দেশের ভয়াবহ গ্যাস সংকট সামলা দিতে কূপ প্রকল্প যখন দ্রুত অনুমোদন জরুরি, তখন উল্টো দীর্ঘ সূত্রতায় বাড়ছে সরকারের পদক্ষেপে। ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) অনুমোদনে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) অনুমোদন বাধ্যতামূলক করায় এমন শঙ্কা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, অন্তবর্তীকালীন সরকারের এটি দ্বিতীয় নেতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। সরকারের শুরুর দিকে তৃতীয়পক্ষের মাধ্যমে প্রাকসমীক্ষার বিধিনিষেধ বহাল রাখা প্রথম অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত হবে।
অর্থায়ন জটিলতায় প্রকল্প বাস্তবায়ন যখন বিলম্বিত হচ্ছিল, তখন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়াতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের আদেশের মাধ্যমে গঠন করা হয় জিডিএফ (গ্যাস উন্নয়ন তহবিল)। ওই তহবিল গঠনের জন্য প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের বিপরীতে ভোক্তাদের উপর ৪৬ পয়সা চার্জ আরোপ করা হয়।
জিডিএফ ধারনা প্রথম উত্থাপন করেছিলেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. নুরুল ইসলাম। তিনি বলেছিলেন দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থায়ন সংকটের কারণে যথাসময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারে না। প্রকল্প নিয়ে বিদেশী সাহায্যের জন্য বসে থাকতে হয়, এতে কাজে অনেক বিলম্ব হয়। আর ঋণ প্রদানে দাতাদের নানা রকম শর্ত ও ফরমায়েশ থাকে, এতে অনেক সময় প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। এই তহবিলের অর্থ দিয়ে দেশীয় কোম্পানি বাপেক্স প্রকল্প গ্রহণ করবে যাতে দেশে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো যায়। এতে ভোক্তারা সাশ্রয়ী মূল্যে গ্যাস পাবেন।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) একেএম মিজানুর রহমান বলেন, এতোদিন জিডিএফ অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়ন হিসেবে বিবেচিত হতো। ওই প্রকল্প অনুমোদন দিতেন মন্ত্রী অথবা উপদেষ্টা। তারই ধারাবাহিকতায় ৯টি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় ছিল। এনইসির নতুন সিদ্ধান্ত ওই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন অনেক বিলম্বিত হওয়ার শঙ্কা করা হচ্ছে। এনইসির অনুমোদনের পর শুধু জিও জারি হতেই সময় লেগে যায় ৩ থেকে ৪ মাসের মতো। আর পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদনেও কয়েক মাসের ধাক্কা। যদি কোন ব্যাখ্যা চাওয়া হয় তাহলেতো কথাই নেই।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভার কার্যপত্রে বলা হয়েছে, স্বায়ত্বশাসিত সংস্থা, আধা স্বায়ত্বশাসিত সংস্থা, পাবলিক সেক্টর করপোরেশন এবং রাষ্ট্রায়াত্ব কোম্পানিসমূহ কর্তৃক শতভাগ নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাবিত প্রকল্প অনুর্ধ্ব ৫০ কোটি টাকা হলে বিভাগীয় প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (ডিপিইসি) সুপারিশক্রমে উদ্যোগী মন্ত্রণালয়/বিভাগের দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রী অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করবেন। প্রকল্প ব্যয় ৫০ কোটি টাকার বেশি হলে অন্যান্য প্রকল্পের অনুরূপ একনেক কর্তৃক অনুমোদন গ্রহণের প্রক্রিয়াকরণের নিমিত্ত পরিকল্পনা কমিশনে প্রেরণ করতে হবে।
এনইসি সভার কার্যপত্র ১৯ জানুয়ারি প্রকাশের ১০ দিন পর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত পত্র জারি করা হয়েছে। সেটা পাওয়ার পর উদ্বেগ বেড়েছে পেট্রোবাংলা, বাপেক্সসহ গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কোম্পানিগুলোর মধ্যে। চুড়ান্ত পর্যায়ে থাকা প্রকল্পগুলো ফেরৎ দেওয়া হবে। নতুন নিয়মের উপযোগী করে কাগজপত্র তৈরি করতে লম্বা সময় চলে যাবে। আবার পরিকল্পনা কমিশন ও এনইসির এতে দ্রুত কূপ খননের পরিকল্পনায় ভাটা পড়ার শঙ্কা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
ক্যাবের জ্বালানি বিয়ষক উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম গতকাল শুক্রবার দৈনিক সংগ্রামকে জানান , জিডিএফ’র টাকাটা ভোক্তাদের, এটা সরকারের না। সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে টাকাটা ব্যবহার করা। সরকার কাজটি করতে ফেল করেছে। এটি পরিচালনা করার কথা ছিল বিইআরসির, মন্ত্রণালয় নিজের হাতে নিয়েছে। ফেল করার কারণ মূল্যায়ণ ছাড়ায় কেবিনেট কেড়ে নিলো।এতে সরকারের কর্তৃত্ব আরও বেশি করে প্রতিষ্ঠিত হলো, অনিশ্চিত হয়ে গেলো জিডিএফ। অথচ মূল্যায়ন করে একটি গাইডলাইন দিতে পারতো।
অন্যদিকে জ্বালানি খাত পিছিয়ে থাকার আরেকটি বাঁধা হিসেবে বিবেচনা করা হয় তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ফিজিবিলিটি স্ট্যাডিকে। অনেক সমলোচনার পর তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার প্রক্রিয়া চুড়ান্ত করে এনেছিল বিগত সরকার।
ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি একদিকে যেমন সময়ক্ষেপন হয়, তেমনি কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করতে হয়। কনসালটেন্ট নিয়োগ প্রক্রিয়া খুবই দীর্ঘ প্রক্রিয়া, আবার অনেক ব্যয়বহুল। কনসালটেন্টের মাধ্যমে যে কাজ ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা খরচ হবে। একই কাজ পেট্রোবাংলা নামমাত্র মূল্য ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকায় সম্পন্ন করতে পারে। কনসালটেন্ট যে কাজ করতে কয়েকমাস সময় নেয়, সেই কাজ ১৫ দিনের মধ্যে শেষ করতে পারে বাপেক্স-পেট্রোবাংলা। কনসালটেন্ট যে কাজ করে, সেটাও পেট্রোবাংলার তথ্যের উপর নির্ভর করে এবং তাদের লোকজনের সহায়তা নিয়ে। মাঝ থেকে একটি গ্রুপ কিছু টাকা নিয়ে চলে যায়। অতীতে অনেক কূপ ব্যর্থ হয়েছে ভবিষ্যতেও হতে পারে এটাই নিয়তি। ১০টি অনুসন্ধান কূপ খনন করে ১টিতে গ্যাস পেলে বাণিজ্যিকভাবে সফল বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশে এই প্রাপ্তির হার তিন অনুপাত এক।
বিগত সরকারের সময়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় অনুসন্ধান কূপ, ২ডি, ৩ডির ক্ষেত্রে তৃতীয় পক্ষের ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি থেকে অব্যাহতি দিয়েছিল। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অনুমোদন পেলেই চূড়ান্ত হয়ে যেতো। কিন্তু অনুমোদন না দিয়ে বাতিল করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, জ্বালানি খাতের কাজের ধরণের সঙ্গে আর অন্য খাত মেলে না, এই কথাটিই বুঝানো দায়। ডিপিপি জটিলতা কেমন প্রভাব ফেলে তার এই নজীর হতে পারে পাবনার মোবারকপুর। মোবারকপুরে কূপ খনন করতে ১০ হাজার পিএসআই (চাপ বর্গ ইঞ্চি) ব্লোআউট কন্ট্রোল প্রিভেন্টার (বিওপি) নিয়ে কাজ শুরু করে। কূপ খননের সময় দেখা গেলো কূপের প্রেসার ১২ হাজার পিএসআই। চাপ আরও বাড়ন্ত ছিল, বাধ্য হয়ে কাজ বন্ধ রেখে ডিপিপি সংশোধন করতে হয়। যেহেতু ডিপিপিতে ১৫ হাজার বিওপির অর্থের সংস্থান ছিল না। আরডিপিপি অনুমোদন করতে এতে লম্বা সময় চলে যায়। তড়িৎ সিদ্ধান্তের প্রয়োজন পড়ে, যে কারণে অনেক ঝুঁকিপূর্ণ কাজ এড়িয়ে চলেন কর্মকর্তারা। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তেল-গ্যাস উন্নয়ন।