# চিকিৎসকেরা নিশ্চিত করলেই এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হবে ---ফখরুল
# কাতার নয় আসছে জার্মান প্রাইভেট এয়ার অ্যাম্বুলেন্স
# শাশুড়িকে নিতে ঢাকায় পুত্রবধূ ডা. জুবাইদা রহমান
শারীরিক অবস্থা ঠিক থাকলে ও মেডিকেল বোর্ড সিদ্ধান্ত দিলে বেগম খালেদা জিয়াকে আগামীকাল রোববার উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে নেয়া হতে পারে। এমনটি জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। যদিও বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে গতকাল শুক্রবার লন্ডনে নেওয়ার কথা ছিল । এদিকে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা অপরিবর্তিত। আগে যা ছিল, সে অবস্থাতেই আছেন। গত ১৩ দিন ধরে সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তার সংকটাপন্ন শারীরিক অবস্থা নিয়ে পরিবার, দলীয় নেতাকর্মী ও দেশের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা বিরাজ করছে।
উন্নত চিকিৎসার জন্য গত জানুয়ারি মাসে লন্ডনে গিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। সেখানে প্রথমে হাসপাতালে, পরে ছেলে তারেক রহমানের বাসায় থেকে তিনি চিকিৎসা নেন। প্রায় চার মাস পর গত ৬ মে তিনি দেশে ফেরেন। দেশে ফিরেও তিনি বাসা ও হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন।
সূত্র মতে, গুরুতর অসুস্থ খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার বিষয়টি কয়েক দিন ধরেই আলোচনা চলছিল। গতকাল তাকে লন্ডনে নেওয়ার কথা ছিল। জানা গেছে, কাতারের আমিরের পাঠানো এয়ার অ্যাম্বুলেন্স কারিগরি ত্রুটির কারণে না আসায় খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নেওয়ার প্রক্রিয়াটি কিছুটা পিছিয়ে গেছে। গতকাল সকাল ১০টায় বিএনপির মিডিয়া সেল তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এ কথা জানিয়েছে। ফেসবুক পেজে বিএনপি জানায়, কাতারের আমিরের পাঠানো বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্স এখনো না পৌঁছানোয় বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নেওয়ার প্রক্রিয়াটি কিছুটা পিছিয়ে যাচ্ছে।
ওই পেজে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, কারিগরি ত্রুটির কারণে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স শুক্রবার আসছে না। সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে এটি শনিবার পৌঁছাতে পারে। তিনি আরও বলেন, ম্যাডামের শারীরিক অবস্থা যদি যাত্রার জন্য উপযুক্ত থাকে এবং মেডিকেল বোর্ড সিদ্ধান্ত দিলে ইনশা আল্লাহ ৭ তারিখ রোববার তিনি লন্ডনের উদ্দেশে রওনা দেবেন।
এদিকে আজ শুক্রবার বাদ জুমা রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়সংলগ্ন মসজিদে খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় দোয়ার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, চিকিৎসকেরা নিশ্চিত করলেই বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হবে। খালেদা জিয়াকে সুস্থ করে তুলতে চিকিৎসকেরা প্রাণপণে চেষ্টা করছেন উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল আরও বলেন, চিকিৎসকেরা আশা করছেন শনিবার এয়ার অ্যাম্বুলেন্স বাংলাদেশে এসে পৌঁছালে রোববার তাকে লন্ডনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
মির্জা ফখরুল সাংবাদিকদের আরও বলেন, গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় গত কিছুদিন ধরে খালেদা জিয়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছেন। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের উচ্চমানের চিকিৎসকেরা তার চিকিৎসা করছেন। তবে এই চিকিৎসা আরও উন্নত হাসপাতালে করা প্রয়োজন বলে সবাই মনে করছেন। সে কারণে তাকে ইংল্যান্ডের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। মির্জা ফখরুল বলেন, কাতার আমিরের বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্স না পৌঁছানোয় বিএনপি চেয়ারপার্সনের লন্ডনে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি পিছিয়ে যাচ্ছে। তিনি জানান, সব ঠিক থাকলে সেটা শনিবার ঢাকায় পৌঁছাতে পারে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকার খালেদা জিয়াকে ছয় বছর কারারুদ্ধ করে রেখেছিল বলেন বিএনপির মহাসচিব। তিনি বলেন, এর মধ্যে দুই বছর তাকে নির্জন, পুরোনো কারাগারে আটক করে রাখা হয়েছে। সবাই সন্দেহ করেন, সেখান থেকেই তার রোগের সূচনা হয়। চিকিৎসার অভাবে তিনি আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন। করোনার সময় থেকে গত চার বছর তিনি গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। এরপর তিনি সুস্থ হলেও কিছুদিন আগে আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন।
দেশবাসীর কাছে খালেদা জিয়ার সুস্থতায় দোয়া চেয়েছেন মির্জা ফখরুল। বিএনপি মহাসচিব বলেন, বাংলাদেশের সব মানুষ দল-মত নির্বিশেষে এই মহান নেত্রীর জন্য দোয়া করছেন। তিনি যেন সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসেন এবং দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে তার অভিভাবকত্বে আমরা যেন উৎরে যেতে পারি, সেজন্য দেশের জনগণ আল্লাহ তায়ালার কাছে আকুতি করেছেন।
সূত্র জানায়, বিএনপি চেয়ারপার্সন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য লন্ডন নেওয়ার পরিকল্পনায় পরিবর্তন এসেছে। এর আগে কাতার থেকে একটি বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্স পাঠানোর কথা ছিলো। তবে শেষ মুহূর্তে তা সম্ভব না হওয়ায় এখন জার্মানভিত্তিক প্রাইভেট এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করা হবে। জার্মান প্রাইভেট এয়ার অ্যাম্বুলেন্স কোম্পানি এফএআই রেন্ট-এ জেট জিএমবিএইচ এর সিএল৬০ (বোম্বার্ডিয়ার চ্যালেঞ্জার ৬০০ সিরিজ) জেট খালেদা জিয়াকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে নিয়ে লন্ডনের উদ্দেশ্যে রওনা হবে। বিমানটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে জর্জিয়ার রাজধানী তিবলিসি হয়ে সরাসরি লন্ডন যাবে। আজ শনিবার বেলা ৩টা ২০ মিনিটে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সটির রওনা দেওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে কাতার সরকারের পাঠানো এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ‘এয়ারবাস ৩১৯’ এ করে লন্ডন গিয়েছিলেন খালেদা জিয়া।
এদিকে চিকিৎসার জন্য শাশুড়িকে লন্ডনে নিতে বড় ছেলে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান গতকাল ঢাকায় এসেছেন। বিমানবন্দর থেকে খালেদা জিয়াকে দেখতে বেলা ১১টা ৫৩ মিনিটে সরাসরি এভারকেয়ার হাসপাতালে আসেন তিনি। সেখানে দলের নেতাকর্মীর ছাড়াও চিকিৎসকগণ তাকে নিসিভ করেন। জোবাইদা রহমান হাসপাতালের ইমার্জেন্সি লিফট দিয়ে খালেদা জিয়ার কাছে যান। তিনি কিছু সময় খালেদা জিয়ার পাশেই কাটান। পরে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে নিজের মায়ের বাসায় যান ডা. জোবাইদা। বেলা ৩টার কিছু আগে তিনি ধানমন্ডির বাসায় পৌঁছান।
রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের সিসিইউতে চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় সারাদেশে বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুক্রবার জুমার নামাজের পর দেশের সব মসজিদে বিএনপির উদ্যোগে এ দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীসহ সাধারণ জনগণও দোয়ায় অংশ নেন। একই সঙ্গে দেশনেত্রীর সুস্থতা কামনায় মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডাসহ অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে প্রার্থনা করার জন্যও অনুরোধ করা হয়।
৮১ বছর বয়সী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে লিভার সিরোসিস, আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস এবং কিডনি, ফুসফুস, হৃদপিণ্ড এবং চোখের সমস্যাসহ একাধিক জটিলতায় ভুগছেন। হৃৎপিণ্ড এবং ফুসফুসে সংক্রমণ ধরা পড়ার পর ২৩ নভেম্বর তাকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর থেকে দেশি-বিদেশি চিকিৎসকরা তার চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।