নিজস্ব উদ্যোগে তৈরি করা ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ করার ক্ষেত্রে নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এখন থেকে নিজস্ব উদ্যোগে তৈরি করা ক্যাপটিভ বিদ্যুতে ৫ মেগাওয়াটের বেশি কোনো স্থাপনায় গ্যাস সংযোগ দেওয়া হবে না। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত নতুন অফিস আদেশ জারি করা হয়েছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের উপসচিব মুহাম্মদ নাজমুল হাসান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশ পেট্রোবাংলা ও গ্যাসের সব বিতরণ কোম্পানিসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে প্রেরণ করা হয়েছে। বর্তমানে ১০ মেগাওয়াটের ওপরে সংযোগ পেতে হলে বিদ্যুৎ বিভাগের পূর্বানুমতি প্রয়োজন হয়। আর ১০ মেগাওয়াট পর্যন্ত ক্যাপটিভ বিদ্যুতের সংযোগের এখতিয়ার ছিল গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর। নতুন আদেশে তা কমিয়ে ৫ মেগাওয়াট করা হয়েছে। এমনকি পূর্বে অনুমোদিত শিল্প রান-এর লোড স্থানান্তরের সুযোগও থাকছে না বলে জানা গেছে।

২০২১ সালের আগ পর্যন্ত ক্যাপটিভের বিষয়টি অনেকটাই ইচ্ছাধীন ছিল। বিদ্যুৎকেন্দ্র যখন বেকার বসে থাকত, অন্যদিকে ক্যাপটিভ বিদ্যুতের সংযোগ বন্ধ করা যাচ্ছিল না। সে সময় ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ সংযোগের বিষয়ে ২০২১ সালের ৩১ আগস্ট একটি পরিপত্র জারি করা হয়। এতে বলা হয়, ১০ মেগাওয়াটের বেশি ক্যাপটিভ বিদ্যুতের সংযোগ পেতে হলে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক। ওই আদেশের পর কোনো কোম্পানিকে ১০ মেগাওয়াটের বেশি ক্যাপটিভে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।

শুধু টিকে গ্রুপ তাদের স্টিল মিলসে ১৬ দশমিক ৮ মেগাওয়াট সংযোগের অনুমোদন পেয়েছে।

ক্যাপটিভে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আপত্তি জানিয়ে আসছে বিদ্যুৎ বিভাগ। অন্যদিকে বরাবরই উদাসীন ছিল জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং তাদের অধীনস্থ বিতরণ কোম্পানিগুলো। যার ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্র বেকার পড়ে থাকলেও মূল্যবান গ্যাস যাচ্ছে ক্যাপটিভে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দিয়ে ক্যাপটিভে কমবেশি ৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। একই পরিমাণ গ্যাসে কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র ৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম। অর্থাৎ একই গ্যাসে দেড় গুণ বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব। তবুও বিদ্যুৎকেন্দ্র বসে রেখে চড়া দামে আমদানি করা গ্যাস ক্যাপটিভে ব্যবহৃত হচ্ছে।

২০২২-২৩ অর্থবছরে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে মোট ৯ হাজার ৭২৪ মিলিয়ন ঘনমিটার, আর একই সময়ে ক্যাপটিভে সরবরাহ হয়েছে ৫ হাজার ৩১০ মিলিয়ন ঘনমিটার।

ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা ও গ্যাসের চাহিদা নিয়ে বরাবরই লুকোচুরি করা হয়। পেট্রোবাংলার গ্যাস উৎপাদন বিবরণীতে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৬১৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হয়েছে, আর ক্যাপটিভে মাত্র ১০২ দশমিক ৪ মিলিয়ন ঘনফুট।

তবে গ্যাস বিতরণের দায়িত্বে থাকা ছয়টি কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদনে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। সবচেয়ে বড় বিতরণ কোম্পানি তিতাস গ্যাসের অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুৎকেন্দ্রে ২ হাজার ৭৫১ মিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস সরবরাহ করা হলেও ক্যাপটিভে দেওয়া হয়েছে ৩ হাজার ৯৮৯ মিলিয়ন ঘনমিটার।

চট্টগ্রাম অঞ্চলের কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির প্রতিবেদনেও ক্যাপটিভে বেশি সরবরাহের তথ্য রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৪৬৯ মিলিয়ন ঘনমিটার এবং ক্যাপটিভে ৫৬৭ মিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৭৭২ মেগাওয়াটে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭০০ মেগাওয়াট বেশি। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক ৩ হাজার ৬৮৫ মেগাওয়াট এবং ডিজেলভিত্তিক ৩ হাজার ৮৭ মেগাওয়াট।

বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, ক্যাপটিভ বিদ্যুতের লাইসেন্স ইস্যুর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ৪৭টি, ২০২১-২২ অর্থবছরে ১২৫টি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৫৯টি এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩১০টি লাইসেন্স ইস্যু করা হয়েছে।

পেট্রোবাংলার ২০২৫ সালের ২৭ ডিসেম্বরের দৈনিক গ্যাস সরবরাহ প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিদ্যুৎকেন্দ্রে ২ হাজার ৪৮৬ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ দেওয়া হয়েছে মাত্র ৬১৩ মিলিয়ন ঘনফুট। গ্যাস সংকটে ওই দিন অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বসে ছিল।

বর্তমানে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন একসময়কার ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে ১ হাজার ৭২০ মিলিয়নে নেমে এসেছে। আমদানি করেও সংকট সামাল দেওয়া যাচ্ছে না।

দেশীয় ফিল্ড থেকে প্রতি ঘনমিটার গ্যাস পাওয়া যায় প্রায় ১ টাকায়, আর আমদানি করা গ্যাসের খরচ প্রায় ৬৫ টাকা। দাম বেশি হওয়ার পাশাপাশি অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে আগামী দুই বছরে আমদানি বাড়ানোর সুযোগও নেই।

ক্যাপটিভ প্রশ্নে শিল্প মালিকদের দাবি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে ক্যাপটিভে বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। কয়েক সেকেন্ডের লোডশেডিংয়েও বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল নষ্ট হয়। তবে বিপিডিবির দাবি, ২০১২ সালে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের গ্যারান্টি দিয়ে ‘কিউ শ্রেণি’ চালু করা হলেও উ”চমূল্যের কারণে কোনো উদ্যোক্তা আবেদন করেননি।

বিইআরসিতে দাখিল করা বিপিডিবির এক চিঠিতে বলা হয়েছে, ক্যাপটিভে গ্যাস সরবরাহ করতে গিয়ে দক্ষ কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বঞ্চিত হচ্ছে। বিতরণ কোম্পানিগুলো বেশি দামে গ্যাস বিক্রি করতে পারায় ক্যাপটিভে সরবরাহে আগ্রহী।

১০ মেগাওয়াটের বেশি ক্যাপটিভ সংযোগে বিদ্যুৎ বিভাগের পূর্বানুমতির বাধ্যবাধকতা এড়াতে বিগত সরকারের সময়ে ভালুকার জামিরদিয়ায় এনআর গ্রুপকে ভিন্ন তিনটি গ্রাহক সংকেত দিয়ে ২৪ দশমিক ৯২ মেগাওয়াট সংযোগ দেওয়া হয়।

ক্যাপটিভে গ্যাসের অপচয় ও বিদ্যুৎকেন্দ্র বসে থাকায় বিপিডিবির ঘাটতি বাড়ছে। কেন্দ্র চালু থাকুক বা না থাকুক মাসে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে।

বিপিডিবি ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে শিল্পে বিদ্যুৎ ব্যবহার প্রত্যাশিত হারে না বাড়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।