টানা তিন বছরের লোকসানে পড়েছে বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো)। গত দুই অর্থবছরে লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৩০ কোটি টাকা। গতকাল রোববার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মাধ্যমে কোম্পানির ২০২৪-২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ প্রকাশ করা হয়েছে। এতে লোকসানের এমন তথ্য পাওয়া যায়। জানা যায়, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানির কর পরবর্তী নিট লোকসান হয়েছে ১২৫ কোটি টাকার বেশি। এই বড় লোকসানের কারণে আগের বছরের ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ অর্থবছরেও বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ বঞ্চিত করেছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিটি। আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডেসকোর শেয়ারপ্রতি লোকসান ৩ টাকা ১৫ পয়সা হিসাবে নিট লোকসান হয়েছে ১২৫ কোটি ২৩ লাখ টাকা। এর আগের অর্থবছরে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি লোকসান ১২ টাকা ৭২ পয়সা হিসাবে নিট লোকসান হয়েছিল ৫০৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। যদিও সর্বশেষ সমাপ্ত হিসাব বছরে কোম্পানিটি লোকসানের বোঝা এক-চতুর্থাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে, তবে এখনও কোম্পানি লোকসানের ধারাবাহিকতা থেকে বের হতে পারেনি।

এর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরে কোম্পানি শেয়ারপ্রতি লোকসান ১৩ টাকা ৬১ পয়সা হিসাবে নিট লোকসান হয়েছিল ৫৪১ কোটি ২১ লাখ টাকা।এদিকে লোকসানের কারণে সর্বশেষ সমাপ্ত অর্থবছরে আগের বছরের ধারাবাহিকতায় কোম্পানির বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছিল। তার আগের আট বছরের মধ্যে এক বছর ১২ শতাংশ বাদে প্রতি বছরেই কোম্পানিটি তাদের বিনিয়োগকারীদের ১০ শতাংশ হারে নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। জানা গেছে, একসময়ের মুনাফায় থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (ডেসকো) পুরো লোকসান এখন অন্তত ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এরপরও কর্মকর্তারা তাদের পদপদবি বৃদ্ধির প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। অর্গানোগ্রাম (জনবল কাঠামো) সংশোধনের মাধ্যমে নতুন ২৯৩টি পদ সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে ২৭৬ জনই কর্মকর্তা। এতে বছরে ব্যয় বাড়বে অন্তত ৩০ কোটি টাকা। ফলে লোকসানের ভারে ন্যুব্জ হওয়া প্রতিষ্ঠানটির লোকসান আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানও একাধিকবার তার অধীনে থাকা তিনটি মন্ত্রণালয়ের অযাচিত ব্যয় কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন। অনেক প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে অযাচিত ব্যয় কমিয়েছে, অনেকে বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সুবিধা নেওয়া কর্মকর্তাদেরই আরও বেশি সুবিধা দিতে পরিবর্তিত এ সময়ে ডেসকোর অর্গানোগ্রাম পাস করার তোড়জোড় শুরু হয়। এতে ডেসকোর লোকসান বৃদ্ধির পাশাপাশি আগের সময়ের সুবিধাভোগীরা নতুন করে আবারও বাড়তি সুবিধা পাবেন। বঞ্চিতরা বঞ্চিত হবেন আগের মতোই। সেই সঙ্গে গ্রাহকসেবার মানও কমে যাবে।

ডেসকোর বর্তমান অর্গানোগ্রামে কর্মকর্তা-কর্মচারীর ২ হাজার ২১১টি পদ রয়েছে। যার মধ্যে কর্মরত ১ হাজার ৯৬১ জন। নতুন করে ২৯৩টি পদ সৃষ্টির ফলে সবমিলে এখনকার চেয়ে ৫৪২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী বাড়বে। প্রস্তাবিত অর্গানোগ্রামে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী থেকে প্রধান প্রকৌশলী পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে সমমানের পদগুলোতে ১২০ জন লোকবল বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সহকারী প্রকৌশলী বা সমমানের পদে ৯৬ জন এবং উপসহকারী প্রকৌশলী বা সমমানের পদে ৬০ জনসহ সবমিলে ২৭৬ জন কর্মকর্তার পদ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে প্রস্তাবে। ঢাকা এবং গাজীপুর এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ডেসকো এক সময় মুনাফা করত। সর্বশেষ ২০২১-২২ অর্থবছরে তাদের মুনাফা হয়েছে ৬৩০ কোটি টাকা। এরপর ধারাবাহিকভাবে লোকসান গুনছে প্রতিষ্ঠানটি।

আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫৪১ কোটি এবং পরের অর্থবছরে (২০২৩-২৪) ৫০৫ কোটি লোকসান হয়েছে তাদের। সেই লোকসান বেড়ে চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত কোম্পানির লোকসান হয়েছে ৭৭৩ কোটি টাকা। সবমিলে এখন পর্যন্ত লোকসান হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮২০ কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে এ লোকসান আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।