জাতীয় অত্যাবশ্যক ওষুধের তালিকায় ওষুধের সংখ্যা বাড়িয়ে ২৯৫ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর হেয়ার রোডে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে তিনি এ তথ্য জানান।
ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, সাধারণ মানুষের কাছে ওষুধ সহজলভ্য করতে জাতীয় অত্যাবশ্যক ওষুধের হালনাগাদ তালিকা এবং ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত নতুন নীতিমালা অনুমোদন দিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। আজ উপদেষ্টা পরিষদের সভায় এই দুই প্রস্তাবের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। এর ফলে তালিকাভুক্ত ওষুধগুলো সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশী দামে বিক্রি করা যাবে না।
তিনি বলেন, এ সিদ্ধান্ত সরাসরি দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষের চিকিৎসা প্রাপ্যতা ও ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলবে। তার ভাষায়, এটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
সায়েদুর রহমান বলেন, ১৯৮২ সালে প্রণীত ওষুধ নীতির মাধ্যমে দেশীয় ওষুধ শিল্পের বিকাশ এবং সাধারণ মানুষের কাছে ওষুধ সহজলভ্য করার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে তা অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৯৯৪ সালে এসে সব ওষুধের ওপর মূল্য নিয়ন্ত্রণ তুলে নিয়ে মাত্র ১১৭টি ওষুধে তা সীমিত করা হয়। গত প্রায় তিন দশক এই কাঠামো অপরিবর্তিত থাকায় নিয়ন্ত্রিত তালিকার বাইরে ওষুধের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৩০০টিতে পৌঁছেছে।
এর ফলে ওষুধের দামে ব্যাপক বৈষম্য তৈরি হয়েছে। বর্তমানে স্বাস্থ্য খাতে মানুষের মোট ব্যয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ওষুধ খাতে ব্যয় হচ্ছে, যার বড় অংশই ব্যক্তিগত পকেট থেকে দিতে হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশে স্বাস্থ্য বিমা বা জাতীয় স্বাস্থ্যসেবার মতো কোনো সুরক্ষা কাঠামো নেই। এই বাস্তবতায় অত্যাবশ্যক ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করা ছাড়া বিকল্প ছিল না বলে জানান তিনি।
সায়েদুর রহমান জানান, একটি অত্যাবশ্যক ওষুধের তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে, যেখানে ২৯৫টি ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদ অন্তর্ভুক্ত করেছে। এবারের তালিকায় আগের তালিকার তুলনায় ১৩৬টি ওষুধ বেশি। এসব ওষুধ সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করতে হবে এবং এই দামের বাইরে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না।
মূল্য নির্ধারণে একটি নির্দিষ্ট ফর্মুলা অনুসরণ করা হবে, যেখানে কাঁচামাল (এপিআই ও এক্সিপিয়েন্ট), উৎপাদন ব্যয় এবং প্রচলিত মুনাফার হার বিবেচনায় নেওয়া হবে। যেসব কোম্পানির বর্তমান মূল্য নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি, তাদের চার বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে নির্ধারিত মূল্যে নামতে হবে, যাতে শিল্প খাত পর্যায়ক্রমে মানিয়ে নিতে পারে।
অত্যাবশ্যক তালিকার বাইরে থাকা ১ হাজারের বেশি ওষুধের ক্ষেত্রে উৎপাদকরা মূল্য প্রস্তাব করবে। যদি কোনো ওষুধ সাতটির বেশি কোম্পানি উৎপাদন করে, তবে ইন্টারনাল রেফারেন্স প্রাইসিংয়ের মাধ্যমে ১৫ শতাংশের একটি দামের সীমার মধ্যে আসতে হবে। আর উৎপাদক সাতটির কম হলে, দেশের ভেতরের দাম ও বিদেশি বাজারের দাম (পিপিপি সমন্বয় করে) তুলনা করে যেটি কম, সেটির ভিত্তিতে মূল্য অনুমোদন দেওয়া হবে।
নতুন ওষুধ, প্যাটেন্টযুক্ত ওষুধ এবং বায়োলজিক্যাল ওষুধের জন্য আলাদা ক্যাটাগরি ও আলাদা ফর্মুলা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ করে দ্রুত বিকাশমান বায়োলজিক্যাল ওষুধ খাতে গবেষণা ও বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে অতিরিক্ত সুবিধা রাখা হয়েছে।
সায়েদুর রহমান জানান, শিগগিরই এই সিদ্ধান্ত গেজেট আকারে জারি করা হবে। ভবিষ্যতে ওষুধের দাম নির্ধারণ ও নজরদারির জন্য বিদ্যমান ব্যবস্থার বাইরে একটি স্বাধীন ‘ন্যাশনাল ড্রাগ প্রাইসিং অথরিটি’ গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে। আপাতত এই দায়িত্ব পালন করবে ড্রাগ প্রাইস ফিক্সেশন কমিটি।
তিনি আরও বলেন, গত ১৪ মাসে একটি টাস্কফোর্সের মাধ্যমে উৎপাদক, বিপণনকারী, চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট, ওষুধ বিজ্ঞানী এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়েছে। সবার সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতেই এই নীতিমালা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশসহ চার অধ্যাদেশ অনুমোদন: উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা সংশোধন অধ্যাদেশ ২০২৬, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি সংশোধন অধ্যাদেশ ২০২৬ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সংশোধন অধ্যাদেশ ২০২৬-এর খসড়া ও নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ বনজ শিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশন অধ্যাদেশ ২০২৬-এর খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় প্রণীত ‘হার্ট ন্যাশনালি ডিটারমাইন কন্ট্রিবিউশন (এনডিসি-৩)’ ভূতাপেক্ষ অনুমোদন পেয়েছে।
বৈঠক শেষে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এসব তথ্য জানান।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে উপদেষ্টা পরিষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়।
শফিকুল আলম বলেন, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্বেগ বিবেচনায় এনে ডাটা লোকালাইজেশন সংক্রান্ত বিধানে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন কেবল ক্রিটিক্যাল ইনফরমেশন ইনফ্রাস্ট্রাকচারের ক্ষেত্রে দেশে ডাটা সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক থাকবে। ব্যক্তিগত উপাত্তের ক্ষেত্রে কিছু শিথিলতা আনা হয়েছে এবং কোম্পানির ক্ষেত্রে কারাদণ্ডের পরিবর্তে অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এতে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ ও ক্লাউডভিত্তিক সেবায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
শিল্পকলা একাডেমী সংশোধন অধ্যাদেশের বিষয়ে তিনি বলেন, একাডেমির বিভাগ সংখ্যা বাড়িয়ে নয়টি করা হয়েছে। এর মধ্যে থিয়েটার, চলচ্চিত্র, আলোকচিত্র, নৃত্য ও পারফরম্যান্স আর্ট, সংগীত, চারুকলা, গবেষণা ও প্রকাশনা, নিউ মিডিয়া এবং কালচারাল ব্র্যান্ডিং ও উৎসব প্রযোজনার জন্য পৃথক বিভাগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি একাডেমির বোর্ডে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বিধান যুক্ত হয়েছে, যা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি বাড়াবে।
বাংলাদেশ বনজ শিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশন অধ্যাদেশ ২০২৬ সম্পর্কে প্রেস সচিব জানান, ১৯৫৯ সালের ফরেস্ট ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন অর্ডিন্যান্সকে যুগোপযোগী করে নতুন কাঠামো প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে পরিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করে বনজ সম্পদের টেকসই ব্যবহার, পণ্য বৈচিত্র্য, শোরুম স্থাপন ও যৌথ উদ্যোগের সুযোগ রাখা হয়েছে। গত অর্থবছরে কর্পোরেশন কর-পূর্ব মুনাফায় ৫৩ কোটি টাকা অর্জন করেছে এবং রাবার শিল্পে প্রথমবারের মতো ৬ কোটি টাকা লাভ করেছে বলেও বৈঠকে জানানো হয়।
এনডিসি-৩ প্রসঙ্গে শফিকুল আলম বলেন, ২০২২ সালে বাংলাদেশের গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ছিল ২০২.০৪ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য, যা ২০৩৫ সালে ৪১৮.৪০ মিলিয়ন টনে পৌঁছাতে পারে। এনডিসি-৩ অনুযায়ী ৮৪.৯৭ মিলিয়ন টন নিঃসরণ হ্রাসের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে নিজস্ব সক্ষমতায় ২৬.৭৪ মিলিয়ন টন এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়া গেলে আরও ৫৮.২৩ মিলিয়ন টন নিঃসরণ কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান ও প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার উপস্থিত ছিলেন।