রাষ্ট্রীয় কোম্পানি বাপেক্সের দুর্বলতার সুযোগে দেশের প্রমাণিত আরো কয়েকটি গ্যাসক্ষেত্রের দিকে হাত বাড়াচ্ছে বহুজাতিক কোম্পানি শেভরন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ও বহু চেষ্টা চালিয়েছে কোম্পানিটি।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর শেভরনের তৎপরতা অব্যাহত থাকে। পেট্রোবাংলা কমিটি প্রথমে বিষয়টি নাকচ করে দিলে কিছুদিন বিষয়টি নিয়ে কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। কিন্তু কয়েকমাস ধরে বিষয়টি আবার বেশ আলোচিত হচ্ছে। তাদের সে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

সবশেষ গত ২৬ নভেম্বর মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে বিষয়টি স্থান পাওয়ায়। বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টার সভাপতিত্বে বৈঠকে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব, পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা সেখানে অংশ নেন।

বৈঠকে অংশ নেওয়া একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, আলোচনার এক পর্যায়ে বলা হয়, যেহেতু রাষ্ট্রীয় কোম্পানি বাপেক্স পারছে না তাই প্রয়োজনে শেভরনকে দিয়ে দেওয়া হোক।

জানা গেছে, গ্যাস পাওয়া প্রায় নিশ্চিত এমন প্রমাণিত কয়েকটি গ্যাস ফিল্ড বহুজাতিক কোম্পানি শেভরনের হাতে তুলে দিতে একটি গ্রুপ সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তাদের চাপে বছর খানেক আগে বাতিল হয়ে যাওয়া বিষয়টি আবার সামনে চলে এসেছে বলে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজানুর রহমান জানান , শেভরন বাংলাদেশের প্রস্তাবে ডব্লিউপিপিএফ, বাড়তি এলাকাসহ ৩টি বিষয় রয়েছে। তাদের প্রস্তাব কি বলে আর আমাদের আইনে কি রয়েছে বিষয়টি যাচাই করার জন্য একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা যাচাই-বাছাই করে দেখবে তারপর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানির চেয়ারম্যান সাবেক সচিব মোহাম্মদ মহসীনকে আহ্বায়ক করে ওই কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অপর ২ জন সদস্য একজন সাবেক সচিব অপরজন সাবেক অতিরিক্ত সচিব।

ক্যাবের জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম বলেন, প্রমাণিত গ্যাস ফিল্ড বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হলে তা হবে দেশদ্রোহীতার শামিল। যারা এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হবেন তারা জাতীয় বেঈমান হিসেবে চিহ্নিত হবেন। বাংলাদেশের জনগণ এটা কোনোভাবেই মেনে নেবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ড. শামসুল আলম আরও বলেন, আমরা অতীতে দেখেছি দেশ গ্যাসের ওপর ভাসছে বলে গ্যাস রফতানির কথা বলা হতো। আপনি খুঁজে দেখেন ওই সময় গ্যাস রফতানির পক্ষে যারা সক্রিয় ছিলেন এখনও তাদের যোগসূত্র খুঁজে পাবেন।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশে গ্যাস উত্তোলনের শীর্ষে থাকা কোম্পানিটি প্রায় ৪শ’ বর্গকিলোমিটার এলাকা (বিবিয়ানা) থেকে গ্যাস উত্তোলন করছে। বিবিয়ানার চারপাশের আরও সাড়ে ৬ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা পেতে জোর লবিং অব্যাহত রেখেছে। ওইসব এলাকায় রয়েছে রশিদপুর, ছাতক ও সুনেত্রসহ কয়েকটি প্রমাণিত গ্যাসক্ষেত্র। রশিদপুর থেকে গ্যাস উত্তোলন করছে সিলেট গ্যাস ফিল্ড কোম্পানি, আর আন্তর্জাতিক আদালতে মামলার কারণে ছাতক থেকে গ্যাস উত্তোলন বন্ধ রয়েছে।

শেভরন বাংলাদেশ বেশ অস্বাভাবিক দরে ব্লকগুলো পেতে বিগত সরকারের সময় থেকেই অব্যাহত চাপ দিয়ে যাচ্ছে। অফশোর পিএসসির (উৎপাদন ও বণ্টন চুক্তি) শর্তে খুবই উচ্চ দরে ফিল্ডগুলো পেতে দেন দরবার করছে।

ব্লক-৮, ব্লক-১১ ও ব্লক-১২ নম্বরের পার্শ্ববর্তী এলাকায় (রশিদপুর) তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিষয়টি সামনে আসে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে। শেভরনের পক্ষ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হয়। ওই সময় রশিদপুরের বিষয়টি নাকচ করে বিশেষ বিধান আইনের আওতায় ব্লক-৮ ও ১১ বিষয়ে সবুজ সংকেত প্রদান করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। এরপর তাদেরকে বিস্তারিত প্রস্তাব দিতে বলা হয়েছিল।

শেভরন তার বিস্তারিত প্রস্তাবে অফশোর (সাগর) মডেল পিএসসি ২০২৩’র আলোকে চুক্তির প্রস্তাব দেয়। ওই প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করার জন্য পেট্রোবাংলা একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করে। কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে চলতি বছরের (২০২৫ সালে) জানুয়ারি মাসে পেট্রোবাংলা প্রস্তাবটি নাকচ করে দেওয়া হয়।

পেট্রোবাংলা কমিটি তার রিপোর্টে বলেছে, বিশেষ বিধান আইন বাতিল করা হয়েছে, এমতাবস্থায় দরপত্র ছাড়া কোনো ব্লক ইজারা দেওয়ার সুযোগ নেই। দরের বিষয়ে বলেছে গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন অনেক ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপুর্ণ, সে কারণে সেখানে গ্যাসের দর অনেক বেশি হয়ে থাকে। স্থলভাগে ওই দর অনুযায়ী চুক্তি হতে পারে না।

কি রয়েছে মডেল পিএসসি-২০২৩-এ!

মডেল ২০২৩’র আলোকে চুক্তি করতে চায় শেভরন। আগের পিএসসিগুলোতে গ্যাসের দর স্থির থাকলে মডেল পিএসসি ২০২৩ এ ব্রেন্ট ক্রডের দরের যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম ধরা হয়েছে ব্রেন্ট ক্রডের ১০ শতাংশ দরের সমান। বলা হয়েছে ব্রেন্ট ত্রুডের আন্তর্জাতিক দর বাড়লে গ্যাসের দাম বাড়বে, আর কমে গেলে কমে যাবে। ব্রেন্ট ক্রডের দাম ১০০ ডলার হলে গ্যাসের দাম হবে ১০ ডলার। যা আগের পিএসসিতে যথাক্রমে অগভীর ও গভীর সমুদ্রে ৫.৬ ডলার ও ৭.২৫ ডলার স্থির দর ছিল।

অন্যদিকে শেভরন বাংলাদেশকে ব্লক-১২ ইজারা দেওয়া হয়েছে ২.৭৬ ডলারে। তাদের প্রস্তাব অনুমোদন হলে প্রায় কয়েকগুণ বেশি দর দিতে হবে নতুন এলাকার জন্য। রশিদপুর গ্যাস ফিল্ড থেকে প্রতি ঘনমিটার গ্যাস ১ টাকা দরে সরবরাহ করছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সিলেট গ্যাস ফিল্ড কোম্পানি লিমিটেড। আর শেভরনের কাছ থেকে সেই গ্যাস (যদি ৮ ডলার ধরা হয়) ৩৪ টাকা দরে কিনতে হবে।

শেভরন বাংলাদেশের ম্যানেজার (মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন) শেখ জাহিদুর রহমানের ভাষ্য,এই মুহূর্তে শেভরন বাংলাদেশ তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রকাশ করতে চায় না। তিনি বলেন, শেভরন বাংলাদেশ, সরকার ও পেট্রোবাংলার সঙ্গে ৩০ বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশকে সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ করে যাচ্ছে। জ্বালানি খাতের সম্ভাবনা অন্বেষণ অব্যাহত রাখতে চায়।

সূত্র জানায়, শেভরন বাংলাদেশ তাদের মালিকানাধীন ৩টি গ্যাসক্ষেত্র থেকে ২৫ নভেম্বর ১০১৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করেছে। যা বাংলাদেশের মোট উৎপাদিত গ্যাসের অর্ধেকের চেয়েও অনেক বেশি। ২৫ নভেম্বর দেশীয় গ্যাসফিল্ডগুলোর মোট উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ১৭৩৬ মিলিয়ন ঘনফুট।

এদিকে গত বছরের ৩ ডিসেম্বর প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে শেভরনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক ক্যাসুলোর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল। বৈঠকে তারা জানিয়েছে বাংলাদেশে নতুন গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগ পরিকল্পনা ।

জ্বালানি খাতের অন্যতম বৃহৎ প্রতিষ্ঠান শেভরন জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করার প্রয়াসে বাংলাদেশে নতুন গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধান কার্যক্রমে বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা করেছে।

শেভরনের কর্মকর্তারা বলেন, তারা খুশি যে বিগত শেখ হাসিনা সরকার গত দুই বছরে কোম্পানিটিকে অর্থ প্রদান বন্ধ করার পর, অন্তর্র্বর্তী সরকার শত শত মিলিয়ন ডলারের বকেয়া পরিশোধ শুরু করেছে।

ক্যাসুলো বলেন, ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক কর্মকান্ড ও উৎকৃষ্ট ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা শেভরনকে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নতুন খনন কার্যক্রমে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা নতুন উপকূলীয় গ্যাস অনুসন্ধানেও বিনিয়োগ করব।’ নতুন গ্যাস মজুদ দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াবে।

চাপ দিয়ে বকেয়া আদায়

দেশে গ্যাসের উৎপাদন টানা কমতে থাকায় বেশি দামের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি বেড়েছে। অথচ গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর একটি প্রতিশ্রুত বিনিয়োগ বন্ধ রেখে চাপ দিয়ে বকেয়া বিলের পুরোটা আদায় করে নিয়েছে শেভরন।

বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র বলছে, চুক্তি অনুসারে গ্যাস বিল জমা দেওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে তা পরিশোধ করতে হয়। বিল দিতে দেরি হলে জরিমানা দিতে হয়। এবার মোট জরিমানা শোধ করা হয়েছে ৩ কোটি ডলারের (১২২ টাকা ধরে ৩৬৬ কোটি টাকা) বেশি।

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের তিনটি গ্যাসক্ষেত্র (বিবিয়ানা, মৌলভীবাজার ও জালালাবাদ) থেকে গ্যাস উৎপাদন করে শেভরন। প্রতি মাসে গড়ে তাদের বিল দাঁড়ায় প্রায় চার কোটি ডলার। বিগত সরকারের সময় ডলারসংকটে বিল বকেয়া শুরু হলে চাপ দিতে থাকে শেভরন। সরকার পতনের পর বকেয়া ছিল ২৪ কোটি ডলার। এটি পরিশোধে তারা নতুন বিনিয়োগ বন্ধ রেখে চাপ তৈরি করে। তিন দশক ধরে তারা বাংলাদেশে ব্যবসা করছে। বিভিন্ন সময়ে নানা সুবিধা নিয়েছে। তাদের কাছে এমন আচরণ অপ্রত্যাশিত। বকেয়া ও জরিমানা আদায় করলেও নতুন বিনিয়োগ পেছানোর জন্য গড়িমসি করছে শেভরন।

পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে একের পর এক কূপ সংস্কার, উন্নয়ন ও খননের কাজ করছে সরকার। শেভরন পরিচালিত তিনটি গ্যাসক্ষেত্রেও উৎপাদন কমছে। সিলেটের জালালাবাদ গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদন বাড়াতে একটি কমপ্রেসর বসানোর কথা তাদের। এ বছরের ডিসেম্বরে এটি শেষ হওয়ার কথা ছিল। এর জন্য চুক্তির মেয়াদও বাড়িয়ে নিয়েছিল তারা। অথচ এখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুন বিনিয়োগ পিছিয়ে দেওয়ার জন্য নানাভাবে গড়িমসি করছে।

সূত্র জানায়, গত বছরের ৪ এপ্রিল পেট্রোবাংলাকে চিঠি দেয় শেভরন। এতে তারা বলে, বকেয়া বিল পুরোপুরি শোধ না করা পর্যন্ত জালালাবাদ কমপ্রেসর প্রকল্পের বিনিয়োগ পিছিয়ে দিচ্ছে তারা।

অন্তর্র্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বকেয়া পরিশোধে উদ্যোগ নেয়। গত ১৭ এপ্রিল শেভরনের সব বকেয়া শোধ করা হয়। এরপর ২০ এপ্রিল শেভরনকে চিঠি পাঠায় পেট্রোবাংলা।

এতে বলা হয়, প্রকল্পের কাজ শেষ হলে জালালাবাদ থেকে ৩৫২ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস অতিরিক্ত উৎপাদন করা যাবে বলে জানিয়েছিল শেভরন। যথাসময়ে প্রকল্পটি শেষ করতে না পারলে গ্যাসের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাবে। এতে জালালাবাদ গ্যাসক্ষেত্রে চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে। যেহেতু সব বকেয়া শোধ করা হয়েছে, শেভরন দ্রুত জালালাবাদে কাজ শুরু করবে বলে আশা করছে পেট্রোবাংলা।

পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, পেট্রোবাংলার চিঠির দুই মাস পর গত ২২ জুন পাঠানো চিঠিতে আবার শর্ত দেয় শেভরন। নিয়মিত বিল শোধের পাশাপাশি ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বিল পরিশোধে দেরির জরিমানা দিতে বলে তারা। তাদের বেঁধে দেওয়া সময়ের আগেই গত ২৯ আগস্ট জরিমানার পুরো টাকা শোধ করে পেট্রোবাংলা। এরপর ৩১ আগস্ট শেভরনকে আবার চিঠি পাঠায় পেট্রোবাংলা। জালালাবাদ প্রকল্পের সুবিধা নিতে দ্রুত কাজ শুরু করতে শেভরনকে অনুরোধ জানায় তারা।কাজ শুরু করার পর এটি শেষ করতে দুই বছর সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলার একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা।