জিরো মিসিং চিলড্রেন বাংলাদেশ উদ্যোগ বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি। নিখোঁজ ও অপহৃত শিশুদের দ্রুত উদ্ধার করবে মিসিং আর্জেন্ট নোটিফিকেশন-মুন অ্যালার্ট। সিআইডি ও অ্যাম্বার এলার্ট ফর বাংলাদেশদ্বয়ের যৌথ উদ্যোগে দেশের যে কোন প্রান্তে নিখোঁজ ও অপহৃত শিশুদের দ্রুত উদ্ধার নিশ্চিতকরণে জাতীয় জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থা ও টোল-ফ্রি হেল্পলাইনে (১৩ ২ ১৯) ফোন কল করেই এই সেবা মিলবে। আনুষ্ঠানিকভাবে এই সেবার ঘোষণা করা হবে আজ মঙ্গলবার। সিআইডি সূত্রে এ খবর জানা গেছে।
জানা গেছে, বাংলাদেশে প্রতিবছরই অনেক শিশুর অপহরণ হয়। সাধারণত সেইসব শিশুদের কথাই শোনা যায় যাদের পরিবার আইনের দ্বারস্থ হয়। অনেক ঘটনা অজানা থেকে যায়। এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, দেশে প্রতিদিন গড়ে তিনটি শিশু অপহরণের ঘটনা ঘটে। অপহৃত ২৯ ভাগ শিশুকে উদ্ধার করা যায়নি। অপহরণ ও নিখোঁজের পর হত্যাসহ অগনিত শিশুর হতাহতের ঘটনা ঘটছে প্রতিবছর।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ১৯৯৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম এই সিস্টেম চালু করা হয়। এর নামকরণ করা হয় নয় বছর বয়সী মার্কিন শিশু অ্যাম্বার হ্যাগারম্যান-এর নাম অনুসারে, যাকে ১৯৯৬ সালে অপহরণ করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। অ্যাম্বার অ্যালার্ট অত্যন্ত কার্যকর ব্যবস্থা, যেখানে শিশুর ছবি ও বিস্তারিত তথ্য রেডিও, টেলিভিশন, মোবাইল ফোন, স্যাটেলাইট এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে অপহরণের পর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় এবং শিশুটিকে সহজে উদ্ধার করা যায়।
সিআইডি সুত্র জানায়, সম্প্রতি দেশের নিখোঁজ শিশু উদ্ধারে কার্যকর ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা গ্রহণে অ্যাম্বার অ্যালাট’ চালু এবং নিখোঁজ শিশু উদ্ধারে সিআইডির বর্তমান ভূমিকা, প্রস্তুতি এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা হয়েছে। ঢাকাস্থ সিআইডি সদর দফতরে অ্যাম্বার অ্যালাট’ টিমের সঙ্গে সিআইডি প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. ছিবগাত উল্লাহর এ বিষয়ে আলোচনা হয়। আলোচনায় অ্যাম্বার অ্যালাট’ হলো একটি জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থা, যা নিখোঁজ শিশুদের দ্রুত খুঁজে বের করার জন্য সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গণমাধ্যম, এবং সাধারণ জনগণকে একত্রিত করে কাজ করে উল্লেখ করে বলা হয়, আমেরিকা ও বিশ্বের অন্যান্য দেশে এই সিস্টেমের মাধ্যমে হাজারো শিশুর জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশেও এই প্রযুক্তি বাস্তবায়নে সিআইডি ও অ্যাম্বার অ্যালার্ট ফর বাংলাদেশ কীভাবে সমন্বিত ভূমিকা রাখতে পারে সে বিষয়ে আলোচনা হয়।
সভায় সিআইডি প্রধান অ্যাম্বার অ্যালার্ট টিমকে আশ্বস্ত করে বলেন, নিখোঁজ শিশুদের সন্ধান ও উদ্ধার একটি অত্যন্ত মানবিক ও মহৎ দায়িত্ব, যা সিআইডি সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও গুরুত্বের সঙ্গে পরিচালনা করে থাকে। তিনি আরও জানান, নিজেদের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও মেধাকে কাজে লাগিয়ে জিরো মিসিং চিলড্রেন বাংলাদেশ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সিআইডি সর্বাত্মক সহযোগিতা দেবে। অ্যাম্বার অ্যালার্টের পক্ষে আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার বিজয়ী সাদাত রহমান, আয়েশা সিদ্দিকা, রাফিয়া উম্মা উসওয়াতুন রাফিয়াসহ সংশ্লিষ্ট টিমের সদস্যরা আলোচনায় অংশ নেন। এ সময় উপস্থিত ছিল আলিফ ও আরব নামের সেই দুই শিশু যারা আগে অপহরণের শিকার হলেও পরে নিরাপদে উদ্ধার হয়।
এর আগে শিশুর নিরাপত্তায় এম্বার এলার্ট সিস্টেম চালুর দাবি ওঠে। দেশের একাধিক সংগঠন এই দাবীর পক্ষে জনমত গঠন করে গত বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারী চট্টগ্রামে সমাবেশ করে। সেখানে বলা হয়, অপহৃত শিশুদের দ্রুত উদ্ধারে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাপক সাফল্যের পর বাংলাদেশেও অ্যাম্বার অ্যালার্ট সিস্টেম চালুর করা হোক।
বাংলাদেশে শিশু নিখোঁজের হার
২০২৬ সালের শুরুতে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে শিশু নিখোঁজ এবং অপহরণের ঘটনা একটি উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অস্থিতিশীলতার কারণে অপহরণ ও নিখোঁজের হার পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় বেড়েছে।
পুলিশ সদর দফতরের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে দেশজুড়ে মোট ১১০১টি অপহরণের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালে মাসে গড়ে প্রায় ৮৬টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৬১% বেশি।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে অন্তত ১৬০ জন নারী ও কন্যাশিশু নিখোঁজ বা অপহৃত হয়েছে। প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৪০০ নারী ও শিশু পাচারের শিকার হচ্ছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে এই ঝুঁকি বেশি।
২০২৫ সালের মে মাসে ঢাকা থেকে নিখোঁজ হওয়া সাড়ে চার বছরের শিশু রোজা মনির লাশ উদ্ধারের ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। ঢাকার তেজগাঁও এবং মিরপুর এলাকাগুলোতে শিশু নির্যাতনের হার সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে।
অ্যাম্বার এলার্ট ফর বাংলাদেশ
বাংলাদেশে নিখোঁজ শিশুদের দ্রুত খুঁজে বের করার জন্য অ্যাম্বার অ্যালার্ট সিস্টেম চালু করার একটি বিশেষ উদ্যোগের অংশ হিসেবে আজ ১৩ জানুয়ারি থেকে মেটা (Meta)-এর সহযোগিতায় বাংলাদেশে এই অ্যালার্ট সিস্টেম আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হচ্ছে। আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার বিজয়ী সাদাত রহমান এবং তার সংগঠন অ্যাম্বার অ্যালার্ট ফর বাংলাদেশ (Amber Alert for Bangladesh) এই ব্যবস্থার বাস্তবায়নে কাজ করছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ পুলিশের সিআইডি এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সরাসরি যুক্ত রয়েছে বলে জানা গেছে। কোনো শিশু নিখোঁজ হলে তাৎক্ষণিকভাবে তার তথ্য ও ছবি নির্দিষ্ট এলাকার মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের কাছে এবং সোশ্যাল মিডিয়া (ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম) প্ল্যাটফর্মে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে এর কার্যক্রম চলবে। এছাড়া, নিখোঁজ বা অপহৃত শিশুদের উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে দ্রুত সমন্বয় তৈরি করা হবে। বর্তমানে কোনো শিশু নিখোঁজ হলে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ অথবা শিশু সহায়তামূলক হেল্পলাইন ১০৯৮-এ কল করার পরামর্শ দেওয়া হয়। মুন অ্যালার্টের হেল্প লাইন নাম্বারে টোল ফ্রি কল করে তথ্য জানানো যাবে।