চরম ভোগান্তি মানুষের

লোডশেডিং ১ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে

গ্রীষ্মকাল শুরু না হতেই এবার দেশে বিদ্যুতের লোডশেডিং বেড়ে গেছে। শহরে যেমন তেমন গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ থাকেই না বলা চলে। কিছু সময়ের জন্য বিদ্যুৎ আসলেও পরক্ষণেই চলে লোডশেডিং। ফলে মানুষের ভোগান্তির যেন শেষ নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে বিদ্যুতের লোডশেডিং ১ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। গরম যত বাড়ছে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেডিং বিদ্যুতের চাহিদা।

সূত্রমতে, আগে বিকল্প জ্বালানি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও এবার বেশ কিছু কারণে গ্রীষ্ম ও সেচ মৌসুমে লোডশেডিং পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি আমদানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আর বিদ্যুৎ বিভাগ এরই মধ্যে জ্বালানি সংকটে লোডশেডিং হওয়ার বিষয়টিও স্বীকার করেছে। এ অবস্থায় শহরে তুলনামূলক কম লোডশেডিং হলেও গ্রামাঞ্চলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং চলছে। গ্যাস ও কয়লা সংকটে সক্ষমতার পুরো বিদ্যুৎ উৎপাদন এখন সম্ভব হচ্ছে না।

সূত্র জানায়, গ্রীষ্মের আগেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বিদ্যুৎখাত। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও উঠছে প্রায় ১৫ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত। জ্বালানি সংকটে উৎপাদন কমায়, লোডশেডিং ছাড়িয়েছে ১ হাজার মেগাওয়াট।

জানা গেছে, দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। কিন্তু উৎপাদন হচ্ছে ৫ হাজার মেগাওয়াটের আশপাশে। জ্বালানির অভাবে অলস পড়ে আছে অনেক কেন্দ্র। চলতি বছর মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে কাতার ও ওমান থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ হচ্ছে না। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ নেমেছে ৯০ কোটি ঘনফুটের ঘরে। গত বছর যা ছিল ১১০ কোটি ঘনফুট। সেইসঙ্গে তরল জ্বালানির মজুতও কমেছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সম্প্রতি সচিবালয়ে সাংবাদিদের বলেন, ‘যুদ্ধ যতদিন থাকবে ততদিন এই ক্রাইসিস থাকবে। তার পরও আমরা অন্য যে সকল গ্যাস আমদানির সোর্স রয়েছে সেগুলো থেকে আমদানির ব্যবস্থা করছি। তবে অবস্থা অসহনীয় হবে না, সহনীয়ই থাকবে। জ্বালানি না থাকলে তো বিদ্যুৎ প্রডিউস সম্ভব নয়।’

সূত্র জানায়, বুধবার রাত ৯টায় সারা দেশে ১৪ হাজার ৮৯০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে লোডশেডিং হয় ৯৯৬ মেগাওয়াট। ওইদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় লোডশেডিং ছিল ১০৮৩ মেগাওয়াট। ভারতের আদানির ঝাড়খন্ড কেন্দ্রের একটি ইউনিট থেকে মিলছে ৭৬৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ। অন্যান্য উৎস থেকে আমদানি প্রায় ১১০০ মেগাওয়াট।

জানা গেছে, কারিগরি সংকটের কারণে ভারতের আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ আছে। আবার তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মালিকরা সরকারের কাছে বিশাল পাওনার কারণে তেল আমদানির সুযোগ পাচ্ছেন না। দ্রুত ফুরিয়ে আসছে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছে থাকা তেল। ফলে দ্রুত জ্বালানি নিশ্চিত করতে না পারলে এবং তাপমাত্রা সহনীয় না থাকলে এবার গ্রীষ্মে লোডশেডিংয়ের মাত্রা কয়েক বছরের তুলনায় বেশি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য বলছে, সোমবার সন্ধ্যা ৭টায় ১ হাজার ৮৩ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়। এ সময় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৭৫০ মেগাওয়াট এবং আর সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ৬১৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এর আগে ৪ এপ্রিল ১ হাজার ৮০ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়। এদিন বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ১০০ মেগাওয়াট। দেশে এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াট। এবার গ্রীষ্মে সর্বোচ্চ চাহিদা দাঁড়াতে পারে ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট সক্ষমতা ১২ হাজার ২০৪ মেগাওয়াট। বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় সক্ষমতার অর্ধেকের বেশি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। আবার কয়লাসংকট থাকায় পটুয়াখালী ও মাতারবাড়ীর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডেও সূত্র জানায় , ‘ভারতের আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎকেন্দ্রটির কারিগরি ত্রুটির কারণে একটি ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন আপাতত বন্ধ আছে। এখন সেখান থেকে ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসছে। আদানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন ১২ থেকে ১৫ এপ্রিল এ ইউনিট ঠিক হতে পারে। চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বর্তমানে সরকার জ্বালানি নিয়ে কিছুটা চাপে আছে। আবার কয়লা চলে এলে এ সংকট কিছুটা ঘুচবে। এজন্য আরও সপ্তাহখানেক অপেক্ষা করতে হবে। মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা ১২ এপ্রিল আসবে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে।’

বিপিডিবি জানায়, ‘বর্তমানে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে আমরা ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নিচ্ছি। আবার যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ চালাতেও চিন্তা করতে হচ্ছে। আগে স্বাভাবিক সময়ে গ্যাস বা অন্য কোনো জ্বালানি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেলেও এবার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। আশা করছি আদানির ইউনিটটি চালু হলে এবং তাপমাত্রা কম থাকলে লোডশেডিং পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’

সূত্র মতে, বর্তমানে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের কাছে মাত্র দুই সপ্তাহের জ্বালানি তেল আছে। তাঁরা আশঙ্কা করছেন, যেদিন দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াট হবে সেদিন ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং হবে। আর ১৭ হাজার মেগাওয়াট চাহিদা হলে লোডশেডিং হবে ৩ হাজার মেগাওয়াট। মে মাসে যদি বকেয়া টাকা পাওয়ার পর এলসি খুলে তারা তেল কিনতে পারে তাহলে সমস্যা হবে না। কিন্তু তা না হলে এবং তাদের কাছে থাকা তেল ফুরিয়ে গেলে গ্রীষ্মে এবার ৪ থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হতে পারে।

বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের একজন শীষ কর্মকর্তা জানান , ‘সরকারের কাছ থেকে আমাদের পুরো পাওনা পেলে এবং প্রয়োজনীয় তেল থাকলে সাড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমরা দিতে পারব। কিন্তু আমাদের বিশাল পাওনা বকেয়া আছে। আর তেল যা আছে তা দিয়ে এপ্রিলের ১৫ থেকে ২০ পর্যন্ত সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এর মধ্যে সম্প্রতি ১৫ হাজার মেগাওয়াট চাহিদা ছাড়িয়ে গেলে আমাদের থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নিয়েছে সরকার। আমাদের কাছে সরকার ৮০ শতাংশ লেভেলে বিদ্যুৎ চাচ্ছে। কিন্তু এভাবে দিলে ১৫ এপ্রিলের বেশি আর বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে না। এজন্য আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ লেভেলে সরকারকে বিদ্যুৎ দেব। অর্থাৎ ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দেব। রেশনিং করে বিদ্যুৎ দিলে হয়তো আরও কয়েক দিন বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে।’

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন,জ্বালানির সমস্যা এরকম চললে সামনের দিনগুলোতে সাফার করার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। ইমিডিয়েটলি সরকারকে জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়া এবং বাসা-বাড়িতে পরিকল্পিত লোডশেডিং করে কারখানাগুলো যেন ঠিকভাবে চলে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। গ্রাহক পর্যায়েও সচেতনতা জরুরি।