# কোথাও স্বস্তি কোথাও বিড়ম্বনা
# সদরঘাটে ফ্রি কুলি ও ট্রলি সুবিধা
# বাসটার্মিনালে শেষ বেলায় মানুষের ভিড়
পবিত্র ঈদুল ফিতরের টানা সাত দিনের ছুটি গতকাল মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়েছে। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ২১ মার্চ দেশে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হতে পারে। ইতিমধ্যে ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন ঘরমুখো মানুষ। শেকড়ের টানে ইট পাথরের নগর ছেড়ে স্বজন সানিধ্য পেতে ছুটছে মানুষ।
ঈদের ছুটিতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যারা থাকেন, তারা এখন নিজ নিজ জেলায় অর্থাৎ বাড়িতে ফিরছেন। বাস, ট্রেন, লঞ্চ সবক্ষেত্রে যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ করা যাচ্ছে।
গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে গাবতলী, মহাখালী এবং যাত্রাবাড়ী বাস স্টেশনে ঘরমুখো মানুষের ভিড় দেখা গেছে। সেই সাথে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনসহ বিভিন্ন স্টেশনে ব্যাপক ভিড় দেখা গেছে।
এদিকে রাজধানী অনেকটা ফাঁকা হতে শুরু করেছে। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালেও দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে যাতায়াতকারী যাত্রীরা ভিড় করছেন। বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত লঞ্চঘাটে চাপ বেড়েছে, আশপাশের সড়কগুলোতেও যানজট দেখা দিয়েছে।
ঈদের সম্ভাব্য তারিখ ধরে আগেই পাঁচ দিনের ছুটির তারিখ নির্ধারণ করে রেখেছিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। সেই অনুসারে ১৯ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত ছুটি নির্ধারণ করা ছিল। এর মধ্যে ২১ মার্চ ঈদুল ফিতরের দিন সাধারণ ছুটি। এ ছাড়া ঈদের আগে ১৯ ও ২০ মার্চ এবং ঈদের পরে ২২ ও ২৩ মার্চ নির্বাহী আদেশে ছুটি নির্ধারণ করা ছিল।
তবে পূর্বঘোষিত ছুটির পাশাপাশি ১৮ মার্চও নির্বাহী আদেশে ছুটি ঘোষণা করে সরকার। আর ১৭ মার্চ শবে কদরের ছুটি মিলিয়ে সরকারি চাকরিজীবীরা টানা সাত দিনের ছুটি পেয়েছেন।
কমলাপুর স্টেশনে ঘরমুখো মানুষের উপচেপড়া ভিড়
আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে রাজধানী ছাড়ার চিরচেনা স্রোত এখন কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে। সোমবার সরকারি শেষ কর্মদিবস শেষ হওয়ার পর রাত থেকেই স্টেশনে ঘরমুখো মানুষের উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে। মঙ্গলবার ভোরেও সেই একই চিত্র বজায় ছিল। সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রতিটি ট্রেনই যাত্রীতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে স্টেশন ছাড়ছে। তবে আশার কথা হলো, যাত্রীচাপ কয়েক গুণ বাড়লেও এখন পর্যন্ত কোনো ট্রেন ছাড়তে বিলম্ব হয়নি। ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় না হওয়ায় এবং সব কার্যক্রম সুশৃঙ্খল থাকায় স্টেশনে ভিড় থাকলেও যাত্রীদের মধ্যে এক ধরনের স্বস্তি ও উৎফুল্ল ভাব লক্ষ্য করা গেছে।
মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজশাহীগামী ‘ধুমকেতু এক্সপ্রেস’ ছেড়ে যাওয়ার মাধ্যমে দিনের ট্রেনযাত্রা শুরু হয়। এরপর যথাসময়ে ঢাকা ছাড়ে নীলনাগর, সুন্দরবন, এগারো সিন্দুর প্রভাতী এবং তিস্তা এক্সপ্রেস। কমলাপুর স্টেশনে পরিবার নিয়ে অপেক্ষায় থাকা তাজুল ইসলাম নামের এক যাত্রী জানান, ভিড় হবে জেনে তিনি সকালে স্টেশনে এসেছেন।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারির কারণে বিনা টিকিটে কেউ প্ল্যাটফর্মে ঢুকতে পারছে না দেখে তিনি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। অন্যদিকে, সুন্দরবন এক্সপ্রেসের যাত্রী আহসান হাবিব শিমুল জানান যে, পরিবারকে আগেই পাঠিয়ে দিলেও নিজে আজ রওনা দিচ্ছেন এবং ট্রেন নির্দিষ্ট সময়ে আসায় তিনি খুব খুশি।
ঈদযাত্রায় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবার তিন স্তরের নিরাপত্তা ও টিকিট চেকিং ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। বিনা টিকিটে ভ্রমণ ঠেকাতে স্টেশন ও প্ল্যাটফর্মে প্রবেশের সময় কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
ভ্রাম্যমাণ টিটিই আফতাব জানিয়েছেন, টিকিট ছাড়া কাউকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। তবে পরিবারের সদস্য সংখ্যার তুলনায় টিকিটের সংখ্যা কম হলে নির্ধারিত ভাড়ায় তাৎক্ষণিক স্ট্যান্ডিং টিকিটের ব্যবস্থা করে দেওয়া হচ্ছে। স্টেশনের প্রবেশপথে দুই দফা টিকিট পরীক্ষা করার কারণে সুশৃঙ্খলভাবে যাত্রীরা ট্রেনে উঠতে পারছেন।
সায়েদাবাদে ঈদযাত্রার ঢল :
রাজধানীর সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকায় ঈদকে সামনে রেখে ঘরমুখো মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। মঙ্গলবার সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলায় যাওয়ার উদ্দেশে যাত্রীরা টার্মিনালে জড়ো হতে থাকেন। দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ভিড় আরও ঘন হয়ে ওঠে।
যাত্রীদের অভিযোগ, নির্ধারিত সময় মেনে বাস ছাড়ছে না অনেক ক্ষেত্রেই। কোথাও দীর্ঘ অপেক্ষা, আবার কোথাও অতিরিক্ত ভাড়ার চাপ সব মিলিয়ে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। তবুও পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে এসব কষ্টকে তুচ্ছ করেই বাড়ির পথে রওনা দিচ্ছেন তারা।
একাধিক যাত্রী জানান, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও বাসে উঠতে পারছেন না অনেকে। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে টিকিট সংগ্রহ করছেন। আবার কিছু পরিবহনে আসন সংখ্যার তুলনায় বেশি যাত্রী নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
মাহিবুর রহমান যাচ্ছেন কুমিল্লা। বললেন, “সব জায়গায় টিকে-ভাড়া বেশি। তাও বাড়ি তো যেতে হবে। সব আত্মীয় বাড়িতে। একটু টাকা বেশি লাগলেও বাড়ি গিয়ে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার আনন্দ আলাদা।
অন্যদিকে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যাত্রীচাপ বেশি হওয়ায় নির্ধারিত সময়সূচি ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। সড়কে যানজট থাকায় অনেক বাস নির্ধারিত সময়ে টার্মিনালে পৌঁছাতে পারছে না, ফলে এই বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হচ্ছে।
সব মিলিয়ে নানা ঝামেলা ও ভোগান্তি থাকলেও ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে ঘরে ফেরার এই যাত্রায় মানুষের আগ্রহে কোনও ভাটা নেই। পরিবারের টানে সব কষ্ট সহ্য করেই বাড়ির পথে ছুটছেন।
সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল :
ঈদযাত্রা শুরু হওয়ায় রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে ঘরমুখো মানুষের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। মঙ্গলবার সকাল থেকেই যাত্রীরা আগেভাগে এসে টিকিট সংগ্রহ ও মালামাল গুছিয়ে রাখছেন। দূরপাল্লার যাত্রীরা পরিবার-পরিজনের সঙ্গে অপেক্ষা করছেন। আর স্বল্প দূরত্বের যাত্রীরা নির্ধারিত লঞ্চ ধরে নিজ নিজ গন্তব্যে রওনা হচ্ছেন।
স্থানীয়রা বলছেন, সকাল থেকে ধীরে ধীরে যাত্রী উপস্থিতি বেড়েছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাপ আরও বেড়েছে। সদরঘাটে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং কর্তৃপক্ষ তৎপর রয়েছে।
সরেজমিনে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল এলাকায় দেখা গেছে, রাজধানীর যানজট এড়াতে অনেক দূরপাল্লার যাত্রী আগেভাগেই ঘাটে পৌঁছেছেন। কেউ পরিবারসহ অপেক্ষা করছেন। কেউ লঞ্চের নির্ধারিত সময়ের আগে টিকিট সংগ্রহ করে মালামাল গুছিয়ে রাখছেন।
বিশেষ করে বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীরা আগেভাগেই আসন নিশ্চিত করছেন। মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও চাঁদপুরসহ স্বল্প দূরত্বের যাত্রীরাও নির্দিষ্ট লঞ্চ ধরে গন্তব্যে রওনা হচ্ছেন।
ঘাট এলাকায় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সদস্যরা তৎপর রয়েছেন। যাত্রী ওঠানামা, টিকিট সংগ্রহ ও মালামাল বহনে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা না হয় তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন স্থানে নজরদারি চলছে। কিছু যাত্রী লঞ্চে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ করেছেন। তবে লঞ্চ মালিকপক্ষ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) অতিরিক্ত সিভিল টিম নজরদারি করছে। টহল ও চেকপোস্টের মাধ্যমে সন্দেহভাজন ব্যক্তির তল্লাশি, অপরাধ দমন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
র্যাব-১০-এর অধিনায়ক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, ‘ঈদ এবং পরবর্তী দিনগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। আমরা নিশ্চিত করছি, জনগণ নিরাপদে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে পারবে। কোস্ট গার্ড ও নৌ-পুলিশের সদস্যরা নদীপথে টহল দিচ্ছেন। সন্দেহজনক ব্যক্তি বা মালামাল লক্ষ্য করলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
যাত্রীদের স্বস্তি : ফ্রি কুলি ও ট্রলি সুবিধা
বরিশালগামী যাত্রী রাইফা ইসলাম জানালেন, প্রতি বছর সদরঘাটে কুলিদের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে ঝামেলা হতো। এবার একজন কুলি বললেন, ঈদ উপলক্ষে এই সেবা ফ্রি। সত্যিই অনেক স্বস্তি হলো।
পটুয়াখালী যাবেন শাহানারা বেগম। বললেন, ‘বয়স্ক হওয়ায় লঞ্চে মালামাল বহন খুব কষ্টকর হতো। এবার হুইলচেয়ার ও ট্রলির ব্যবস্থা থাকায় অনেক সহজ হয়েছে। যাত্রী ফারহানা আক্তার বলেন, ফ্রি কুলি, ট্রলি ও হুইলচেয়ারসহ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ঈদযাত্রাকে অনেক সুবিধাজনক করেছে।
ভোলাগামী যাত্রী সাইফুল ইসলাম মন্তব্য করেন, সদরঘাটের পরিবেশ আগের তুলনায় অনেক উন্নত হয়েছে। ফ্রি কুলি সুবিধা অনেক সহায়ক হয়েছে।
বিআইডব্লিউটিএর বন্দর পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন জানিয়েছেন, ঈদের আগে পাঁচ দিন এবং পরে পাঁচ দিনসহ মোট ১০ দিনের জন্য ফ্রি কুলি (পোর্টার) সেবা দেওয়া হবে। কুলিদের বেতন কর্তৃপক্ষ নিজস্বভাবে দিচ্ছে।
১০০টি ট্রলি বিমানবন্দর থেকে আনা হয়েছে। অসুস্থ, অক্ষম বা বয়স্কদের জন্য ২০টি গেট এলাকায় মোট ৪০টি হুইলচেয়ার স্থাপন করা হয়েছে। এসব ব্যবহারে সহায়তা করবেন ক্যাডেট সদস্যরা। ঈদ উপলক্ষে লঞ্চ মালিকরা ভাড়া ১০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছেন। এতে যাত্রীদের আরও স্বস্তি নিশ্চিত হয়েছে। সকাল ১১টায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও সেতু বিভাগের প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান শিমুলিয়া ট্যুরিস্ট ঘাট পরিদর্শন করে শিমুলিয়া থেকে চাঁদপুর ও বরিশালগামী তিনটি নতুন যাত্রীবাহী লঞ্চ উদ্বোধন করেন। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন, ঈদযাত্রায় ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও নির্বিঘœ যাত্রা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
সড়ক, রেলপথ, নৌপরিবহন এবং সেতু মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, সব গণমাধ্যম রিপোর্ট করছে, কোনো অভিযোগ নেই, ভাড়া বাড়ছে না। স্বস্তিতে মানুষ যাচ্ছে, খুব বেশি যানজট বা অব্যবস্থাপনা সড়কে নেই। মনে রাখতে হবে, মাত্র ২-৩ দিনের মধ্যে দেড় কোটি লোক ঢাকা ছাড়ছে। তাদের যাত্রাটা স্বস্তিদায়ক করা চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু আমাদের প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে যে প্রস্তুতি আমরা নিয়েছি, তাতে আমরা নিশ্চিত যে যাত্রীরা স্বস্তিতে, স্বাচ্ছন্দ্যে আরামদায়ক যাত্রার মাধ্যমে স্বজনদের কাছে যাবে।