৬ দফা দাবি পূরণ না হলে এলপিজি সরবরাহ ও বিপণন বন্ধের হুমকি ব্যবসায়ীদের

উৎপাদনে ভ্যাট ও অগ্রিম করের পরিবর্তে আমদানিতে ভ্যাট আরোপের দাবি লোয়াবের

বর্তমানে দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) চরম সংকটময় সময় চলছে বলে দাবি করেছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড। সংগঠনটি বলছে, ২৭টি কোম্পানির সাড়ে ৫ কোটি সিলিন্ডার বাজারজাত করা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১ কোটি ২৫ লাখ সিলিন্ডারে গ্যাস রিফিল (পুনরায় গ্যাস ভরা) হচ্ছে। তার মানে বাকি ৪ কোটি ২৫ লাখ সিলিন্ডার খালি পড়ে আছে।

আজ বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি সেলিম খান। তিনি বলেন, অধিকাংশ সিলিন্ডার খালি থাকায় পরিবেশকদের খরচ বেড়ে গেছে। বাজারে এলপিজির মূল্যবৃদ্ধির এটি অন্যতম কারণ। বেশির ভাগ কোম্পানি বন্ধ, তাই তাদের পরিবেশকেরা দেউলিয়া হওয়ার পথে। পড়ে থাকা সিলিন্ডারে এলপিজি সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে ভর্তুকি প্রদান করতে হবে।

জানা গেছে, কমিশন বৃদ্ধি, বিইআরসির একতরফা দাম ঘোষণা বন্ধসহ ছয় দফা দাবিতে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছে এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি। দাবি মেনে নেওয়া না হলে আজ বৃহস্পতিবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য এলপিজি সরবরাহ ও বিপণন বন্ধ করার হুমকি দিয়েছেন তারা।

সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) থেকে নতুন করে এলপিজির মূল্য সমন্বয় করতে হবে। প্রশাসন দিয়ে পরিবেশকদের হয়রানি ও জরিমানা বন্ধ করতে হবে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এসব দাবি পূরণ না হলে অনির্দিষ্টকালের জন্য সারা দেশে এলপিজি সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধ থাকবে।

প্রসঙ্গত, প্রতি মাসে এলপিজির মূল্য সমন্বয় করে বিইআরসি। সবশেষ ৪ জানুয়ারি নতুন মূল্য ঘোষণা করে কমিশন। এ নিয়ে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বিইআরসি পরিবেশকদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই মূল্য সমন্বয় করেছে। এলপিজির সংকট দূর করায় জোর না দিয়ে বাড়তি দাম নিয়ে বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে। ভোক্তা অধিকার অভিযান চালিয়ে আতঙ্ক তৈরি করছে। এতে অনেকে ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

বক্তব্যে বলা হয়, জ্বালানি বিভাগ, বিইআরসি ও এলপিজি কোম্পানি মিলে আমদানি সমস্যা দূর করা ছিল সঠিক সমাধান। তা না করে অভিযান চালিয়ে পরিবেশকদের হয়রানি করা হচ্ছে। পরিবেশক কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮০ টাকা ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৫ টাকা করার দাবি জানিয়েছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমিতি।

এদিকে দেশে বোতলজাত এলপি গ্যাসের বাজার স্থিতিশীল রাখতে এবং শিল্পের জন্য সুষ্ঠু বাণিজ্যিক পরিবেশ নিশ্চিতে উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট ও অগ্রিম করের পরিবর্তে আমদানিতে ভ্যাট আরোপের দাবি জানিয়েছে এলপিজি অপারেটরদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব)। এই প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। মঙ্গলবার এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে লোয়াব এই প্রস্তাব দেয়।

চিঠিতে লোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক উল্লেখ করেন, বর্তমানে এলপিজি উৎপাদন পর্যায়ে ৭.৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ২ শতাংশ অগ্রিম কর বিদ্যমান রয়েছে। এই অগ্রিম করের কারণে ব্যবসায়ীদের বিপুল পরিমাণ পুঁজি আটকে থাকে। অন্যদিকে, উৎপাদন ও বিপণনের বিভিন্ন পর্যায়ে কেউ কেউ ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে থাকে, যা সুষ্ঠু বাণিজ্যিক পরিবেশকে ব্যাহত করছে।

লোয়াবের প্রস্তাব অনুযায়ী, উৎপাদন পর্যায়ের ভ্যাট ও আগাম কর প্রত্যাহার করে আমদানি পর্যায়ে ১০ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করলে বাজারে স্থিতিশীলতা আসবে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে। ভোক্তাদের জন্য সহনীয় বাজারদর নিশ্চিত করতে এনবিআর-কে এই বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে সংগঠনটি।

এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, এলপিজি খাত থেকে রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা আনা এবং ভ্যাট ফাঁকি কমাতে স্থানীয় পর্যায়ের একাধিক ধাপের পরিবর্তে শুধুমাত্র আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এনবিআরের এক কর্মকর্তা জানান, স্থানীয় উৎপাদন, ব্যবসায়ী পর্যায়ের ভ্যাট এবং আগাম কর অব্যাহতির বিষয়ে বোর্ড ইতিবাচক। খুব শীঘ্রই এ বিষয়ে ১০ শতাংশ ভ্যাট আরোপের গেজেট প্রকাশিত হতে পারে। বর্তমানে এ খাত থেকে বছরে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করছে এনবিআর।

এদিকে, এলপিজি খাতের সংকট নিরসনে গত ৪ জানুয়ারি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় ভ্যাট কমাতে এনবিআর-কে চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি এলপিজি শিল্পকে ‘গ্রিন ইন্ডাস্ট্রি’ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে ব্যবসায়ীদের স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ার বিষয়েও প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে।