প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাচ্ছে কার্যক্রমে নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা কৌশলে পুনরায় রাজপথে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে সরকারের কাছে। এজন্য তারা ভয়ঙ্কর সব ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তারের চেষ্টা করছে বলেও জানা গেছে। দলটির নেতা-কর্মীরা দেশে একটি অরাজক পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টাও করছে। বিশেষ করে গোপন পরিকল্পনার মাধ্যমে ধর্মীয় বিষয়কে কাজে লাগিয়ে দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে তথ্য রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। সূত্র বলছে, অশুভ উদ্দেশ্যে দেশের অভ্যন্তরে উগ্রবাদী হামলার নাটক মঞ্চস্থ করতে ছক আঁকছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ ও তাদের সহায়ক শক্তি।
এদিকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সারাদেশে পুলিশকে ‘প্রয়োজনীয় সতর্কতার’ পাশাপাশি নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দিয়েছে সদর দপ্তর। আগামী ২৩ জুন দলটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে সামনে রেখে বৃহস্পতিবার পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এ বিষয়ে একটি ‘জরুরি বার্তা’ পাঠানো হয়েছে। দেশের সব মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ও রেঞ্জ ডিআইজি বরাবর পাঠানো ওই বার্তায় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে দলটির ‘সম্ভাব্য কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন’ করার কথা বলা হয়েছে। বার্তায় বলা হয়, সেদিন দলটির তরফে দেশের বিভিন্ন জেলায় দলীয় কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলন এবং প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ব্যানার নিয়ে প্রকাশ্যে মিছিল করতে পারে। এর ফলে দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে এনসিপির নেতাকর্মী ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের সঙ্গে সংঘর্ষের আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি তাদের কর্মকাণ্ডে বাধা দিলে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর ওপর ক্ষুব্ধ হতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হয়েছে। এ অবস্থায় এসব বিষয় গুরুত্বে নিয়ে প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয়েছে ওই বার্তায়। এ বিষয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন থেকে আগাম সতর্কতার অংশ হিসেবে সারা দেশে ওই বার্তা দেওয়া হয়েছে। পুলিশের গোপন চিঠির তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের এই সম্ভাব্য কর্মসূচিগুলোকে কেন্দ্র করে অন্যান্য সক্রিয় রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মীদের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষের বড় ধরনের আশঙ্কা রয়েছে। চিঠিতে আরও সতর্ক করা হয়েছে, এসব কর্মসূচিতে কোনো পক্ষ বাধা সৃষ্টি করলে বা পুলিশ হস্তক্ষেপ করতে গেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপরও হামলার ঝুঁকি রয়েছে।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিক সম্মেলনে এ বিষয়ে কথা বলেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন নজরুল ইসলাম। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘২৩ জুন একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এটিকে কেন্দ্র করে আমরা সতর্ক অবস্থানে আছি।’ অতিরিক্ত কমিশনার আরও জানান, জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি যাতে তৈরি না হয়, সে জন্য অতীতের মতো প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল পয়েন্টে পুলিশের তল্লাশিচৌকি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং তা চলমান থাকবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সারা বছরই বিভিন্ন কর্মসূচি থাকে। আমাদের সামনে বড় কর্মসূচি হচ্ছে ১০ মহররম বা আশুরা। পাশাপাশি ২৩ জুন (আওয়ামী লীগ) একটি দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী রয়েছে। আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে আছি। নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চেকপোস্ট, টহল, বিশেষ অভিযানসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।’
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর থেকে দলটির সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও শীর্ষ নেতাদের একে একে গ্রেপ্তার করা হয়। অধিকাংশ জ্যেষ্ঠ নেতা বর্তমানে আত্মগোপনে থাকায় দলটির নিয়মিত কোনো রাজনৈতিক কার্যক্রম নেই। গণআন্দোলন দমনে শত শত মানুষকে হত্যার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের বিচার চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। বিচার প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত দলটির সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রমে আইনি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে এর মধ্যেও দেশের দু’একটি জায়গায় মাঝেমধ্যে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিলের চেষ্টা করতে দেখা গেছে, যা নিয়ে মাঠপর্যায়ে এখনও চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
এদিকে বৃহস্পতিবার রাজধানীতে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা-কর্মী ঝটিকা মিছিল দিয়ে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। ঘটনাস্থল থেকে চারজনকে আটক করে পুলিশ। আটককৃতরা হলেন- মিজানুর রহমান হাওলাদার (৪০), শামীম আর বেবি (৫০) ও শামীম হোসেন (৪৮) । প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল ৯টার দিকে মহাখালীর আইসিডিডিআরবি সামনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী জড়ো হন। পরে তারা মহাখালী বাস টার্মিনালের দিকে একটি ঝটিকা মিছিল শুরু করেন। টার্মিনাল এলাকায় এলে মহিলা লীগেরও কয়েকজন যুক্ত হয়। এ সময় মিছিল থেকে বেশ কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যায় তারা। এসময় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ অভিযান চালায় এবং তিনজনকে আটক করে। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার ওসি মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকর্মী মিছিল করেছে। তারা ৪ থেকে ৫টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়।
এর আগে বুধবার কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক ভূমিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ এবং সাবেক সংসদ সদস্য অনুপম শাহজাহান জয়ের ফেসবুক পেজের অ্যাডমিন শিশির মুন্নাকে (২৮) গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক ভূমিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ এবং সাবেক সংসদ সদস্য অনুপম শাহজাহান জয়ের ফেসবুক পেজের অ্যাডমিন শিশির মুন্নাকে (২৮) গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ। ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিক সম্মেলনে এ তথ্য জানান ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম। এ ছাড়া গত ১২ জুন রাজধানীর তেজগাঁওসহ ঢাকার তিন জায়গায় আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল থেকে আটজনকে আটক করে পুলিশ। পরে তাদের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।