জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়ার প্রত্যাশা করছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন ডিসিতে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টে রাজনৈতিক বিষয়ক আন্ডার-সেক্রেটারি অ্যালিসন হুকার এবং সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের সঙ্গে বৈঠক করেন খলিলুর রহমান। সেখানে অ্যালিসন হুকার আগামী সংসদ নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা তুলে ধরেন। এছাড়াও সম্প্রতি আরোপিত মার্কিন ‘ভিসা বন্ড’ ব্যবস্থার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাতায়াত সহজ করার অনুরোধ জানিয়েছেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান। গতকাল শনিবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সম্ভব হলে বি-১ (স্বল্পমেয়াদী ব্যবসা) ভিসার ক্ষেত্রে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের এই ‘ভিসা বন্ড’ থেকে অব্যাহতি দিতে বিশেষ অনুরোধ করেন ড. খলিলুর রহমান।
খলিলুর রহমান যুক্তরাষ্ট্র থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কৃষিপণ্য আমদানি বাড়ানোর ফলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। তিনি সাম্প্রতিক ভিসা বন্ডের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ সহজ করার জন্য অনুরোধ জানান। সম্ভব হলে স্বল্পমেয়াদি ব্যবসায়িক বি১ ভিসার ক্ষেত্রে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের ভিসা বন্ড থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানান। খলিলুর রহমান গাজায় প্রস্তাবিত মোতায়েনযোগ্য আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর অংশ হতে নীতিগতভাবে বাংলাদেশের আগ্রহের কথাও জানান। অ্যালিসন হুকার বলেন, এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে একযোগে কাজ করতে আগ্রহী।
অ্যালিসন হুকার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকার এ বিষয়ে ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ভবিষ্যতে পর্যটকদের অতিরিক্ত সময় দেশটিতে থাকার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এলে যুক্তরাষ্ট্র ভিসা বন্ড-সংক্রান্ত বর্তমান শর্তাবলি পুনর্বিবেচনা করতে পারে। এ ছাড়া তিনি অনিবন্ধিত বাংলাদেশীদের প্রত্যাবর্তনে বাংলাদেশের সহযোগিতার জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
খলিলুর রহমান বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত সহায়তার প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। যুক্তরাষ্ট্র যে রোহিঙ্গাদের জন্য সর্ববৃহৎ দাতা এটি স্বীকার করে তিনি তাদের জন্য মার্কিন সহায়তা ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখার অনুরোধ জানান। অ্যালিসন হুকার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে উল্লেখযোগ্য বোঝা বহন করে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানান। রোহিঙ্গারা যত দিন বাংলাদেশে অবস্থান করবে, তত দিন তাদের জীবিকাভিত্তিক সুযোগ সম্প্রসারণের অনুরোধ জানান।
জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের জন্য ডিএফসি অর্থায়নে প্রবেশাধিকার এবং বাংলাদেশে সেমিকন্ডাক্টর উন্নয়নের জন্য অর্থায়নে প্রবেশাধিকার দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ করেন। আন্ডার সেক্রেটারি এসব প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্র বিবেচনা করবে বলে আশ্বাস দেন। পল কাপুরের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে খলিলুর রহমান পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। এর মধ্যে ছিল বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন, যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, রোহিঙ্গা সংকট, যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বন্ড, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং অন্যান্য আঞ্চলিক বিষয়।
জবাবে অ্যালিসন হুকার বিষয়টি আমলে নেন এবং মার্কিন সরকার এই পদক্ষেপটি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে বলে আশ্বাস দেন। ভবিষ্যতে যদি পর্যটকদের নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অতিরিক্ত অবস্থানের (ওভারস্টে) হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে, তবে যুক্তরাষ্ট্র এই বন্ডের প্রয়োজনীয়তা পুনর্বিবেচনা করতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি। এছাড়া নথিপত্রহীন বাংলাদেশীদের স্বদেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ঢাকার আন্তরিক সহযোগিতার ভূয়সী প্রশংসা করেন হুকার।
ওয়াশিংটনে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির সাথে খলিলুর রহমানের বৈঠক: জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ওয়াশিংটন ডিসিতে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত জেমিসন গ্রিয়ারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। গত শুক্রবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায়, ড. খলিলুর রহমান যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডন লিঞ্চের সঙ্গেও একটি পৃথক বৈঠক করেছেন।
রাষ্ট্রদূত গ্রিয়ারের সঙ্গে বৈঠককালে ড. খলিলুর রহমান বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর অগ্রগতি তুলে ধরেন। খলিলুর রহমান বলেন, ‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে উল্লেখযোগ্য হারে আমদানি বাড়িয়ে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর ক্ষেত্রে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ। ইতোমধ্যে চুক্তির কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক বাস্তবায়নও করা হয়েছে।’ এর প্রেক্ষিতে ড. রহমান বর্তমানে কার্যকর থাকা ২০ শতাংশ ‘ রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ বা পারস্পরিক শুল্ক কমানোর প্রস্তাব দেন। রাষ্ট্রদূত গ্রিয়ার এই প্রস্তাবটি ইতিবাচকভাবে বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন।
বৈঠকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক মো. আরিফুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির পক্ষে তার সহকারী ব্রেন্ডন লিঞ্চসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এদিকে পৃথক এক বৈঠকে মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের সঙ্গে ড. খলিলুর রহমান দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। বাংলাদেশে নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের শপথ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগ দেন ড. খলিলুর রহমান। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর আয়োজিত এ শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনা ও সম্পদ বিষয়ক উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইকেল জে রিগাস। অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত, দূতাবাসের কর্মকর্তা, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ও সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং শীর্ষ ব্যবসায়ীরা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে পাশে থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।