আজ ১৪ ডিসেম্বর, রোববার। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ১৪ ডিসেম্বর গুরুত্বপূর্ণ ও ঘটনাবহুল একটি দিন। বাংলাদেশের বিজয় আসন্ন জেনে এদিন হত্যা করা হয় জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। এদিন তুলে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, বাংলা বিভাগের অধ্যাপক নাট্যকার মুনীর চৌধুরীসহ বহু। নিয়ে যাওয়া হয় সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক শহীদুল্লা কায়সারকে। এদিন একে একে বহু বুদ্ধিজীবীকে নিজ নিজ বাসা থেকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় অজ্ঞাত স্থানে।
এদিন গভর্নর হাউসে গভর্নর ডা. এম এ মালিকের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের মন্ত্রিসভার সদস্যরা ১৪ ডিসেম্বর বৈঠকে বসেন। এ সময় বৈঠকের খবর শুনে ভারতীয় মিত্র বাহিনী সকাল সোয়া ১১টার দিকে গভর্নর হাউসে বিমান হামলা চালায়। এসময় গভর্নর হাউস বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রাণ বাঁচাতে গভর্নর এম এ মালিক দৌড়ে গিয়ে এয়ার রেইড শেল্টারে গিয়ে আশ্রয় নেন। এসময় তিনি পদত্যাগ পত্র লিখে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে পালিয়ে যান। বিকেলে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কাছ থেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমীর আবদুল্লাহ নিয়াজী যুদ্ধবিরতির জন্য প্রস্তাব অনুমোদন করেন। এরপর ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের কাছে যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব পাঠায়।
১৪ ডিসেম্বর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ফের ভেটো দেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। এর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি উপমহাদেশে যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান জানিয়ে যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব উত্থাপন করলে সোভিয়েত ইউনিয়ন তৃতীয় বারের মতো ভেটো দেয়। এদিন মার্কিন প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয় ১১টি দেশ। অন্যদিকে পোল্যান্ড ও সোভিয়েত ইউনিয়ন বিপক্ষে ভোট দেয় আর ভোটদানে বিরত থাকে ব্রিটেন ও ফ্রান্স।
১৪ ডিসেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের পাশে শহীদ হন বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন শহীদ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। ভোরে মাত্র ২০ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে বারঘরিয়া এলাকা থেকে ৩-৪টি দেশী নৌকায় করে রেহাইচর এলাকা থেকে মহানন্দা নদী অতিক্রম করেন মুক্তিযোদ্ধারা। নদী অতিক্রম করার পর উত্তর দিক থেকে একটি একটি করে প্রত্যেকটি শত্রু অবস্থানের দখল নিয়ে দক্ষিণে এগোতে থাকেন। তিনি এমনভাবে আক্রমণ পরিকল্পনা করেছিলেন যেন উত্তর দিক থেকে শত্রু নিপাত করার সময় দক্ষিণ দিক থেকে শত্রু কোনোকিছু আঁচ করতে না পারে। এভাবে এগুতে থাকার সময় জয় যখন প্রায় সুনিশ্চিত তখন ঘটে বিপর্যয়। হঠাৎ বাঁধের ওপর থেকে ইস্ট পাকিস্তান সিভিল আর্মড ফোর্সের ৮-১০ জন সৈন্য দৌড়ে চর এলাকায় এসে যোগ দেয়। এরপরই শুরু হয় পাকিস্তানী বাহিনীর অবিরাম ধারায় গুলিবর্ষণ। ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর জীবনের পরোয়া না করে সামনে এগিয়ে যান। যখন আর একটি মাত্র শত্রু অবস্থান বাকি রইল এমন সময় মুখোমুখি সংঘর্ষে বাংকার চার্জে শত্রুর বুলেটে এসে বিদ্ধ হয় জাহাঙ্গীরের কপালে। শহীদ হন তিনি।
১৪ ডিসেম্বর ফরিদপুর থেকে ঢাকার পথে মধুমতী নদী পেরিয়ে অনেকদূর এগিয়ে যায় মুক্তিবাহিনী। এ দিন একাধারে শত্রুমুক্ত হয় কেশবপুর, মোড়েলগঞ্জ, শাহজাদপুর, শেরপুর, শিবগঞ্জ, উল্লাপাড়া, তাড়াইল, আক্কেলপুর, পাঁচবিবি, নবীনগর, সাভার, কালিয়াকৈর, গজারিয়া, মির্জাপুর, কাউখালি, চিলমারী, দোহাজারী, নাজিরহাট ও সান্তাহার রেল জংশন। 'কে' ফোর্সের নবম ও দশম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং বিভিন্ন কোম্পানির মুক্তিযোদ্ধারা নারায়ণগঞ্জের মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে যায়। এরপর তারা বালু নদীর পাড়ে অবস্থান নেন। ১৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে মুক্তিবাহিনী কুমিরায় শত্রুবাহিনীর অস্থানের ওপর বড় ধরনের আক্রমণ চালিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের দিকে এগিয়ে যায়। ক্যাপ্টেন গফফারের নেতৃত্বে চতুর্থ বেঙ্গলের একটি দল চট্টগ্রাম রাঙ্গামাটি রোড ধরে কুমিরা পাহাড় অতিক্রম করে হাটহাজারির দিকে এগিয়ে যায়।
এই দিন ক্যাপ্টেন জাফর ইমামের নেতৃত্বে দশম ইস্ট বেঙ্গলের মুক্তিযোদ্ধারা দুপুর ১২টার দিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পৌঁছায়। পাকিস্তানী বাহিনীর একটি ব্রিগেড বার্মায় পালানোর সময়ে মুক্তিবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে।
১৪ ডিসেম্বর সিলেটে চিকনাগুল চা বাগানে যুদ্ধ চলমান থাকে। মুক্তিবাহিনীর আক্রমণে শত্রুবাহিনী খাদিমনগরের দিকে পালিয়ে যায়। মুক্ত হয় বান্দরবান। এর আগে বান্দরবানের কালাঘাটা, ডলুপাড়া, ক্যানাই জ্যু পাড়াসহ কয়েকটি স্থানে পাকিস্তানী বাহিনীর সঙ্গে ব্যাপক যুদ্ধ হয় মুক্তিবাহিনীর। এক পর্যায়ে টিকতে না পেরে শত্রু বাহিনী বান্দরবান ছেড়ে পালিয়ে যায়।
এই দিন সিরাজগঞ্জ মুক্ত হয়। এর আগে ১৩ ডিসেম্বর রাতে মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার আমির হোসেন ভুলুর নেতৃত্বে শৈলাবাড়ীতে শত্রু বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এক পর্যায়ে টিকতে না পেরে ঈশ্বরদীর দিকে ট্রেনে করে পালিয়ে যায় শত্রুবাহিনী। পরে সকালে সিরাজগঞ্জ শহরে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়।