গ্যাসের সংকট সামলাতে পারছে না সরকার। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন টানা কমছে। চাইলেও বাড়তি আমদানি করা যাচ্ছে না, কেননা তেমন অবকাঠামো তৈরি নেই। এ পরিস্থিতিতে অলস পড়ে থাকা ভোলার গ্যাস ব্যবহারে সক্রিয় হয়েছে জ্বালানি বিভাগ। এরই অংশ হিসেবে ভোলায় গ্যাসভিত্তিক আরও ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের নীতিগত অনুমোদন পাওয়া গেছে। বিদ্যুৎ বিভাগের পাশাপাশি পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকেও সায় পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোঃ রেজাউল করিম।
ভোলার উদ্বৃত্ত গ্যাস এলএনজি আকারে আনার পরিবর্তে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্তকে যথাযথ বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্তবর্তীকালীন সরকার ভোলা থেকে দৈনিক ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আনার তোড়জোড় শুরু করেছিল। এলএনজি আনার পরিবর্তে ভোলায় বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হলে শুধু পরিবহন খরচ বাবদ রাষ্ট্রের ৯৩০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বলে দাবি করেছে বিপিডিবি। বিপিডিবির অতিরিক্ত পরিচালক (অর্থ পরিদফতর) সৈয়দ জুলফিকার আলী বলেছেন, ভোলা থেকে এলএনজি আকারে গ্যাস আনার প্রস্তাবে প্রতি ঘনমিটারের পরিবহন খরচ প্রস্তাব করা হয়েছে ২৯.৯০ টাকা। প্রস্তাবিত ৩০ মিলিয়ন এলএনজি পরিবহনে বছরে খরচ হবে ৯৩০ কোটি টাকা। দশ বছরের চুক্তির বিপরীতে ৯৩০০ কোটি টাকা পরিবহন খরচ পরিশোধ করতে হবে।
তিনি বলেছেন, ১ ঘনমিটার গ্যাস দিয়ে ৪ থেকে ৫ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। সেই বিদ্যুৎ সঞ্চালন করে ঢাকায় আনতে খরচ পড়বে ১.২৪ টাকা। এতে কোন রকম বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই। আমাদের বিদ্যমান লাইন (ভোলা-বরিশাল) দিয়েই ওই বিদ্যুৎ সঞ্চালন করা সম্ভব। তিনি বলেন, ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পরিবহনে বছরে খরচ হবে ৯৩০ কোটি টাকা। দুই বছরের সমপরিমাণ টাকা হলেই ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা সম্ভব। ২০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাস প্রয়োজন হবে ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট। পেট্রোবাংলা ওই পরিমাণ গ্যাস ঢাকা এলাকায় বিদ্যুতে সরবরাহ কমিয়ে দিতে পারে। এতে ঢাকা এলাকায় শিল্পের গ্যাস সংকটও দূর হলো, আবার আমাদের বিদ্যুতের সংকটও দূর হবে।
বিপিডিবির মালিকানাধীন আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি ভোলায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব দিয়ে বসে আছে। গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা পেতে ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব বরাবরে আবেদন দিয়েছে বলে জানা গেছে। কিন্তু দীর্ঘদিন বিষয়টি ঝুলিয়ে রেখে এলএনজি আকারে গ্যাস আনার তোড়জোড় ছিল। এ জন্য ৪টি কোম্পানির সংক্ষিপ্ত তালিকা করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন, কোয়ালিটি গ্যাস সরবরাহ আশা করা কঠিন, গ্যাস নাই আমি কি করবো। গরম যত বেশি আসবে গ্যাসের চাপ কমবে । তিনি বলেন, গ্যাস সংকট নিয়ে নিউজ হচ্ছে, এটা নিউজ নয়। ব্যবস্থাপনা জনিত কারণে কোন সমস্যা হলে তখন বলতে পারতেন। গ্যাসের কূপ খনন করা হয়নি। আমরা বিদেশের উপর নির্ভরশীল থাকতে চাই না। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিচ্ছি। রিগ কেনা হবে, সেখানে দক্ষ জনবল দরকার। সে জন্য প্ল্যান করা হচ্ছে, এ জন্য সময় দিতে হবে। গ্যাস নাই অথচ আবাসিক গ্রাহকের কাছ থেকে পুরো বিল আদায় করা হচ্ছে কেনো! এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, মিটার নেন তাহলে সমস্যা থাকে না। আমরা অবশ্যই মিটার দেবো। তখন আবার বলিয়েন না, জোর করে মিটার দেওয়া হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, সম্ভাব্য সকল বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে বিস্তারিতভাবে অবগত করতে হবে। কি করতে হবে সেখান থেকে নির্দেশনা নিতে হবে। কারণ এটা খুবই স্পর্শকাতর মন্ত্রণালয়।
স্যালো নলকূপ থেকে বের হচ্ছে গ্যাস: ভোলায় একটি স্যালো নলকূপ থেকে বের হচ্ছে গ্যাস। অনিয়ন্ত্রিতভাবে গত তিন দিন ধরে প্রাকৃতিক এ গ্যাসের উদগীরণ নিয়ে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এমন অবস্থতায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তিন দিন আগে ভোলা সদরের ধনিয়া ইউনিয়নের তুলাতলী গ্রামের জেবল হক মাঝি বাড়িতে স্যালো নলকূল বসায় ওই বাড়ির লোকজন। মাটির ৭০ ফুট নিচে পাইপ বসানোর কাজ শেষ হলে যখন পানি উত্তোলন করার চেষ্টা করা হয়, তখন ওই নলকূপ থেকে পানি বের না হয়ে সো সো শব্দ করে গ্যাস বের হতে থাকে। স্থানীয়রা তখন নলকূলে পরীক্ষার জন্য লাইটার আগুন জ্বালালে নলকূল থেকে ধাউ ধাউ করে আগুন জ্বলে উঠে। এলাকাবাসী জানায় , আমাদের গ্রামে ৩০০ ফুট নিচেও টিউবওয়েল খনন করা হয়েছিল, কিন্তু তখন এমনটি হয়নি, এখন যেহেতু গ্যাস বের হচ্ছে এটি আমাদের জন্য চিন্তার বিষয়। এ ব্যাপারে ভোলা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুজ্জামান বলেন, বিষয়টির পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বাপেক্স কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখবেন।
জানা গেছে, ভোলায় আবিষ্কৃত তিনটি গ্যাসক্ষেত্রের দুটিতে উৎপাদন শুরু হয়নি। আড়াই দশক আগে আবিষ্কৃত অন্য গ্যাসক্ষেত্রে এখন উৎপাদিত হচ্ছে সক্ষমতার অর্ধেক। সোয়া ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাসের মজুত আছে এখানে। চলমান জ্বালানিসংকটের মধ্যে ভোলার গ্যাস কাজে লাগাতে নতুন করে পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এই গ্যাস ব্যবহার করে ভোলাতেই শিল্পাঞ্চল গড়ার চিন্তা করা হচ্ছে। জ্বালানি বিভাগ সূত্র বলছে, ভোলায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তাদের জন্য বিসিক, বড় উদ্যোক্তাদের নিয়ে শিল্পাঞ্চল ও বিদেশী বিনিয়োগ নিয়ে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ইপিজেড) করার চিন্তা করছে সরকার। এর বাইরে একটি সার কারখানা নির্মাণে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে বেসরকারি উদ্যোগে বড় বিনিয়োগ শুরু করেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক গোষ্ঠী প্রাণ-আরএফএল। আরেক ব্যবসায়িক গোষ্ঠী শেলটেকও ভোলায় সিরামিক কারখানা স্থাপন করেছে। সেখানে উৎপাদন ২০১৯ সালে শুরু হয়েছে।
তিন কোটি ঘনফুট গ্যাস এনে শিল্পে সরবরাহের চিন্তা : বেসরকারি উদ্যোগে দিনে তিন কোটি ঘনফুট গ্যাস এনে শিল্পে সরবরাহের চিন্তা করা হচ্ছে। এ জন্য ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম নির্ধারণে সম্প্রতি শুনানি করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলটরি কমিশন (বিইআরসি)। কমিশন কার্যালয়ে এটি অনুষ্ঠিত হয়। প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ৪৭ টাকা ৫০ পয়সা প্রস্তাব করা হয়েছে। ভোলা থেকে আনা সিএনজির দামও একই। তবে এলএনজির দাম নির্ধারণ নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁরা বলছেন, ভোলার গ্যাস স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবহার করতে তুলনামূলক কম দামে গ্যাস সরবরাহের কথা বলেছিল জ্বালানি বিভাগ। নতুন শিল্পকারখানায় সংযোগের ক্ষেত্রে এখন প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম ৪০ টাকা। ভোলায় শিল্প হলে এটি ৩০ টাকা করার কথা। এ দাম নির্ধারণ না করেই এলএনজির দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে। অথচ ভোলায় বিনিয়োগ উৎসাহী করতে গত নভেম্বরে সরকারের তিনজন উপদেষ্টা ভোলা ঘুরে এসেছেন।
সরকারি অর্থায়নে ভোলায় একটি সার কারখানা করতে এরই মধ্যে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ভোলায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য বিসিক, বড় উদ্যোক্তাদের নিয়ে শিল্পাঞ্চল ও বিদেশী বিনিয়োগ নিয়ে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ইপিজেড) তৈরির কথা বলেছে সরকার। ভোলায় আরেক ব্যবসায়িক গোষ্ঠী শেল্টেক্রে সিরামিক কারখানা উৎপাদন শুরু করেছে ২০১৯ সালে। ৬ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে অন্যতম শীর্ষ ব্যবসায়িক গোষ্ঠী প্রাণ-আরএফএল। এর মধ্যে এলএনজি করে আনার এ প্রক্রিয়া ভোলায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শুনানিতে অংশ নিয়ে ভোলার গ্যাস এলএনজি করে আনার বিরোধিতা করেন অনেকে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) অতিরিক্ত পরিচালক (অর্থ পরিদপ্তর) সৈয়দ জুলফিকার আলী বলেন, এলএনজি রূপান্তর ও পরিবহনে খরচ ধরা হয়েছে ২৯ টাকা ৯০ পয়সা। দিনে ৩ কোটি ঘনফুট করে আনা হলে বছরে খরচ হবে প্রায় ৯৩০ কোটি টাকা। ১০ বছরে খরচ হবে ৯ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। রাষ্ট্রের এই টাকা অপচয় না করে ভোলায় ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হোক। পিডিবির পক্ষ থেকে বলা হয়, ১ ঘনমিটার গ্যাস দিয়ে ৪ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। সেই বিদ্যুৎ ঢাকায় আনতে ইউনিটে খরচ পড়বে ১ টাকা ২৪ পয়সা। এতে কোনো রকম বিনিয়োগ প্রয়োজন নেই। শুনানিতে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ভোলায় আরও গ্যাস পাওয়া যেতে পারে। ভবিষ্যতে পাইপলাইন করা লাগবেই। সবার মতামত কমিশন বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে।
পেট্রোবাংলার তথ্য বলছে, দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। সরবরাহ করা হয় সর্বোচ্চ ২৭০ থেকে ২৭৫ কোটি ঘনফুট। ১০৫ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি আছে। অনুসন্ধান ও উৎপাদনে জোর দিয়ে কূপ খনন করা হচ্ছে। ভোলায় বর্তমানে দিনে উৎপাদন সক্ষমতা ১২ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে ৯ কোটি ঘনফুট। তবে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে নতুন নতুন কূপ খনন করা হচ্ছে ভোলায়।