ছাত্র জনতার ঐতিহাসিক গণঅভূত্থানে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর গেল বছরটি নানা কারণে ছিল আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে। বিশেষ করে নির্বাচন ও সংস্কার প্রশ্নে গত বিদায়ী সালটি বাংলাদেশের ঘটনাবহুল সময়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্নে জনগণের প্রবল আকাক্সক্ষাই ছিল বছরটির মূল বিষয়। নতুন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গতিপথ অনেকটাই নির্ধারিত হয়েছে বিদায়ী বছরে। এই সময়ে সংস্কার, নির্বাচন, নিরাপত্তা জোরদার করার ক্ষেত্রে বেশ কিছু দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে অনেকেই আসন্ন জাতীয় নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হবে বলে অনেকটা বিশ^াস করছেন। যদিও শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার মতো যথেষ্ট বিশ^াসযোগ্যতা এই সরকার অর্জন করতে পারেনি।
সূত্রমতে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণআন্দোলনের পর দীর্ঘ প্রতীক্ষিত জাতীয় ও গণভোটের জন্য বাংলাদেশ যখন প্রস্তুত হচ্ছে, তখন দেশটির রাজনৈতিক মঞ্চ আবারও জোট পরিবর্তন, কৌশলী চাল ও আদর্শিক অবস্থান নিয়ে পরিবর্তনের দৃশ্যমান অবস্থান দেখা গেছে। প্রবাসী বাংলাদেশীরা প্রথমবারের মতো ভোট দেবে বলে আশা করা হচ্ছে ও বিপুলসংখ্যক তরুণ ভোটারের অন্তর্ভুক্তির ফলে ঐতিহাসিক নির্বাচন হতে যাচ্ছে। যদিও ফ্যাসিস্ট সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পালিয়ে যাবার ১৬ মাস পরেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তর অসম্পূর্ণ ও সংস্কার কাজ অসমাপ্ত রয়ে গেছে। নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রস্তুতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গেল বছরটিতে তাদের চ্যালেঞ্জের মাত্রা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি ছিল এবং এই ভিশন বাস্তবায়নে তারা ক্রমাগত পাহাড়সম চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন। সংস্কারসহ নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও সুবিধাবাদীদের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার কারণে এখনো ভঙ্গুর রাজনৈতিক দৃশ্যপট। ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান যে জঞ্জাল সরাতে চেয়েছিল, পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি এবং অভিজাতদের তাৎক্ষণিক স্বার্থসিদ্ধির অদূরদর্শী খেলা সেই জঞ্জালকেই গেল বছরজুড়ে স্থায়ী করার উপক্রম দেখা গেছে।
জুলাইয়ের আন্দোলনের পরবর্তীতে সংস্কার ও সহনশীলতার ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির যে প্রতিশ্রুতি জোরালোভাবে উচ্চারিত হয়েছিল, তা বিদায়ী বছরেও বাস্তবায়িত হয়নি। ড. ইউনূসের বড় দলগুলোকে সহযোগিতার জন্য আহ্বান জানালেও ঐকমত্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। এমনকি নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা বা রাজনৈতিক সমাবেশের আচরণের মতো ছোটখাটো বিষয়ে সমঝোতাও পারস্পরিক অবিশ্বাসের ভারে ভেঙে পড়েছে। রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর ক্রমশ উসকানিমূলক হয়ে উঠছে ও সহিংসতা নিত্যনৈমিত্তিক ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে। গেল বছরে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে মতবিরোধ দ্রুতই প্রকাশ্য অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে রূপ নেয়। বিএনপি দাবি করে যে অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার প্রতিশ্রুতিগুলো বেছে বেছে প্রয়োগ করছে, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি অভিযোগ করে যে বিএনপি আলোচনায় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী শরীফ ওসমান হাদিকে হত্যাার মাধ্যমে তার আরও স্পষ্ট হয়েছে। রাজনৈতিক সংঘাত, দলের অন্তকোন্দল, দখল, চাঁদাবাজিতে ক্লান্ত নাগরিকরা ক্রমেই সন্দিহান হয়ে পড়ছেন যে, আসন্ন নির্বাচন কি প্রকৃত পরিবর্তন আনবে, নাকি কেবল অভিজাতদের পুনর্বিন্যাসের আরেকটি রাউন্ড হবে।
২০২৫ সালে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠেছে। বিএনপি পশ্চিমা অংশীদারদের গণতান্ত্রিক শাসন ও মানবাধিকারের প্রতি তাদের অঙ্গীকারের বিষয়ে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছে এবং নিজেদের এমন একটি মধ্যপন্থী শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে। প্রতিটি বড় দল দেশে ভোটের জন্য প্রচার চালাচ্ছে, আবার একই সঙ্গে বিদেশেও স্বীকৃতি চাইছে, এই দ্বৈত প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথকে আরও জটিল করে তুলেছে।
২০২৫ সালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির রূপান্তর। একসময় যাকে দলীয় লেজুড়বৃত্তির দুর্নীতিগ্রস্ত রূপ হিসেবে বাতিল করে দেওয়া হতো, সেই যুব মোবিলাইজেশন বা তরুণদের সংগঠিত করার বিষয় এখন নির্বাচনী গতিপ্রকৃতির এক শক্তিশালী চালিকাশক্তি হিসেবে পুনরায় আবির্ভূত হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী নিশব্দে নির্বাচনে বড় ধরনের সাফল্যের জন্য নিজেদের অবস্থান তৈরি করছে। তাদের বিস্তৃত যুব ভিত্তি, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও সামাজিক ইস্যুগুলোর ওপর ফোকাস ইঙ্গিত দেয়, তারা সংসদে সরকার গঠনের মতো উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারে। এনসিপি শহুরে নির্বাচনী এলাকাগুলোতে সীমাবদ্ধ থাকলেও তাদের উপস্থিতি হয়তো বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রজন্মগত পরিবর্তনের সূচনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
১৯৪৭ সালের দেশভাগ থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় জনগণই ছিল রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। বর্তমানে রাজনীতির ভাষা অনেকটা দৃষ্টিকোণ পরিবর্তনের ফলে বেশ জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশ ও দশের সেবা করার বুলি আওড়ানো অনেক রাজনীতিবিদের দেখা মিলে শুধুই ভোটের মৌসুমে। সেটি গেল বছরেও দেখা গেছে। যেহেতু ঘনিয়ে আসছে জাতীয় নির্বাচন, রাজনীতির মাঠ তাই এখন ভোটের শোরগোলে ব্যস্ত। যেখানে আছে প্রত্যাশা, কৌশল, আবার আশঙ্কাও। তবু বিভিন্ন দলীয় ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নির্বাচনি এলাকায় ছুটে বেড়াচ্ছেন। জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে রাজনীতির পথযাত্রা মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসনের অবসান হয়েছে। তবে জনগণের আকাংখা ছিল প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিরাট পরিবর্তন আসবে, বাস্তবিক অর্থে তেমন মৌলিক পরিবর্তন এখনো প্রতিফলিত হয়নি।
তবুও বাংলাদেশের মানুষ এখনও রাজনীতিতে আস্থা রাখে, বিশ্বাস করে পরিবর্তনের সম্ভাবনায়। প্রত্যাশা থাকে এমন রাজনীতির, যেখানে উন্নয়ন মানে কেবল অবকাঠামোগত সংস্কার নয় বরং কৃষকের ন্যায্যমূল্য ও শ্রমিকের মজুরি থেকে শুরু করে যুবকের কর্মসংস্থান, প্রত্যাশিত স্বাস্থ্যসেবায় সংস্কার, পরিবহনে শৃঙ্খলা, নদীশোষণ বন্ধ, সর্বত্র মাদক ও বখাটেপনা চিরতরে নির্মূল, বাকস্বাধীনতা, নারীর নিরাপত্তা ও ন্যায্য অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রের সর্বস্তরের আইনের সুশাসন নিশ্চিত হবে। এ ছাড়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে পরিত্রাণ দিতে হবে জনগণকে। বিগত নির্বাচনে ভয়-আতঙ্ক সৃষ্টিকারীদের রাজনীতি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে জনগণ। জনগণের মন থেকে সেই ভয়-আতঙ্ক দূর করার ব্যবস্থাও নিতে হবে। গ্রামে-গঞ্জে-শহরে সর্বত্র মানুষ এখন চায় শান্তির সুবাতাস। এখন প্রয়োজন এমন রাজনীতি, যেখানে উন্নয়ন হবে অংশগ্রহণমূলক, সিদ্ধান্ত আসবে জনগণের মাঠঘাট থেকে, আর বাস্তবায়ন করবে জনপ্রতিনিধি।
গেল বছরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল নতুন রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি)। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেয়ার পর রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের পাশাপাশি ভোটের চিত্রও যেন পাল্টে গেছে। গত ২৮ ডিসেম্বর তারা আনুষ্ঠানিক ৮ দলীয় জোটে যোগ দেয়। গেল বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে এক বিশাল সমাবেশের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে এনসিপি। ‘শাপলাকলি’ প্রতীকে নির্বাচন করবে দলটি।
২০২৫ সাল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী বছর। গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সাড়ে আট মাসের সংলাপের পর ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’ প্রণয়ন করেছে, যা সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের একটি রোডম্যাপ। এখন এটি চূড়ান্ত বাস্তবায়নের জন্য গণভোটের মাধ্যমে জনগণের রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে। এ প্রক্রিয়াটি দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে, যেখানে জনগণের মতামতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে। গেল বছরে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টি ছিল মূল আলোচনায়। এর মধ্যে মাঝে মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে নানা শংকাও দেখা দিয়েছে। তবে ১১ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তফসিল ঘোষণার মাধ্যমে স্পষ্ট হয় বাংলাদেশ একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের পথে হাঁটছে। কাজেই ২০২৫ সালটি শুধু একটি ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক বছর নয়, এটি রাষ্ট্র সংস্কারের পরীক্ষামূলক এক যুগান্তকারী সময়। কমিশনের সংলাপ, দলগুলোর সই, ভিন্নমত, সরকারের সিদ্ধান্ত ও জনগণের রায়ের অপেক্ষা, সব মিলিয়ে প্রক্রিয়াটি গণতান্ত্রিক যাত্রায় এক নতুন দিকনির্দেশনা দিয়েছে।
২০২৫ সাল বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি অন্তর্বর্তী সময়, কিন্তু গভীরভাবে তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই বছরটি ছিল না কেবল ক্ষমতা হস্তান্তর বা রাজনৈতিক সমীকরণ বদলের সময়। এটি ছিল রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ চরিত্র, গণতন্ত্রের অর্থ এবং জনগণের প্রত্যাশা বনাম রাজনৈতিক বাস্তবতার এক কঠিন মুখোমুখি হওয়ার সময়। দীর্ঘদিনের দমনমূলক শাসন, ভোটাধিকার সংকট ও প্রতিষ্ঠানগত ভাঙনের পর দেশ এমন এক মোড়ে এসে দাঁড়ায়, যেখানে পরিবর্তনের আকাংখা প্রবল হলেও সেই পরিবর্তনের পথ ও রূপ নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল সমানভাবে তীব্র। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বগ্রহণ এই বাস্তবতায় নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ এবং প্রশাসনিক সংস্কারের উদ্যোগ এই প্রত্যাশাকে শক্তিশালী করলেও খুব দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে ওঠেÑ রাষ্ট্র সংস্কার আর রাজনৈতিক সমঝোতা একসঙ্গে এগোনো কতটা কঠিন। সংস্কার বনাম নির্বাচনÑ এই দ্বন্দ্ব বছরজুড়েই রাজনীতির মূল সুর হয়ে থাকে।
এই প্রেক্ষাপটেই তারেক রহমানের দেশে আগমন রাজনৈতিকভাবে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। দীর্ঘ দেড় দশকের নির্বাসনের পর তার ফিরে আসা শুধু বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নয়, সামগ্রিক রাজনৈতিক সমীকরণেই নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে মনে করে বিএনপি।
২০২৫ সালে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থানও লক্ষণীয়। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বড় দুটি জোটে অংশ নেয় দেশের গণতন্ত্রকামী দলগুলো। তবে সুদিনের স্বপ্নে সবচেয়ে বড় আঘাত হয়ে আসে বছরের শেষভাগে যুবনেতা শরিফ ওসমান হাদির অকালমৃত্যু। ২০২৫ সাল ছিল প্রশ্ন তোলার বছর। সাধারণ মানুষ এখন আর শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্রের চরিত্র বদল দেখতে চায়। এই প্রত্যাশা পূরণ হবে কিনা, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দূরদর্শিতা, নির্বাচনপ্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীলতার ওপর। গণতন্ত্র এখানে কোনো উপহার নয়Ñ এটি প্রতিদিনের লড়াই, আর সেই লড়াইয়ের ফলাফলই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের বাংলাদেশ।
২০২৫ সাল ছিল সংশয় আর সংকটে ভরা। বিদায়ী বছরের এই অস্থিরতা হয়তো কোনো চূড়ান্ত পতনের সংকেত নয়, বরং এক দীর্ঘ প্রসববেদনাÑ যেখান থেকে প্রকৃত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ জন্ম নেওয়ার প্রতীক্ষায় আছে। কিন্তু সেই সুদিন কবে আসবে, নাকি তা মরীচিকা হয়েই থাকবে, তার উত্তর দেবে কেবল মহাকাল।
গেল বছরে বড় ঘটনা ছিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসলামী ৮ দলের সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত। একসঙ্গে আন্দোলন, ঢাকায় বড় সমাবেশ এবং বিভাগীয় শহরগুলোতে কর্মসূচির মাধ্যমে শক্ত অবস্থান জানান দিয়েছে তারা। তবে এই জোটটি আরও স্বস্তির বার্তা দেয় বছরের শেষের দিকে। তাদের দলে যোগ দেয় এনসিপি, এলডিপিসহ তিনটি দল। নানা ষড়যন্ত্র হলেও জামায়াতে ইসলামী সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে ঐক্য ধরে রাখার চেষ্টা করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, লাল-সবুজের বাংলাদেশে ২০২৫ এসেছে সম্পূর্ণ নতুন এক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অফুরান সম্ভাবনা নিয়ে। এই পরিবর্তনের পূর্বাভাস কিছু দিন আগেও ঘুণাক্ষরে টের পাওয়া যায়নি। ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে সাংবিধানিক সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যেই শেখ হাসিনার একচ্ছত্র কর্তৃত্ববাদী শাসন চলেছে দোর্দ- প্রতাপে। পরপর তিনটি জাতীয় নির্বাচনকে জঘন্য কারচুপি এবং জবরদস্তির মাধ্যমে প্রহসনে পরিণত করে তিনি একটানা দাপটের সঙ্গে ক্ষমতায় ছিলেন। সেসময় কখনো দিনের ভোট রাতে, কখনো ভোট ছাড়াই নির্বাচনের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে দেশে। জবাবদিহিতার বালাই ছিল না, যার সুযোগ নিয়ে ওই সময়ে নজিরবিহীন দুর্নীতি এবং লুটপাট হয়। এই বছরেই প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে নির্বাচনের দিকে ধাবিত হয় দেশ।
২০২৫ সাল কোনো একক দিকমুখী বছর ছিল না। এটি ছিল রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস, ক্ষমতার ভেতরে ও বাইরের নানাবিধ নতুন সমীকরণ এবং পুরোনো বনাম নতুন রাজনৈতিক শক্তির দ্বন্দ্ব-সংঘাতে ভরপুর ঘটনাবহুল একটি বছর। এতে দেখা যায় দলীয় পুনর্গঠন, জোট রাজনীতির পুনরাবির্ভাব, বিদ্রোহী প্রার্থী, দলভাঙা, নতুন প্ল্যাটফর্ম।
২০২৫ সাল শেষ। বাংলাদেশ আবারও এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আসন্ন নির্বাচন কেবল সরকার পরিবর্তন নয়, বরং দেশটি দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অসহিষ্ণুতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভঙ্গুরতার চক্র ভাঙতে পারবে কি না, তার পরীক্ষা। কৌশলগত জোট, অস্বচ্ছ অর্থায়ন ও বাইরের লবিং দ্বারা চালিত বর্তমান রাজনৈতিক খেলা জনগণের মধ্যে আস্থাহীনতা আরও গভীর করেছে। তরুণ ভোটারদের সক্রিয়তা, স্বচ্ছতার আহ্বান ও জবাবদিহিতার ক্রমবর্ধমান দাবি ইঙ্গিত দেয় যে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা এখনো নিভে যায়নি। দেশের নেতারা এই প্রত্যাশা পূরণে এগিয়ে আসবেন, নাকি আবারও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারকে ছাপিয়ে স্বল্পমেয়াদী স্বার্থকে প্রাধান্য দেবেন, তা কেবল ২০২৬ সালের নির্বাচনের ফলাফলই নির্ধারণ করবে না, বরং আগামী কয়েক দশকের জন্য বাংলাদেশের গণতন্ত্রের গতিপথ ও স্থায়ী সম্প্রীতির অন্বেষণও ঠিক করে দেবে।