• স্পীকার মেজর হাফিজ, ডেপুটি কায়সার
  • খালেদা-নিজামীসহ বিশিষ্টজনদের নামে সংসদে শোক প্রস্তাব
  • ১৩৩ অধ্যাদেশ উত্থাপন

গণতন্ত্রের যাত্রার শুরুতেই উত্তপ্ত সংসদ। ফ্যাসিবাদের দোসর আখ্যা দিয়ে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের ভাষণ বর্জন করেছে বিরোধী দল। “জুলাইয়ের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা বন্ধ কর” এ ধরনের বিভিন্ন শ্লোগান সম্বলিত লাল প্লেকার্ড প্রদর্শন করে প্রতিবাদ জানায় বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। এক পর্যায়ে শ্লোগান দিতে দিতে তারা ওয়াক আউট করে সংসদ থেকে বেরিয়ে যায়। তার আগে স্পীকারের আসন খালি রেখে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে সংসদ শুরু হয়। পরে স্পীকার ও ডেপুটি স্পীকার নির্বাচন করা হয়। সংসদে শোক প্রস্তাব, ১৩৩টি অধ্যাদেশ উত্থাপন, বিভিন্ন কমিটি গঠন ও রাষ্ট্রপতির ভাষণ শেষে রোববার বেলা ১১টা পর্যন্ত অধিবেশন মুলতবি রাখা হয়।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা ৫ মিনিটে কুরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এ সংসদের প্রথম অধিবেশন। অধিবেশনের শেষ পর্যায়ে বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে বক্তব্যের জন্য রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের অধিবেশন কক্ষে প্রবেশের ঘোষণা দেওয়া হলে জামায়াতের ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলের এমপিরা আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানান। বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ও উপনেতা আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের কথা বলতে চাইলেও স্পীকার তাদের মাইক অন করে কথা বলার সুযোগ দেননি। এ সময় বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা উচ্চস্বরে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। এসময় তারা ‘গেট গেট গেট আউট, কিলার চুপ্পু গেট আউট’, ‘গণতন্ত্র ফ্যাসিবাদ, এক সাথে চলে না’ স্লোগান দেন। সেই সাথে ‘জুলাইয়ের সাথে গাদ্দারি চলবে না’ লেখা লাল রঙের কার্ড প্রদর্শন করেন।

সংসদ কক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রবেশ করলে প্রচলিত রীতিতে সংসদ নেতা ও সরকারি দলের সদস্যরা দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন জানান। তবে বিরোধী দলের সদস্যদের একটি অংশ প্রতিবাদের অংশ হিসেবে নিজেদের আসনে বসে থাকেন।

এ সময় বিউগলে জাতীয় সংগীত বাজতে শুরু করলে জাতীয় সংগীতের প্রতি সম্মান জানিয়ে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা প্রতিবাদ বন্ধ রেখে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। এর মধ্যে রাষ্ট্রপতি সংসদে তার ভাষণ শুরু করলে বিরোধী দলের সদস্যরা উচ্চস্বরে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। একপর্যায়ে তারা স্লোগান দিতে দিতে অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন।

এর আগে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদ সদস্যদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়া সংবিধান অনুযায়ী একটি বাধ্যবাধকতা।

স্পিকার বলেন, “আমরা সংবিধানের বিধান ও জাতীয় সংসদের রেওয়াজ অনুসরণ করতে চাই। দয়া করে আপনারা খারাপ কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন না।”

তবে স্পিকারের আহ্বানের মধ্যেই বিরোধী দলের সদস্যরা স্লোগান দিতে দিতে অধিবেশন কক্ষ থেকে বের হয়ে যান। সংসদের প্রথম দিনের অধিবেশনেই এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কক্ষে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। তারা আর সংসদে ফিরে আসেননি।

পরে সংসদ থেকে বেরিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের বলেছেন, আমরা সরকারি দলকে অনুরোধ জানিয়েছিলাম, স্পিকারকেও অনুরোধ করেছিলাম- রাষ্ট্রপতিকে যেন ভাষণ দিতে না দেওয়া হয়। তারা আমাদের কথা গ্রাহ্য করেননি। তাই আমরা ক্ষুব্ধ হয়ে বের হয়ে এসেছি। আগামীতে এই সংসদে কোনো অন্যায় মেনে নেবো না। আমরা জনগণের স্বার্থ ও অধিকারের পক্ষে লড়াই করে যাবো।

তিনি বলেন, এই রাষ্ট্রপতিকে আমরা দফায় দফায় প্রত্যাখ্যান করেছি, অস্বীকার করেছি। গত দেড় বছর থেকে আমরা দফায় দফায় রাষ্ট্রপতির নীতিগত বৈধতা অস্বীকার করেছি। এই সংসদ কারও একার নয়, ১৮ কোটি মানুষের সংসদ। জনগণের অধিকারের জন্য লড়াই করতে এসেছি।

তিনি আরো বলেন, এই রাষ্টপ্রতি তিনটা কারণে অপরাধী। প্রথম কারণ, তিনি সব খুনের সহযোগী ছিলেন। দ্বিতীয়ত, তিনি ২০২৪ সালের আগস্টের ৫ তারিখ জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছিলেন সেই ভাষণে তিনি বলেছিলেন, তৎকালীন ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন এবং তিনি তা মঞ্জুর করেছেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তিনি তা অস্বীকার করেছেন। তিনি জাতির সামনে মিথ্যাবাদী হিসেবে সাব্যস্ত হয়েছেন, বলেন তিনি।

তৃতীয় কারণ হিসেবে জামায়াত আমীর বলেন, রাষ্ট্রপতি নিজের হাতে অর্ডিন্যান্স স্বাক্ষর করেছেন। নির্বাচনে দুটি ভোট হবে, এতে যারা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হবে তারা সংস্কার সংশোধন পরিষদের সদস্য হিসেবেও নির্বাচিত হবেন। একই দিনে উভয় শপথ একই ব্যক্তি পড়াবেন। এই শপথ দুটি আমরা নিলেও সরকারি দল নেয়নি।

জনগণের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমরা আপনাদের রায়কে সম্মান করি, আমরা আপনাদের সঙ্গে আছি, আপনারাও আমাদের সঙ্গে থাকবেন।

স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন

আগের সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পীকারের অনুপস্থিতিতে গতকাল অধিবেশনের শুরুতে সংসদ সদস্যদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে প্রবীণ সংসদ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন এ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। অধিবেশন শুরুতে সংসদ সচিবালায়ের সচিব কানিজ মাওলা কার্যক্রমের সূচনা করেন। সংসদ নেতাসহ অধিবেশন কক্ষ যখন ভরপুর সেই সময়টিতে স্পিকারের চেয়ার ফাঁকা ছিল। আর দর্শক গ্যালারীতে ড. ইউনূসসহ অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন। সংসদের প্রথম অধিবেশন বলে স্পিকারের চেয়ারের পাশে রাখা হয় রাষ্ট্রপতির চেয়ার। সংসদ নেতা তারেক রহমান দাঁড়িয়ে অধিবেশন শুরুর জন্য একজন সদস্যকে নির্বাচনের কথা বলেন। তিনি প্রবীণ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে সভাপতি হিসেবে নাম প্রস্তাব করেন। সরকারি দলের পক্ষ থেকে এ প্রস্তাবে সমর্থন জানান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সংসদ নেতার প্রস্তাবে পূর্ণ সমর্থন জানান জামায়াতের নায়েবে আমীর সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের।

সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে তাতে সায় দিলে সরকারির দলের প্রথম সারি থেকে খন্দকার মোশাররফ হোসেন উঠে যান। এরপর সংসদ ভবনের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা এবং প্রোটোকল বজায় রাখার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সার্জেন্ট অব আর্মস স্যালুট দিয়ে খন্দকার মোশাররফকে স্পিকারের আসনে নিয়ে যান।

পরে কার্যসূচি অনুযায়ী প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মনি স্পিকার পদে হাফিজ উদ্দিন আহমদের নাম প্রস্তাব করেন। হুইপ রাকিবুল ইসলাম ওই প্রস্তাবকে সমর্থন করেন। স্পিকার হিসেবে অন্য কোনো মনোনয়ন ছিল না। পরে কণ্ঠভোটে স্পিকার নির্বাচিত হন। ডেপুটি স্পীকার হিসেবে জামায়াতের পক্ষে মনোনয়ন দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু জামায়াতের পক্ষ থেকে কোন নাম দেয়া হয়নি। সংসদে ডেপুটি স্পিকার হিসেবে হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুদার ভূমি প্রতিমন্ত্রী কায়সার কামালের নাম প্রস্তাব করেন। ওই প্রস্তাবকে সমর্থন করেন হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান। ডেপুটি স্পিকার হিসেবে অন্য কোনো মনোনয়ন ছিল না। পরে কণ্ঠভোটে কায়সার কামাল নির্বাচিত হন। এরপর সংসদ ত্রিশ মিনিটের বিরতিতে স্পীকার ও ডেপুটি স্পীকারকে শপথ পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। এরপর রাষ্ট্রপতির কক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে টাঙ্গাইল ৮ আসনের সংসদ সদস্য আহমেদ আযম খান নতুন মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

শপথ অনুষ্ঠানের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বেলা ১টার সময় বৈঠক শুরু করতে গিয়ে সাউন্ড সিষ্টেমের বিভ্রাটে পড়েন। সংসদের মাইক এ সময় কাজ করছিল না করিগরি ত্রুটির কারণে। স্পিকার বলেন, তিনি হ্যান্ডমাক ব্যবহার করছেন। হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করেই তিনি জোহরের নামাযের জন্য ২০ মিনিট বিরতির ঘোষণা দেন।

নামাযের বিরতির পর বেলা দেড়টার পরেই স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। স্পিকার হিসেবে রাখা প্রথম বক্তব্যে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন “সবার আগে বাংলাদেশ, এই হোক আমাদের মূলমন্ত্র। তার কথায়, এই দেশের গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী হল জনগণ আর এই সংসদ গণতন্ত্রের প্রতীক। মুক্তিযোদ্ধা হাফিজ উদ্দিন এ সময় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করেন।

তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এ সময় । এছাড়া বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জনগণের আন্দোলনের কথাও উঠে আসে তার বক্তব্যে।

স্পিকার হাফিজ বলেন, “বিভিন্ন সময় স্বৈরশাসকের আগমন ঘটেছে এই দেশে। বাংলাদেশের জনগণ লড়াই করেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট জনগণকে বিদায় দেওয়া হয়েছে। শহীদ আবু সাঈদ, মীর মুগ্ধ এবং ওয়াসিমের নাম উচ্চারণ করে এই অভ্যুত্থানে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের প্রতি তিনি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন স্পিকার।

স্পিকার বলেন, জনগণ সংসদের কার্যক্রম দেখতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। সরকার ও বিরোধী দল উভয়পক্ষ জাতীয় স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করবে বলে আশা করেন স্পিকার। এছাড়া নিরপেক্ষতার জন্য বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ থেকে তিনি পদত্যাগ করেছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।

নবনির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে অভিনন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, আজ থেকে আপনারা কোনো দলের নন, আপনারা এই মহান জাতীয় সংসদের অভিভাবক। গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়ে সংসদকে অধিকার লঙ্ঘনকারীদের ক্লাবে পরিণত করা হয়েছিল। কিন্তু আজকের এই সংসদ সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংসদ।

স্পিকারের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ থেকে সংসদের প্রতিটি সদস্য আপনাদের চোখে সমান। জনগণের হারানো অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে এই সংসদকে একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

নব নির্বাচিত স্পীকার ও ডেপুটি স্পীকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে দেয়া বক্তব্যে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান

বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছরে সংসদীয় রাজনীতি খুব কম সময় কার্যকর ছিল। বেশিরভাগ সময় দেশ ফ্যাসিবাদের কবলে ছিল এবং সংসদ ছিল কেবলই একটি ‘ডামি’ সংসদ। যারা অতীতে এই চেয়ারে বসেছেন, তারা গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকারের ওপর সুবিচার করতে পারেননি।

তিনি স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে অভিনন্দন জানান এবং সংসদের সব গঠনমূলক কাজে পূর্ণ সমর্থনের আশ্বাস দেন।

স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে সংসদ চালাবেন যারা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে অধিবেশন পরিচালনার জন্য পাঁচ সদস্যের সভাপতিমণ্ডলী মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। ঘোষিত তালিকায় রয়েছেন ঢাকা-৮ আসনে বিএনপির এমপি মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ, ঢাকা-২ আসনে বিএনপির এমপি গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নরসিংদী-১ আসনে বিএনপির এমপি আব্দুল মইন খান, কুমিল্লা-৬ আসনে বিএনপির এমপি মোহাম্মদ মনিরুল হক চৌধুরী এবং রংপুর-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর এমপি এটিএম আজহারুল ইসলাম।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ তাদের নাম ঘোষণা করে বলেন, “স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে বৈঠকে উপস্থিত সভাপতিমণ্ডলীর তালিকায় যার নাম শীর্ষে থাকবে তিনি স্পিকারের আসন গ্রহণ করবেন।”

সংসদ নেতা ও বিরোধী দলীয় নেতা সংসদে দুজনই প্রথম

প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়ে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন একঝাঁক নতুন মুখ, যাদের মধ্যে সংসদ নেতা তারেক রহমান এবং বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমানও রয়েছেন। বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে কোট-প্যান্ট পরে সংসদ নেতা তারেক রহমান যখন সংসদের অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করছিলেন, তখন সাংসদরা তাকে টেবিল চাপড়িয়ে অভিবাদন জানায়। হাস্যোজ্জ্বল তারেক রহমান এসে চারপাশে তাকিয়ে নিজের আসনে বসেন। এসময়ে ভিভিআইপি লাউঞ্জের প্রথম সারিতে বসা প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিনী জুবাইদা রহমান ও কন্য জাইমা রহমান দাঁড়িয়ে তাকে অভিনন্দন জানান। জিয়াউর রহমানের পরিবারের দ্বিতীয় প্রজন্মের সরকার প্রধান হিসেবে বৃহস্পতিবার সংসদে পা রাখলেন তারেক রহমান। তিনি ঢাকা-১৭ আসনের প্রতিনিধিত্ব করছেন।

অপরদিকে প্রথমবারের মতো সংসদে পা রেখেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান, যিনি ঢাকা-১৫ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিনিই জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সংসদে। সংসদের অধিবেশন কক্ষে বিরোধী দলের নেতার আসনে বসেছেন তিনি।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের যে ২৯৭ আসনের ফল ঘোষণা করা হয়েছে, তাদের মধ্যে ২২৫ জনই প্রথমবার সাংসদ হয়ে অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন।

সংসদে শোক প্রস্তাব

বৃহস্পতিবার অধিবেশনের প্রথম দিন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পর সংক্ষিপ্ত বিরতি শেষে রেওয়াজ অনুযায়ী শোকপ্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। প্রস্তাবে খালেদা জিয়াসহ দেশি বিদেশি বিশিষ্টজন, সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নিহত এবং মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের স্মরণে শোকপ্রস্তাব আনা হয়।

শোকপ্রস্তাব উত্থাপনের পর চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম আরও কয়েকটি নাম যুক্ত করার অনুরোধ জানান। তার প্রস্তাবে জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ছাড়াও ঝিনাইদহ-২ আসনের সংসদ সদস্য মশিউর রহমানের নাম যুক্ত করার কথা বলা হয়। পরে স্পিকার তা অনুমোদন করেন।

এরপর বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান বক্তব্য দিতে উঠে বলেন, শোকপ্রস্তাবে কিছু নাম বাদ পড়েছে। সেগুলো বলার জন্য তিনি বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে কথা বলার অনুরোধ করেন। স্পিকার তাকে মাইক দেন।

তাহের বলেন, শোকপ্রস্তাব “একপেশে করে তৈরি করা হয়েছে” এবং ভবিষ্যতে সংসদকে “নিরপেক্ষ ও প্রাণবন্ত” করতে আরও সচেতন হওয়া দরকার। এ সময় তিনি আরও কয়েকজনের নাম বলে সেগুলো শোকপ্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান।

তার বক্তব্যে মতিউর রহমান নিজামী, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, আবদুস সোবহান, শেখ আনছার আলী, রিয়াসাত আলী, আবদুল খালেক মণ্ডল, হাফেজা আছমা খাতুন, রোকেয়া আনছার, সুলতানা রাজিয়া, রাশেদা খাতুন, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, এ কে এম ইউসুফ, নাজির আহমেদ, কামারুজ্জামান, আবদুল কাদের মোল্লা এবং মীর কাসেম আলীর নাম আসে।

তাহের বলেন, শাপলা চত্বরের ঘটনার প্রসঙ্গে শোকপ্রস্তাবে ‘জামায়াতে ইসলামী’র বদলে ‘হেফাজতে ইসলামী’ বলা উচিত। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নিহতদের প্রসঙ্গ টেনে তিনি সেখানে ‘প্রায় দুই হাজার শহীদের’ কথা বলেন এবং শরিফ ওসমান হাদীর প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, বিরোধীদলীয় উপনেতা যাদের নাম বলেছেন, সেগুলো শোকপ্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

শোক প্রস্তাবে আরও কিছু নাম সংযোজিত হবে বলে জানান স্পিকার। তারা হলেন ছালেহা খানম, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, কামাল ইবনে ইউসুফ ও নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টু।

এরপর প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম আরও কয়েকটি নাম যোগ করার প্রস্তাব দেন। তিনি গৌতম চক্রবর্তী, এম এ মতিন, মুজিবুর রহমান মঞ্জু, আনোয়ারুল হোসেন খান এবং এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকারের নাম শোকপ্রস্তাবে যুক্ত করার কথা বলেন। অন্য কোনো সাবেক সংসদ সদস্য বা বিশিষ্ট ব্যক্তির নাম বাদ পড়ে থাকলে তা সংসদ সচিবালয়কে জানাতে অনুরোধ করেন।

পরে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম ফ্লোর নিয়ে শরিফ ওসমান বিন হাদী, আবরার ফাহাদ এবং ফেলানী খাতুনের নামও শোকপ্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করেন। স্পিকার তখন বলেন, এই নামগুলোও শোকপ্রস্তাবে যুক্ত হবে।

বিএনপি চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, ক্যাথলিক ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস (জর্জ ম্যারিও বেরগোগলিও) ইরানের ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, সাবেক রাষ্ট্রপতি একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বরণ্যে নাগরিক ও ব্যক্তিত্ব যারা মৃত্যুবরণ করেছেন তাদের স্মরণ করা হয় শোক প্রস্তাবে।

জুলাই যোদ্ধা আবু সাঈদ, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ, শাহারিয়ার খান আনাস, মেহেদি হাসান জুয়েল, ফারহান ফাইয়াজসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের বরণ্যে নাগরিকদের নামও রাখা হয় শোক প্রস্তাবে।

এরপর প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং শহীদ জুলাই যোদ্ধাদের নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়। আলোচনা শেষে শোকপ্রস্তাব সংসদে গৃহীত হয়।

তার আগে মরহুমদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ মরহুমদের রুহের মাগফেরাত কামনা করে দোয়া করেন।

খালেদা জিয়ার শোকপ্রস্তাবের উপর আলোচনায় অংশ নেন যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, ভোলা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, রংপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এটিএম আজহারুল ইসলাম, কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সংসদ সদস্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

শহীদ জুলাই যোদ্ধাদের উপর আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা-৩ আসনের সংসদ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ঢাকা-১১ আসনের সংসদ সদস্য ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনের সংসদ সদস্য শহীদ উদ্দিন চৌধুরী।

শোক প্রস্তাবের পর সংসদের কার্যসূচি অনুযায়ী বিগত সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেন আইন মন্ত্রী এডভোকেট আসাদুজ্জামান। পরে সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটিসহ কয়েকটি কমিটি গঠন করা হয়।

সংসদের গ্যালারিতে যারা ছিলেন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্পিকারের দুই পাশের ভিভিআইপি লাউঞ্জসহ চারপাশের দর্শক গ্যালারিগুলো ভরে গেছে আমন্ত্রিত অতিথিদের উপস্থিতিতে। প্রথম অধিবেশন সংসদের ভিভিআইপি গ্যালিরিতে ছিলেন অন্তর্বতীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস । ছিলেন সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দীন। সকাল ১১টা ৫ মিনিটে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। নির্বাচিত সাংসদরা সকাল ১০টা থেকে অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করেন, নিজের আসনটি দেখে নেন, একে অপরের সাথে কুশল বিনিয়ম করেন।

সংসদ সচিবালয় প্রথম অধিবেশনে বিশিষ্ট নাগরিক, কূনীতিক, সরকারি ঊর্ধবতন কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিকদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য চারপাশের গ্যালারিতে আসন দেওয়া হয়েছে।

অধিবেশন দেখতে এসেছে প্রধানমন্ত্রীর পরিবারও। ভিভিআইপি লাউঞ্জের স্পিকারের ডানপাশের গ্যালারিতে বসেছেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিনী জুবাইদা রহমান, তার মা সৈয়দা ইকবাল মান্দবানু, তারেককন্যা জাইমা রহমান, মরহুম আরাফাত রহমান কোকোর সহধর্মিনী শামিলা রহমান সিঁথি।

মরহুম বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দার, তার স্ত্রী কানিজ ফাতেমা, জুবাইদা রহমানের বড় বোন শাহিনা খান বিন্দু দ্বিতীয় সারিতে বসেছেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা এ টি এম শামছুল ইসলাম, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন উপস্থিত ছিলেন। বাম পাশের গ্যালারিতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিসেন্টসেন, যুক্তরাজ্যের হাই কমিশনার সারাহ কুক,চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, ভারতের হাই কমিশনার প্রণয় ভার্মা, পাকিস্তানের হাই কমিশনার ইমরান হায়দারসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত-হাই কমিশনাররা অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। আরো উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান আযাদ।

এছাড়া চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ গোলাম নাফিজকে গুলীবিদ্ধ অবস্থায় রিকশা দিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া রিকশা চালক নুর মুহাম্মদও দর্শক গ্যালারিতে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।