এতদিন লোকজন আসছেন, ঘুরে ঘুরে দেখেছেন। আজ ও গতকাল যারা আসছেন বেশিরভাগই কিনছেন, রোজা শুরু হওয়ার পর শুক্রবার প্রথম মনে হইতেছে ঈদের কেনাবেচা শুরু হইলো। ঈদের বেচাকেনা নিয়ে এভাবেই বলছিলেন ঢাকার অন্যতম বিপণি বিতান বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সের পাঞ্জাবির জন্য জনপ্রিয় ব্র্যান্ড লুবনানের বিক্রয়কর্মী ফাহিম। সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার ও গতকাল শনিবারের ঈদ কেনাকেটার বিষয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে এই বিক্রেতা বলেন, এতদিন মনে হইছে মহামারী, আজ বিক্রি আলহামদুলিল্লাহ। আজ যারা আসছেন ১০০ জন থেকে ৬০ জনই কেনাকাটা করছেন।

রমজান মাসের অর্ধেক পেরিয়ে এসে এদিন বিপণি বিতানটিতে লোকজনের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে ঈদের কেনাকাটা সারতে এসেছেন ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা। এছাড়া, ঢাকার রাজপথ থেকে অলি গলিতেও দেখা মিলেছে একক বা দরবেধেঁ কিংবা পরিবারের সদস্যরা একত্রে কেনাকাটার জন্য পছন্দের বিভিন্ন কেন্দ্রে যাচ্ছেন।

চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ২১ মার্চ বাংলাদেশে ঈদুল ফিতর উদযাপিত হতে পারে। ঈদের এবার সাতদিন ছুটি পেয়েছে মানুষ। ঈদের ছুটি শুরুর আগে মাঝখানে আরও একদফা সাপ্তাহিক ছুটি মিলবে। তাই সামনের দিনগুলোতে কেনাকাটা আরও জমজমাট হওয়ার আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।

আর ক্রেতারা বলছেন, ভিড় বাড়ার আগেই যারা কেনাকাটা সারতে চান, তারাই এদিন পরিবার-পরিজন নিয়ে বেরিয়েছেন। পরিচিত প্রায় সব ব্র্যান্ডই এক ছাদের নিচে পাওয়ায় তারা এই শপিং মলে এসেছেন। এই শপিং মলের পঞ্চম তলা পর্যন্ত মোটাদাগে পোশাকের দোকান। ষষ্ঠ তলায় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের জুতার শো-রুম। আর সপ্তম তলায় রয়েছে সোনা ও অলংকারের দোকান। এর বাইরে মোবাইলসহ বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক্সসামগ্রী, ব্যাগ, প্রসাধনসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সামগ্রীর দোকানও রয়েছে বিভিন্ন তলায়।

এদিন বসুন্ধরা সিটিতে গিয়ে ব্র্যান্ডের দোকানগুলোতে উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে। ক্রেতা সামলাতে ব্যস্ত থাকতে দেখা গেল দোকানিদের। আড়ং, ইজি ফ্যাশন, আর্টিসান, টুয়েলভ, জেন্টল পার্ক, ইনফিনিটি, রিচম্যান, লুবনান, দর্জিবাড়ি, ইলিইন, ক্যাটস আই, ফিট এলিগ্যান্স, রাইজ, প্লাস পয়েন্টের মত শো-রুমে মানুষের উপস্থিত বেশি।

ঈদকে ঘিরে ক্রেতার চাহিদা মাথায় রেখে শোরুমগুলোতে রয়েছে নানা ডিজাইনের সব বয়সীদের পোশাক। বাহারি কারুকাজ, হাতের নকশা, ব্লকসহ বিভিন্ন কাজ ও নকশার নতুন পোশাকে সেজেছে ফ্যাশন হাউসগুলো, ঈদ উপলক্ষে এসেছে নতুন নতুন কালেকশনও। এবার ঈদ এবং পরবর্তী গরমের মওসুমকে প্রাধান্য দিয়ে কাপড় নির্বাচন ও পোশারে নকশা করা হয়েছে। ফলে বেশিরভাগই সুতির পোশাক। নিপুণ, সৃষ্টি, সাদাকালো, দেশাল, রঙ বাংলাদেশ, কে-ক্রাফট, অঞ্জন্স, জ্যোতি নামে বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসের শো-রুম ঘুরে যথারীতি তাদের পোশাকে কিছুটা নতুনত্ব ও বৈচিত্র আনতে দেখা গেছে।

মগবাজার এলাকার বাসিন্দা ইকরাম স্ত্রী ও এক সন্তানকে নিয়ে এসেছেন কেনাকাটা করতে। সবার হাতেই ব্যাগ দেখে বোঝা যাচ্ছিল, কেনাকাটা প্রায় শেষ। বেসরকারি এই চাকরিজীবী বলেন, ঈদ চলে এসেছে। ছুটির দিন পেয়ে দুপুরে নামাজের পর পর বেরিয়েছি কেনাকাটা করতে। ঘুরে ঘুরে পরিবারের সবার জন্যই কেনাকাটা করলাম। প্রয়োজনীয় কেনাকাটা প্রায় শেষ, দেখি আরেকটু যদি কিছু পছন্দ হয় তাহলে নেব।

মিরপুর থেকে বন্ধুদের সঙ্গে পাঞ্জাবি কিনতে আসা রাতুল নামে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী বলেন, এখানে প্রায় সব ব্র্যান্ডেরই শো-রুম রয়েছে। পাঞ্জাবি কিনতে বন্ধুরা মিলে এসেছি। দেখি একটু ঘুরে ঘুরে, পছন্দ হলে নিয়ে নেব।

ফ্যাসন হাউজ দর্জিবাড়িতেও ক্রেতাদের ভিড় দেখা গেছে, একই সুরে এই আউটলেটটির ম্যানেজার মো. মিলন বলছিলেন, ঈদ কেনাকাটা আজ পুরোদমেই শুরু হয়েছে বলে তাদের কাছে মনে হচ্ছে। তিনি বলেন, লোকজন আসছেন, দেখছেন। আশা করছি সামনের সপ্তাহে বেচাবিক্রি আরো বাড়বে। লোকজন আজ যারা আসছেন, পছন্দ হলে বেশিরভাগই কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের নতুন কালেকশনের পাশাপাশি আগের কালেকশনেও ক্রেতাদের চাহিদা রয়েছে।

চতুর্থ তলায় শাড়ির দোকানের মধ্যে জামদানি হাউস, শালিমার শাড়িজ, বি-প্লাস, নীল আঁচল শাড়িজ, মনে রেখ শাড়িজ ও ঢাকা জামদানি কুটিরে ক্রেতা ছিল বেশি। একই ফ্লোরে বোরখার দোকানগুলোতেও ছিল ক্রেতাদের আনাগোনা।

বি-প্লাসের এক বিক্রয়কর্মী বলেন, ঈদ উপলক্ষে শাড়ি বিক্রি খুব একটা বাড়ে না এখন। আগে যে কোনো উৎসবে নারীরা যা-ই কিনতো শাড়ি কেনা ছিল মাস্ট। এখন অন্যান্য পোশাকেই ঝোঁক বেশি সবার, তাই শাড়ির বিক্রিও কমে গেছে। ঈদ উপলক্ষে যা হচ্ছে বিক্রি, সেটা হচ্ছে টুকটাক।

ষষ্ঠ তলায় জুতার বিভিন্ন ব্র্যান্ডের দোকানেও ভিড় ছিল, প্রায় সব বয়সি ক্রেতাদের ‘মন যোগাতে’ সাইজ ও ডিজাইনের জুতা দেখিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছিলেন বিক্রয়কর্মীরা। এপেক্সের শো-রুমে কথা হয় রামপুরার বাসিন্দা কলেজছাত্রী ফারিয়ার সঙ্গে। তিনি বাবার সঙ্গে এসেছেন ঈদের কেনাকাটা সারতে। জামা-কাপড় কেনার পর জুতা কিনছিলেন তিনি।

এই কলেজছাত্রীর বাবা আহসানউল্লাহ বলেন, ঈদ কাছাকাছি আসলে ভিড় আরও বাড়তেই থাকবে। তাই আগেভাগে মেয়েকে নিয়ে এসেছি। মেয়ে তার পছন্দমতো তার মা, দাদুর জন্য কাপড়চোপড় কিনেছে। এখন জুতা কিনলেই আমাদের কেনাকাটা শেষ।

পুরান ঢাকার বংশাল থেকে লোকমান শরীফও স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে এসেছেন কেনাকাটা করতে। তিনি বলেন, মোটামুটি পছন্দ অনুযায়ী কাছাকাছি দূরত্বে সব কিছুই এখানে পাওয়া যায়; বেশি ঘোরাঘুরি করতে হয় না। তাই বেশি কেনাকাটা করতে হলে আমাদের এখানেই আসা হয়, এবারও এসেছি।