আগামীকাল মঙ্গলবার শপথ নিতে যাচ্ছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপি জোটের সেই সরকারের মন্ত্রিসভার আকার কমবেশি ৩০ সদস্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে বলে জানা গেছে। মন্ত্রণালয় পরিচালনার অভিজ্ঞতা আছে এমন নেতাদের প্রাধান্য দেওয়ার পাশাপাশি থাকছেন কিছু তরুণও। অন্যবার মন্ত্রণালেয়ে স্থান পেতে দলীয় নেতাদের কাছে দৌড়ঝাপ দেয়ার খবর থাকলেও এবার সেটি শোনা যাচ্ছে না। দলের চেয়ারম্যান ও আগামী দিনের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই অভিজ্ঞ ও ক্লীন ইমেজের তরুণদের সমন্বয়ে মন্ত্রীসভা গঠনের সার্বিক কার্যক্রম দেখভাল করছেন।
সূত্রমতে, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় পর ক্ষমতা গ্রহণ করতে যাচ্ছে বিএনপি। গঠিত হতে যাওয়া সেই সরকারের মন্ত্রিসভা বড় হচ্ছে না। জানা গেছে, ১৯৯১ ও ২০০১ সালের বিএনপি সরকারের আদলে অভিজ্ঞ ও ক্লীন ইমেজের সংসদ সদস্যদের দিয়ে মন্ত্রিসভা গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন তারেক রহমান। তবে এবারো নতুন মন্ত্রী সভায় থাকছেন বেশ কয়েকজন তরুণ সংসদ সদস্যও।
বিএনপির কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা জানিয়েছেন, মন্ত্রিসভার সদস্য হচ্ছেন ৩০ সদস্যের কিছু কম বা বেশি। প্রতিরক্ষা-সশস্ত্র বাহিনী বিভাগসহ অন্তত ৫টি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন তারেক রহমান। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর হতে পারেন দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি। তবে নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগের প্রক্রিয়া দীর্ঘ হতে পারে। সেক্ষেত্রে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকবেন বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদ। এক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার অথবা কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন মহাসচিব।
নতুন মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, সালাহ উদ্দিন আহমদ, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ও ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের নাম আলোচনায় আছে। তবে ইমেজ সংকটে থাকায় স্থায়ী কমিটির দুই থেকে তিনজন প্রাথমিকভাবে না-ও থাকতে পারেন।
এছাড়া দলের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু, শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন ও ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, অ্যাডভোকেট মো. আসাদুজ্জামান, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির চৌধুরী, কেন্দ্রীয় নেতা শহীদ উদ্দিন চৌধুরী অ্যানি, বরকত উল্লাহ বুলু, আ ন ম এহছানুল হক মিলন, ওয়াদুদ ভূইয়া, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, রকিবুল ইসলাম বকুল, শরিফুল আলম, শ্যামা ওবায়েদ, আফরোজা খানম রিতা, মিজানুর রহমান মিনু, সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল, জাকারিয়া তাহের সুমন, অধ্যক্ষ সেলিম ভূইয়া, দীপেন দেওয়ান, মীর মোহাম্মদ হেলালসহ সর্বকনিষ্ঠ নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্য ফারজানা শারমিন পুতুলের নামও আছে খসড়া তালিকায়।
টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে আলোচনায় আছেন নজরুল ইসলাম খান, ইসমাইল জবিউল্লাহ, রুহুল কবির রিজভী, মাহাদী আমিন এবং ব্যারিস্টার হুমায়ুন কবির। এছাড়া সাবেক একজন সচিব ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের নামও শোনা যাচ্ছে।
বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে যুক্ত বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ, গণ সংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি এবং গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূরও মন্ত্রিসভায় থাকছেন বলে জানা গেছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় পৃথক করেছে। শিল্প ও বাণিজ্য এবং বিজ্ঞান ও আইসিটিসহ অনেকগুলো মন্ত্রণালয়কে পৃথক করা হয়েছিল। এবার সেই সব পৃথক মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয়ে তৈরি করা হবে একেকটি বড় মন্ত্রণালয়। এসব জায়গায় এনডিএম থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দেওয়া ববি হাজ্জাজ, বাংলাদেশ এলডিপি বিলুপ্ত করে বিএনপিতে আসা শাহাদাত হোসেন সেলিম, নির্বাচনের আগে বিএনপিতে যোগ দেওয়া সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এম এস কিবরিয়ার ছেলে ড. রেজা কিবরিয়াকে দেখা যেতে পারে।
জানা গেছে, দলের নেতাদের যাদের মন্ত্রী সভায় রাখা যাবে না তাদের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, বিশেষ সহকারীসহ সেক্টরভিত্তিক বিভিন্ন পদে রাখা হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, নতুন মন্ত্রিসভা কেমন হতে যাচ্ছে তা জানতে আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। এটা ঠিক যে, অভিজ্ঞদের যেভাবে রাখা হবে ঠিক তরুণদেরও স্থান দেয়া হবে। এক কথায় নবূন-প্রবীণের সমন্বয়ে এবারের মন্ত্রী সভা গঠিত হবে।
সরকার গঠন করতে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫১ আসন লাগে। এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২৯৯ আসনের মধ্যে এককভাবে ২০৯টি আসনে জয়লাভ করেছে। ২টি আসনের ফলাফল এখনো ঘোষণা করা হয়নি। আর ৩০০ আসনের মধ্যে একটি আসন নির্বাচনের আগেই স্থগিত করা হয়। বিজেপি ১টি, গণঅধিকার পরিষদ ১টি, গণসংহতি আন্দোলন ১টি ও এনডিএম ১টিসহ বিএনপি জোট পেয়েছে ২১৩টি আসন। ৭টি আসনে বিজয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও বিএনপির বিদ্রোহী। জামায়াত জোট বিজয় পেয়েছে ৭৭টি আসনে। এর মধ্যে শুধু জামায়াত ৬৮টি এবং এনসিপি ৬টি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস পেয়েছে ২টি আসন এবং খেলাফত মজলিস ১টি আসন। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন ১টি আসনে বিজয়ী হয়েছে।
এর আগে সবশেষ ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা পেলেও জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে সরকার গঠন করে। এরপর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তাতে বিএনপি জোট শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে না হওয়ায় ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে সবাই। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিলেও দিনের ভোট রাতে হওয়ায় এ নির্বাচনে কাক্সিক্ষত ফলাফল থেকে বঞ্চিত হয় বিএনপি। আর ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত একতরফা দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি ও তাদের সমমনা অনেক রাজনৈতিক দল। এরপর ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্র জনতার গণঅভুত্থানে ফ্যাসিস্ট সরকার পালিয়ে গেলে গত ১২ ফ্রেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। এরপরই চলে সরকার গঠনের তোড়জোড়।
জানা গেছে, বাংলাদেশে বর্তমানে মোট ৫৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ রয়েছে। আলোচনায় থাকা এসব নেতাদের মধ্যে কেউ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী পদ পেয়ে মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে পারেন। যার সমাপ্তি ঘটবে আগামীকাল মঙ্গলবার বিকেলের মধ্যেই।