ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদী হত্যার একমাস পূর্ণ হচ্ছে আজ ১৮ জানুয়ারি রোববার। গেল ডিসেম্বর মাসের এদিনে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় হাদীর মৃত্যু হয়। এর আগে ১২ ডিসেম্বর শুক্রবার গণসংযোগের জন্য রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় গিয়ে তিনি আক্রান্ত হন। চলন্ত রিকশায় থাকা হাদীকে গুলি করে চলন্ত মোটরসাইকেলের পেছনে বসে থাকা আততায়ী। গুরুতর আহত হাদীকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে অস্ত্রোপচার করার পর রাতেই তাকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর দুদিন পর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়।
জুলাই অভ্যুত্থান এবং আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরিচিতি পাওয়া হাদী ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। হাদী গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর গত ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেন। পরে মামলাটিতে হত্যার ৩০২ ধারা যুক্ত হয়। এরপর থানা পুলিশের হাত ঘুরে মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় ডিবি পুলিশকে। তদন্ত শেষে সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি, সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী ফয়সাল করিম মাসুদসহ ১৭ জনকে আসামি করে গত ৬ জানুয়ারি হাদী হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দেয় গোয়েন্দা পুলিশ। এই অভিযোগপত্রের ওপর নারাজী দেয় বাদীপক্ষ। এরপর ১৫ জানুয়ারী বৃহস্পতিবার ডিবি পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে বাদীপক্ষের আপত্তি শুনে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) মামলাটি পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেয় আদালত। মামলার বাদী ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবেরের নারাজি আবেদন মঞ্জুর করে ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম এ আদেশ দেন।
ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের ডিসি মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান ওইদিন সংবাদ মাধ্যমকে জানান, আদালত পুনঃতদন্ত করে ২০ জানুয়ারির মধ্যে সিআইডিকে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছে।
জানতে চাইলে সিআইডি পুলিশের বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান গতকাল শনিবার রাতে দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, আদালতের আদেশের পর গেল দু‘দিন সাপ্তাহিক বন্ধের কারনে মামলার নথিপত্র (কেস ডকেট) সিআইডির হাতে আসেনি। তিনি জানান, অফিস খোলার পর দু’এক দিনের মধ্যে নথিপত্র পাওয়া গেলে তারপর তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) নিয়োগ দেয়া হবে। তিনি তদন্ত শেষে আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক পুন:তদন্ত করবেন, এরপর অভিযোগপত্র দাখিল করবেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আদালত সূত্র জানায়, হাদী হত্যা মামলায় ১৭ জনকে আসামি করে গত ৬ জানুয়ারি অভিযোগপত্র দেয় গোয়েন্দা পুলিশ। কিন্তু অভিযোগপত্রে সন্তুষ্ট নয় ইনকিলাব মঞ্চ। গত ১২ জানুয়ারি সোমবার মামলাটি শুনানির জন্য ছিল। আব্দুল্লাহ আল জাবের সেদিন অভিযোগপত্র পর্যালোচনার জন্য দুই দিন সময় চান। আদালত তা মঞ্জুর করে ১৫ জানুয়ারী বৃহস্পতিবার অভিযোগপত্র গ্রহণের দিন ধার্য করেন। এদিন ডিবি পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্র নিয়ে অসন্তোষ জানিয়ে নারাজি দাখিল করেছেন মামলার বাদী।
তার পক্ষে অ্যাডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমান মুকুল শুনানি করে বলেন, অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার দায়িত্ব ছিল, এজন্য তদন্ত কর্মকর্তা কেবল তা জমা দিয়েছেন। এখানে হত্যার পরিকল্পনাকারীদের সাথে হত্যাকারী শুটারদের কী সম্পর্ক তা উল্লেখ করা হয়নি। হাদী কোনো সাধারণ মানুষ ছিলেন না। তাকে হত্যার জন্য অবশ্যই বড় কোনো পরিকল্পনা ছিল। এজন্য তাকে প্রকাশ্যে গুলি করা হয়েছে। যেন কেউ আর হাদীর মত ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস না পায়। এ আইনজীবী বলেন, ডিবি পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে আওয়ামী লীগের একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলেরর কথা বলা হয়েছে, এটা হাস্যকর। একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলরের এ সাহস করার কথা না। অবশ্যই বড় কোনো পরিকল্পনা ছিল। এজন্য এ অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে আমরা নারাজি দিয়েছি। এখানে শুধু ফয়সালকে দেখানো হয়েছে। তার চেক জব্দ করেছে এটা হাস্যকর ব্যাপার। এটা কী ধরনের তদন্ত? প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যার পর কীভাবে সেইফ এক্সিট পায়? কীভাবে হত্যাকারীর সাথে পরিকল্পনাকারী পালাতে সাহায্য করল, তাদের কথা বলা হয়নি অভিযোগপত্রে। তিনি বলেন, হাদী বারবার বলতেন ন্যায়বিচারের কথা এবং তাকে যদি মেরে ফেলে, সেই ন্যায়বিচারটাও চাইতেন। এজন্য আমরা ন্যায়বিচারের স্বার্থে এ নারাজি দিয়েছি।
অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা হলেন- প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ (৩৭), তার বাবা মো. হুমায়ুন কবির (৭০), মা হাসি বেগম (৬০), স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া (২৪), শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ শিপু (২৭), বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমা (২১), মো. কবির (৩৩), মো. নুরুজ্জামান নোমানী ওরফে উজ্জ্বল (৩৪), ভারতে পালাতে সহায়তার অভিযোগ থাকা সিবিয়ন দিউ (৩২), সঞ্জয় চিসিম (২৩), মো. আমিনুল ইসলাম ওরফে রাজু (৩৭) ও হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র-গুলি উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার মো. ফয়সাল (২৫), মো. আলমগীর হোসেন ওরফে আলমগীর শেখ (২৬), সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী, ভারতে পালাতে সহায়তাকারী ফিলিপ স্নাল (৩২), মুক্তি মাহমুদ (৫১) ও জেসমিন আক্তার (৪২)। তাদের মধ্যে ফয়সাল করিমসহ শেষের পাঁচজন পলাতক রয়েছেন।
অভিযোগপত্রে তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক ফয়সাল আহমেদ বলেছেন, আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং বিভিন্ন সময়ে হাদীর দেওয়া রাজনৈতিক বক্তব্য বিশ্লেষণ করে প্রাথমিকভাবে বোঝা গেছে, ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই’ হাদীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এছাড়া আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে ‘বাধাগ্রস্ত করতে’ এবং ভোটারদের মধ্যে ‘ভয়ভীতি তৈরি করতেই’ আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগীরা পূর্ব পরিকল্পিতভাবে হাদীর নির্বাচনি প্রচারে অনুপ্রবেশ করে বলে অভিযোগপত্রে তুলে ধরা হয়।
বাদীপক্ষের অভিযোগ
হাদী হত্যার পরিকল্পনাকারীরা আড়াইলেই থেকে গেলো ডিবি পুলিশের দায়সারা তদন্তে-এমন অভিযোগ বাদী পক্ষের। তড়িঘড়ি করে অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করতে গিয়ে তদন্তকারী সংস্থা ডিবি পুলিশ যাদেরকে হত্যার ঘটনার সাথে চিহিৃত করেছে, তারা চুঁনোপুটি কেবলমাত্র। যার কারনে বাদীর নারাজী ও আপত্তির কারনে আদালত পুন:তদন্তের নির্দেশ দেন সিআইডিকে। আদালতের আদেশে আগামী ২০ জানুয়ারীর মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হলেও মামলার নথিপত্র পৌঁছেনি সিআইডির হাতে। হাদী হত্যার সাথে জড়িতদের মধ্যে পরিকল্পনাকারী, হত্যাকারীদের আশ্রয়দাতা, অর্থ জোগানাদাতা কারা, নেপথ্যে কার কি ভ’মিকা সেটি পরিস্কার হয়নি ডিবি পুলিশ‘র অভিযোগপত্রে। যার কারনেই নারাজী দিয়েছে বাদী।
মামলার বাদী ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুরøাহ আল জাবের অভিযোগ করেন, শরিফ ওসমান হাদীকে হত্যার মিশন হঠাৎ করেই হয়নি। ২০২৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর শরিফ ওসমান হাদী জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে শাহবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরী করেছেন। অথচ পুলিশ সেই জিডির বিষয়টিকে কোন গুরুত্ব দেয়নি। পরে পুলিশ দাবী করেছে শরিফ ওসমান হাদী থানায় কোন ডিজিই করেনি। আমরা যখন ডিজির কপি নিয়ে থানায় হাজির হলাম তখন পুলিশ ডিজির বিষয়টি স্বীকার করেছে। ওই জিডিতে ওসমান হাদী উল্লেখ করেছিলো তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। কে বা কারা তাকে দেশী বিদেশী নাম্বার থেকে অব্যাহতভাবে হত্যার হুমকি দিচ্ছেন। পুলিশ তখন জিডি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করলে ১ বছর পর ডিসেম্বর মাসে তাকে মরতে হতো না হয়তো।
জাবের জানিয়েছে, ওসমান হাদীকে গুলি করা ফয়সাল ২ থেকে ৩ মাস আগ থেকেই ইনকিলাব মঞ্চের কালচারাল সেন্টারে যাতায়াত ছিলো। তার সঙ্গে দাড়িটুপি পড়া এক ব্যক্তিও এসেছিলো। সবশেষ তারা ৪ ডিসেম্বর কালচারাল সেন্টারে এসেছি। অথাৎ একটি দীর্ঘ পরিকল্পনা নিয়েই ওসমান হাদীকে হত্যার মিশন আকা হয়। শুধু ফয়সালই নয় তার সঙ্গে আরো একাধিক ব্যক্তি এ কিলিং মিশনে রয়েছে। তখন খুনীদের আমাদের সন্দেহ হয়নি। কিন্তু ঘটনার পর তাদের প্রোফাইল ঘাটতে দিয়ে তাদের চিনতে পারি আমরা এরা আগেও ওসমান হাদীর সাথে চলাফেরা করেছি। আমাদের কাছে শহীদ ওসমান হাদীর দুটি ফোন ছিলো যা আমরা ডিবি পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছি। আমরা মনে করে ওসমান হাদীর ফোন দুটি ফরেনসিক করা উচিৎ। হয়তো সেখানে কোন ক্লু বের হতে পারে। আমরা মনে করি শহীদ ওসমান হাদী একজন ব্যক্তি নয়, তিনি বাংলাদেশের একটি সম্পদ ছিলেন। যদি তার হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার না হয় নাহলে তাহলে ইনসাফের লড়াইয়ের জন্য আর কেউ সামনে এগিয়ে আসবে না।