বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসী ভিসা (ইমিগ্র্যান্ট ভিসা) দেওয়ার প্রক্রিয়া স্থগিত করছে যুক্তরাষ্ট্র। ২১ জানুয়ারি থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হচ্ছে। তবে এই নিষেধাজ্ঞা পর্যটক, ব্যবসা বা অন্যান্য অস্থায়ী (নন-ইমিগ্র্যান্ট) ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি নথিতে এমনটি উল্লেখ করা হয়েছে বলে গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজ জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন মুখপাত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে ৭৫টি দেশের অভিবাসী ভিসা আবেদনপ্রক্রিয়া স্থগিত করতে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে তিনি পরিকল্পনার বিস্তারিত জানাননি। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর গতকাল এক্সে (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে বলেছে, ‘পররাষ্ট্র দপ্তর ৭৫টি দেশের ইমিগ্র্যান্ট ভিসাপ্রক্রিয়া স্থগিত করবে, যেসব দেশের অভিবাসীরা আমেরিকান জনগণের কাছ থেকে অগ্রহণযোগ্য হারে কল্যাণমূলক সুবিধা নিয়ে থাকেন। নতুন অভিবাসীরা আমেরিকান জনগণের কাছ থেকে সম্পদ বের করে নেবেন না, এটা যত দিন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করতে না পারবে, তত দিন পর্যন্ত এই স্থগিত অবস্থা বহাল থাকবে।’
ফক্স নিউজের খবরে বলা হয়েছে, পররাষ্ট্র দপ্তরের নথি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সহায়তা নিতে পারেন, এমন ব্যক্তিদের যাওয়া ঠেকাতে আবেদনকারীদের যাচাইবাছাই প্রক্রিয়া পুনর্মূল্যায়ন করতে যাচ্ছে পররাষ্ট্র দপ্তর। এটি না হওয়া পর্যন্ত অভিবাসী ভিসা দেওয়ার প্রক্রিয়া স্থগিত থাকবে। নথিতে যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলার কর্মকর্তাদের বিদ্যমান আইনের আওতায় ভিসা না দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে কত দিন এই ভিসা দেওয়ার প্রক্রিয়া স্থগিত থাকবে, তা উল্লেখ করা হয়নি।
ওয়াশিংটন থেকে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, অভিবাসী ভিসার ব্যাপারে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য জানতে পারেনি। তবে এ মাসের শুরুতে অভিবাসীদের মধ্যে কোন দেশের নাগরিকেরা যুক্তরাষ্ট্রের বেশি সরকারি সহায়তা নিচ্ছেন, সে তালিকা প্রকাশের পর থেকেই ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপের ইঙ্গিত ছিল বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসীদের মধ্যে কোন দেশের নাগরিকেরা বেশি সরকারি সহায়তা (ওয়েলফেয়ার) নিচ্ছেন, তার তালিকা ৪ জানুয়ারি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে প্রকাশ করেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ১২০টি দেশ ও অঞ্চলের ওই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৯তম স্থানে। ‘ইমিগ্র্যান্ট ওয়েলফেয়ার রেসিপিয়েন্ট রেটস বাই কান্ট্রি অব অরিজিন’ শিরোনামে প্রকাশিত তালিকায় দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশী অভিবাসী পরিবারগুলোর ৫৪ দশমিক ৮ শতাংশই সরকারের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে থাকে। তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ার আরও চার দেশ ভুটান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও নেপাল ছিল। তবে ভারত ও শ্রীলঙ্কার নাম ছিল না।
যুক্তরাষ্ট্র যে ৭৫টি দেশের জন্য অভিবাসী ভিসা স্থগিত করতে যাচ্ছে, সেই তালিকা এখনো দেশটির কোনো কর্তৃপক্ষ প্রকাশ করেনি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের নথির বরাত দিয়ে করা প্রতিবেদনে ফক্স নিউজ সেই তালিকা প্রকাশ করেছে। সেখানে বাংলাদেশের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার ওই চার দেশ ভুটান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও নেপালেরও নাম রয়েছে।
ফক্স নিউজের দেওয়া ভিসা নিষেধাজ্ঞায় ৭৫টি দেশের তালিকাটি হলো: আফগানিস্তান, আলবেনিয়া, আলজেরিয়া, অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বাহামাস, বাংলাদেশ, বার্বাডোস, বেলারুশ, বেলিজ, ভুটান, বসনিয়া, ব্রাজিল, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া, ক্যামেরুন, কেপ ভার্দে, কলম্বিয়া, আইভরি কোস্ট, কিউবা, কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, ডোমিনিকা, মিসর, ইরিত্রিয়া, ইথিওপিয়া, ফিজি, গাম্বিয়া, জর্জিয়া, ঘানা, গ্রেনাডা, গুয়াতেমালা, গিনি, হাইতি, ইরান, ইরাক, জ্যামাইকা, জর্ডান, কাজাখস্তান, কসোভো, কুয়েত, কিরগিজস্তান, লাওস, লেবানন, লাইবেরিয়া, লিবিয়া, মেসেডোনিয়া, মলদোভা, মঙ্গোলিয়া, মন্টেনেগ্রো, মরক্কো, নেপাল, নিকারাগুয়া, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, রাশিয়া, রুয়ান্ডা, সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস, সেন্ট লুসিয়া, সেন্ট ভিনসেন্ট অ্যান্ড গ্রেনাডিনস, সেনেগাল, সিয়েরা লিওন, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, সুদান, সিরিয়া, তানজানিয়া, থাইল্যান্ড, টোগো, তিউনিসিয়া, উগান্ডা, উরুগুয়ে, উজবেকিস্তান ও ইয়েমেন।
যুক্তরাষ্ট্রের অলাভজনক জরিপ প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা অভাবনীয় হারে বেড়েছে। ২০০০ সালে যেখানে বাংলাদেশীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৪০ হাজার, ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৭০ হাজারে। অর্থাৎ দুই দশকে জনসংখ্যা বেড়েছে ৫৬৯ শতাংশ। এই সিদ্ধান্তের ভিত্তি তৈরি হয়েছে গত নভেম্বরে জারি করা একটি নির্দেশনার ওপর, যেখানে মার্কিন দূতাবাস ও কনস্যুলেট কর্মকর্তাদের বলা হয়েছিল-ভিসা আবেদনকারীদের আর্থিক সক্ষমতা, স্বাস্থ্য, বয়স, পারিবারিক অবস্থা, শিক্ষা, দক্ষতা এবং অতীতে সরকারি সহায়তা নেয়ার ইতিহাস অত্যন্ত কঠোরভাবে যাচাই করতে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের হাজারো পরিবারকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে, যাদের অনেকেই পরিবারভিত্তিক অভিবাসন, স্থায়ী বসবাস কিংবা গ্রিন কার্ডের জন্য আবেদন করে থাকেন। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, আবেদনকারীদের ইংরেজি দক্ষতাও যাচাই করা হতে পারে, এমনকি ইংরেজিতে সাক্ষাৎকার নেয়ার নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের আইনে আগেও ‘পাবলিক চার্জ’ হওয়ার ঝুঁকি যাচাইয়ের বিধান ছিল, তবে ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে এই সংজ্ঞা আরও বিস্তৃত করেন। বর্তমান নির্দেশনা সেই কঠোরতাকেই আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছে বলে মনে করছেন অভিবাসন বিশ্লেষকরা। তবে আশার কথা হলো-২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ ও ২০২৮ অলিম্পিক গেমস সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রে পর্যটক ও ব্যবসায়িক ভিসার চাহিদা বাড়বে, এবং সেসব ভিসা এই স্থগিতাদেশের বাইরে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের অভিবাসন প্রত্যাশীদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় ধাক্কা হলেও, যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে-এই স্থগিতাদেশ স্থায়ী নয়; বরং ভিসা প্রক্রিয়া পুনর্মূল্যায়নের অংশ। সূত্র: ফক্স নিউজ, এনডিটিভি