শনিবার ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ভয়াবহ বিমান হামলা এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর খবরে বিশ্বজুড়ে চরম উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়েছে। এই সংঘাতের স্থায়িত্ব এবং বিশ্বনিরাপত্তার ওপর এর প্রভাব নিয়ে এখন বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়ায় খামেনির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে একে ‘ইরানি জনগণের জন্য তাদের দেশ ফিরে পাওয়ার সেরা সুযোগ’ বলে অভিহিত করেছেন। রোববার ভোরে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ৮৬ বছর বয়সি এই নেতার মৃত্যুর খবর দিলেও এর কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
বৃটেন, ফ্রান্স এবং জার্মানি এক যৌথ বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে সংঘাত থামিয়ে আলোচনার টেবিলে ফেরার আহ্বান জানিয়েছে। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্জ বলেন, তারা এই হামলায় অংশ নেননি, তবে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। ম্যাক্রোঁ পরে এক জরুরি সভায় সতর্ক করে বলেন, পারমাণবিক কর্মসূচি বা আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার মতো বিষয়গুলো কেবল হামলা চালিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়।
২২টি দেশের জোট আরব লীগ ইরানের পাল্টা হামলাকে সার্বভৌমত্বের চরম লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে। সৌদি আরব এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। ওমান, যারা দীর্ঘকাল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতা করে আসছে, তারা মার্কিন পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে বর্ণনা করেছে।
সবচেয়ে চমকপ্রদ প্রতিক্রিয়া এসেছে সিরিয়ার কাছ থেকে। একসময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়া সত্ত্বেও সিরিয়ার নতুন সরকার এই দফায় শুধুমাত্র ইরানের নিন্দা জানিয়েছে, যা ওয়াশিংটন ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক উন্নয়নের নতুন প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দেয়।
রাশিয়া ও চীন: রাশিয়া এই হামলাকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত ও উস্কানিমূলক আগ্রাসন বলে অভিহিত করেছে। চীনও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ইরানের সার্বভৌমত্ব রক্ষার আহ্বান জানিয়েছে।
অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা: দেশ দুটি মার্কিন পদক্ষেপের প্রতি তাদের প্রকাশ্য সমর্থন ব্যক্ত করেছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ইরানকে অস্থিতিশীলতা ও সন্ত্রাসের মূল উৎস বলে বর্ণনা করেছেন। নিউজিল্যান্ড: সরাসরি সমর্থন না দিলেও তারা বলেছে, ইরান সরকার অনেক আগেই জনগণের সমর্থন হারিয়েছে।
ফিলিস্তিন ও আঞ্চলিক আতঙ্ক
হামলা চলাকালে অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লায় এক অদ্ভূত পরিস্থিতি দেখা গেছে। একদিকে আকাশে ইসরাইলি আয়রন ডোম মিসাইল প্রতিরোধের শব্দ শোনা যাচ্ছিল, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ রমযানের কেনাকাটায় ব্যস্ত ছিল। তবে সম্ভাব্য সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ আরব দেশগুলোর ওপর ইরানের হামলার নিন্দা জানালেও মার্কিন-ইসরাইলি হামলা নিয়ে নীরব ছিল।
নবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী সংস্থা আইক্যান (আইমিএএন) এই হামলাকে ‘চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে অভিহিত করেছে। তাদের মতে, এর ফলে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে। এদিকে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ বাহরাইন ও ফ্রান্সের অনুরোধে একটি জরুরি বৈঠক ডেকেছে। কোনো নির্দিষ্ট উত্তরসূরি না থাকায় খামেনির মৃত্যু ইরানকে এক গভীর রাজনৈতিক সংকটে ফেলবে এবং এই সংঘাত একটি বড় আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেবে কি না, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে এখন চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
খামেনির হত্যাকাণ্ড মানবিক নৈতিকতা ও আন্তর্জাতিক আইনের সব নীতির লঙ্ঘন: পুতিন
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন। খামেনির হত্যাকাণ্ডকে মানবিক নৈতিকতা ও আন্তর্জাতিক আইনের সব নীতির নিষ্ঠুর লঙ্ঘন আখ্যায়িত করেছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল গতকাল শনিবার সকালে ইরানজুড়ে হামলা চালায়। ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তেহরানে নিজের কার্যালয়ে নিহত হন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তিনি তিন দশকের বেশি সময় ধরে ইরানকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন।
তার মৃত্যুতে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও খামেনির পরিবারের সদস্যদের প্রতি রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন শোক জানিয়েছেন। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ আজ রোববার এ তথ্য জানান।
রুশ প্রেসিডেন্ট বলেছেন, রাশিয়ায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে একজন অসাধারণ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে স্মরণ করা হবে, যিনি রাশিয়া ও ইরানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জোরদারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলেন।
উত্তর কোরিয়া ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি হামলাকে ‘অবৈধ আগ্রাসন’ হিসেবে নিন্দা করেছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি এ তথ্য জানিয়েছে।
উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা ‘অবৈধ আগ্রাসন’ এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন।
মুখপাত্র বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা ‘অনুমানের মধ্যেই ছিল’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘আধিপত্যবাদী ও গ্যাংস্টারসুলভ’ স্বভাবের কারণে এটি অনিবার্য ফল।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের এই ‘আগ্রাসী যুদ্ধ’ কোনো পরিস্থিতিতেই গ্রহণযোগ্য নয়।