দীর্ঘ ১৯ বছর পর অশ্রুসিক্ত নয়নে স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারত করলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। লন্ডন থেকে প্রায় ১৮ বছর নির্বাসিত থাকার পর বৃহস্পতিবার দেশে ফিরে গতকাল শুক্রবার দলীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে পিতা জিয়াউর রহমানের মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদন ও কবর জিয়ারত করেন তিনি। এর আগে ২০০৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে পিতা জিয়াউর রহমানের কবরে শ্রদ্ধা জানান তারেক রহমান।

গতকাল বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যদের নিয়ে জিয়াউর রহমানের মাজার প্রাঙ্গণে আসেন তারেক রহমান। কবরে পুস্পমাল্য অর্পনের পরে তার রুহের মাগফেরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন তিনি। পরে একান্তে বাবার কবর জিয়ারত করেন তিনি।

শ্রদ্ধা নিবেদনের সময়ে তারেক রহমানের পাশে ছিলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহ উদ্দিন আহমেদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সেলিমা রহমান, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।

শ্রদ্ধা নিবেদনের আগে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেন, আমাদের প্রিয় নেতা, ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনে দেশের মানুষ খুশি হয়েছে, জনগণের মধ্যে মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে, জনগন উজ্জীবিত হয়েছে। তিনি স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মাজারে পুস্পমাল্য অর্পন করবেন, শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। এরপর তিনি যাবেন সাভারে জাতীয় স্মতি সৌধে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে।

এদিকে তারেক রহমান চন্দ্রিমা উদ্যানে আসবেন এই খবরে সকাল ১০টা থেকে সেখানে নেতা-কর্মীদের ভিড় জমতে থাকে। জিয়াউর রহমানের কবরস্থলে কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। নেতা-কর্মীরা বিজয় স্মরণী থেকে ক্রিসেন্ট লেকের সড়কের দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে তাদের নেতাকে অভিনন্দন জানায়।

বাদ জুম্মা দুপুর ২টা ৫২ মিনিটে গুলশান এভিনিউ‘র ১৯৬ বাসা থেকে বের হন তারেক রহমান। সেখানে উপস্থিত নেতা-কর্মীদের হাত তুলে শুভেচ্ছা জানানোর পরে বাসে চড়েন তারেক রহমান। নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় বাসটি জিয়াউর রহমানের কবর প্রাঙ্গণে এসে পৌঁছাতে আড়াই ঘণ্টারও বেশি সময়ে লাগে। গুলশান থেকে বিজয় স্মরণীর কাছে পৌঁছালে তারেক রহমান বহনকরা বাস থমকে যায়। নেতা-কর্মীরা সড়কে অবস্থান নেয় এবং তারা শ্লোগান দিতে থাকে ‘তারেক রহমানের আগমন, লাল গোলাপ শুভেচ্ছা। চারপাশের নিরাপত্তা বেষ্টনীও ভেঙে যায়। বাসের ভেতর থেকে তারেক রহমান হাত নেড়ে শুভেচ্ছার জবাব দেন। ১৫ মিনিট গাড়িবহর থমকে ছিলো। পরে সেনা বাহিনীর সদস্যরা এসে কর্মীদের সারিবদ্ধ করার চেষ্টা করে। নিরাপত্তা কর্মীরা মাইকে বলতে থাকে সবাই একটু সহযোগিতা করেন, একটু রাস্তা ফাঁকা করে দেন।

এই পর্যায়ে গাড়ি ধীর গতিতে চলতে থাকে। এরোপ্লেন মোড় থেকে ক্রিসেন্ট লেকের ব্রিজ পর্যন্ত আধা ঘন্টার বেশি সময় লাগে। ক্রিসেন্ট লেকের কাছে সেতুর কাছে তার গাড়ি থামে। সেখানে থেকে তিনি পায়ে হেটে কবরস্থান আসেন। জিয়াউর রহমানের কবরে স্থায়ী কমিটির সদস্যদের নিয়ে পুস্পস্তবক অর্পণ করেন ৪টা ৪০ মিনিটে।

একান্তে বাবার কবরে কিছুক্ষণ: পরে একান্তে কিছুক্ষণ বাবার কবরের সামনে একা দাঁড়িয়ে সুরা ফাতেহা ও দরুদ পাঠ করেন তারেক রহমান। তখন তিনি একবারেই একান্তে ছিলেন এবং একাই মোনাজাত করেন। তারেক রহমান মোনাজাতের সময়ে আবেগপ্রবণ হতে দেখা যায় এবং মোনাজাত শেষে রুমাল দিয়ে নিজের চোখ মুুছতে দেখা যায়। এই সময়ে নেতারা কিছুটা দূরে ছিলেন।

১৯৮১ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যখন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন, তখন তারেক রহমানের বয়স ছিল ১৬ বছর। আওয়ামী লীগের শাসনামলে ২০১৫ সালে নির্বাসনে থাকাকালে ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোকেও হারান তারেক রহমান। মায়ের পাশাপাশি তারা দুই ভাই ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, ২০০৮ সালে মুক্তি পাওয়ার পর তারেক রহমান যুক্তরাজ্য এবং আরাফাত রহমান মালয়েশিয়ায় গিয়েছিলেন। ছাত্র গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ১৫ মাস পর গতকাল যখন তারেক রহমান দেশে ফেরেন, তখন তার মা বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে শয্যাশায়ী।

স্মৃতিসৌধে তারেক রহমান : বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের কবরে ফুল দিয়ে তারেক রহমান স্মতি সৌধের উদ্দেশ্যে রওনা হন বিকাল ৫টায়। জিয়াউর রহমানের মাজার থেকে স্মৃতিসৌধ পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে হাজার হাজার নেতাকর্মীর উপস্থিতির কারণে তাকে বহন করা গাড়িটি রাত ৯টার পরে জাতীয় স্মৃতি সৌধে পৌছে। শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত ছিল পুরো পথ। তারেক রহমান নেতাদের হাত নেড়ে শূভেচ্ছার জবাব দেন। স্মৃতিসৌধে পৌছে তিনি মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সেখানে তিনি কিছুটা সময় অবস্থান করেন। এসময় দলের সিনিয়র নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধের বেদিতে নিয়ম অনুযায়ী সূর্যাস্তের আগে পৌঁছানো সম্ভব না হওয়ায় বিকেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষে মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন দলের নেতারা। শুক্রবার বিকেল ৫টা ৬ মিনিটে স্মৃতিসৌধের বেদিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণের মধ্য দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান তারা। সন্ধ্যা ৬টা ২৫ মিনিটেও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্মৃতিসৌধে পৌঁছাতে পারেননি।

বিকেল ৫টা ১৭ মিনিটে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় স্মৃতিসৌধের মূল ফটকে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারত শেষে তিনি (তারেক রহমান) ওখান থেকে স্মৃতিসৌধের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন। যেহেতু পুষ্পস্তবক অর্পণ করার একটি নিয়মনীতি রয়েছে, সেটি সূর্যাস্তের আগে, তাই আমরা তার পক্ষ থেকে ৫টা ৬ মিনিটে পুষ্পস্তবক অর্পণ করলাম। তিনি কিছুক্ষণ পরেই আসবেন।

শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর রায় ও আব্দুল মঈন খান, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান ও লুৎফুজ্জামান বাবর, ঢাকা জেলা বিএনপির সভাপতি খন্দকার আবু আশফাক ও সাধারণ সম্পাদক নিপুণ রায় চৌধুরী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন ।

এদিকে তারেক রহমানকে দেখতে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে সামনে হাজার হাজার নেতাকর্মীর উপস্থিতি দেখা যায়। সরেজমিনে দেখা যায়, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নবীনগর বাসস্ট্যান্ড থেকে জাতীয় স্মৃতিসৌধের প্রধান ফটক পর্যন্ত নেতাকর্মীদের ঢল নামে। তারেক রহমানকে সাভারে স্বাগত জানিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায়। এছাড়া বিএনপির নেতাকর্মীরা বিভিন্ন ফেস্টুন, ব্যানার নিয়ে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে মিছিল নিয়ে এসে জড়ো হন।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার দীর্ঘ ১৮ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফেরেন তারেক রহমান। ফেরার দিন রাজধানীর পূর্বাচলের ৩০০ ফিট এলাকায় দলের দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি। এরপর অসুস্থ মা বেগম খালেদা জিয়াকে দেখতে এভারকেয়ার হাসপাতালে যান। গতকাল দিনের দুটি কর্মসূচির পর গুলশানের বাসায় ফিরে আসেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।

আজ শনিবার তারেক রহমান ভোটার হওয়ার প্রক্রিয়া সারতে আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে যাবেন। পরে তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গিয়ে শহীদ শরিফ ওসমান হাদীর কবর জিয়ারতের কথা রয়েছে।