ব্যাপক কৌতূহল রয়েছে জনমনে। আলোচনা ছড়িয়ে পড়েছে, খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হতে পারে।
সূত্র জানায়, দলের নেতাকর্মীদের অনেকেই এ নেতার বাসায় গিয়ে আগাম শুভেচ্ছাও জানান। খন্দকার মোশাররফকে সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসাবে টেলিফোনে অনেকে জানান আগাম শুভেচ্ছা।
ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কুমিল্লা-১ ও ২ আসন থেকে মোট পাঁচবার সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। বয়স ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় দল তাকে রাষ্ট্রপতির সম্মানজনক পদে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে বলেও ঘনিষ্ঠজনদের ধারণা।
ড. মোশাররফ হোসেন এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, বিএনপি আমাকে যে কোনো দায়িত্ব দেবে আমি নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করার চেষ্টা করব।
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতি। সংবিধান অনুযায়ী, একজন রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। সর্বোচ্চ দুবার দায়িত্ব পালন করতে পারেন তিনি। ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন দায়িত্ব পান। তার মেয়াদ রয়েছে ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত। যদিও ২০২৪ সালের অক্টোবরে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে জোরালো আন্দোলন করেছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। তবে শেষ পর্যন্ত তাকে অপসারণ কিংবা তার পদত্যাগের ঘটনা ঘটেনি। তবে গত ডিসেম্বরে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে হোয়াটসঅ্যাপে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর তিনি সরে যেতে চান। কারণ, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তিনি অপমানিত বোধ করছেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন, আমি সরে যেতে চাই, আমি সরে যেতে আগ্রহী। সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতির পদে থাকায় আমি আমার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি তার পদে দায়িত্ব গ্রহণের তারিখ থেকে পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করবেন। কোনো ব্যক্তি দুইবারের বেশি রাষ্ট্রপতির পদে অধিষ্ঠিত থাকতে পারবেন না। শারীরিক অসুস্থতা, মানসিক কারণ কিংবা গুরুতর কোনো অসদাচরণজনিত কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হতে পারে। মেয়াদ শেষ, পদত্যাগ কিংবা অভিশংসনজনিত কারণে রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হলে এই নির্বাচনের আয়োজন করে থাকে নির্বাচন কমিশন। সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ-সদস্যের ভোটেই নির্বাচিত হন রাষ্ট্রপতি। এক্ষেত্রে কারও বয়স ৩৫ বছরের কম এবং সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য না হলে তিনি রাষ্ট্রপতি হতে পারবেন না। বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, এখন দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন সংসদ-সদস্যদের ভোটে।
নিয়ম অনুযায়ী, বাংলাদেশের সিইসি ‘নির্বাচনি কর্তা’ হিসাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনা করেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হলে স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। রাষ্ট্রপতি পদে একক প্রার্থী হলে বিধান অনুযায়ী ভোটগ্রহণের প্রয়োজন পড়ে না। তফসিল ঘোষণার পর সংসদ অধিবেশন চলাকালীন এই নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রয়োজনীয় সময়ে যদি অধিবেশন না থাকে, তাহলে নির্বাচন কমিশন স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে ভোটগ্রহণের কমপক্ষে সাতদিন আগে অধিবেশন আহ্বান করবে।
এদিকে বিদায়ি স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে এবার সভাপতিত্বে করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)। তার সভাপতিত্বে নতুন স্পিকার নির্বাচন করা হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করলেও দলের স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. আবদুল মঈন খান এখনো কোনো দায়িত্ব পাননি। এ কারণে স্পিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রবীণ এ নেতাকে কোথায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তা নিয়ে ব্যাপক কৌতূহল রয়েছে জনমনে। আলোচনা ছড়িয়ে পড়েছে ড. মঈন খানকে সংসদের স্পিকার নির্বাচিত করা হতে পারে।
এ নেতার ঘনিষ্ঠজনরা জানান, মন্ত্রিসভা গঠনের পর সৃষ্ট পরিস্থিতিতে তারা ধারণা করছেন, প্রবীণ এ নেতাকে সংসদের সম্মানজনক জায়গায় রাখা হবে। অবশ্য এ নেতার শুভাকাঙ্ক্ষীরা জানান, তাদের কাছে এ বিষয়ে কোনো তথ্য নেই। তারা কিছুই জানেন না বলেও উল্লেখ করেন কর্মী-সমর্থকদের কাছে।
স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান নরসিংদী-২ আসন থেকে মোট চারবার সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন। তার বাবার সাবেক এমপি ও মন্ত্রী ছিলেন। অনেকের মতে, প্রবীণ নেতা ড. মঈন খানকে স্পিকার পদে নির্বাচিত করা হলে তিনি ভালো করবেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক হিসেবে তিনি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য।
শপথ গ্রহণের ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সংসদ অধিবেশন ডাকার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। প্রথম অধিবেশনেই সংসদ সদস্যদের ভোটে স্পিকার নির্বাচিত হবেন। সংবিধান অনুযায়ী বিদায়ি স্পিকারের সভাপতিত্বে নতুন স্পিকার নির্বাচনের বিধান থাকলেও এবার তা হচ্ছে না।