জ্বালানি তেলের জন্য পাম্পের দীর্ঘ সারি কমছে না। এখনও ঘণ্টার পর ঘণ্টা তেলের জন্য অপেক্ষা করছে মানুষ। ডিপো থেকে পাম্পে তেল সরবরাহ করা হয়। তবে ডিপোতে যে পরিমাণ জ্বালানি মজুত থাকার কথা সেখানে ঘাটতি আছে। তাই তারা চাহিদা মতো পাম্পে তেল সরবরাহ করতে হিমশিম খাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে পাম্পে।চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ জ্বালানি তেল ঘাটতি আছে ডিপোতে। ১৫টি ডিপোর দৈনিক চাহিদা, মজুত ও সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এমন তথ্য পেয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
তবে ডিপো এবং তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তাদের তথ্য মতে, ১৫-২০ শতাংশ তেল কম দেওয়া হচ্ছে। তাদের মতে, মজুতদারি ও কালোবাজারি রুখতে পাম্পগুলোকে চাহিদার চেয়ে কম তেল দেওয়া হচ্ছে। যদিও সরকারের দাবি, গত বছরের মার্চ-এপ্রিলের চাহিদার চেয়ে বেশি জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুসারে, গত বছরের একই সময়ে তুলনায় এ বছর পেট্রোল ও ডিজেল কম বিক্রি হয়েছে। অকটেন বিক্রি সামান্য বেড়েছে।
ভারত থেকে এলো আরো ৮ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল :
এদিকে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইনের মাধ্যমে আরো ৮ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল আমদানি করা হয়েছে। ভারত থেকে আসা এ ডিজেল পদ্মা অয়েল পিএলসি’র পার্বতীপুর ডিপোতে পৌঁছেছে। গতকাল শনিবার মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের ম্যানেজার (অপারেশন) কাজী মো. রবিউল আলম তথ্য জানান।
তিনি জানান, গত ৭ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে ডিজেল পাম্পিং শুরু হয়। শুক্রবার মধ্যরাতে পুরো চালান অর্থাৎ ৮ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল পার্বতীপুর ডিপোতে পৌঁছায়। বর্তমানে আমদানিকৃত ডিজেল বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
কাজী মো. রবিউল আলম জানান, ভারত থেকে ডিজেল আমদানি একটি চলমান প্রক্রিয়া। সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে আগামী ১৭ এপ্রিল আরো ৫ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল আমদানির জন্য পাম্পিং করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পদ্মা অয়েল পিএলসি’র পার্বতীপুর ডিপোর ডেপুটি ম্যানেজার (অপারেশন) মো. আহসান হাবিব চৌধুরী জানান, শুক্রবার মধ্যরাতে ডিপোতে ৮ হাজার ডিজেলের চালান এসেছে। ডিপোতে এখন পর্যাপ্ত ডিজেল মজুত রয়েছে।
এর আগে, ১১ ও ২৩ মার্চ দুই দফায় ৫ হাজার করে মোট ১০ হাজার মেট্রিক টন এবং ১ এপ্রিল আরো ৭ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল পাইপলাইনের মাধ্যমে দেশে আসে। সর্বশেষ চালানসহ চার দফায় মোট ২৫ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল বাংলাদেশে পৌঁছেছে।
উল্লেখ্য, আসামের নুমালিগড় এ অবস্থিত নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে ২০২১ সাল থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে নিয়মিতভাবে পরিশোধিত ডিজেল বাংলাদেশে আমদানি করা হচ্ছে।
এদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, এ মুহূর্তে জ্বালানি তেল বৈশ্বিক সংকট। সেই সংকটের আঁচ বাংলাদেশেও স্পর্শ করেছে। কিন্তু জনগণ যাতে ভোগান্তির স্বীকার না হয়, সেজন্য সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। শনিবার যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে একথা বলেন তিনি।
সরকারের বক্তব্য
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু গত ৩০ মার্চ জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, দেশে বর্তমানে কোনো জ্বালানি সংকট নেই। বরং সম্ভাব্য চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত মজুত ও প্রস্তুতি রয়েছে। মন্ত্রী বলেন, গত বছরের মার্চ মাসের চাহিদাকে ভিত্তি ধরে এবার ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত সরবরাহ ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে প্রকৃত চাহিদা সে অনুপাতে বাড়েনি। জনমনে প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি কেনার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তিনি জানান, গত বছর মার্চে ডিজেলের দৈনিক চাহিদা ছিল ১২ হাজার টন, অকটেন এক হাজার ২০০ এবং পেট্রোল এক হাজার ৪০০ টন। অথচ চলতি বছরের ১ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত অকটেন বিক্রি হয়েছে ২৮ হাজার ৯৩৯ টন, দৈনিক গড়ে এক হাজার ২৫৮ টন। অর্থাৎ ৫৮ টন অকটেন বেশি বিক্রি হয়েছে।
এদিকে বিপিসির তেল বিক্রির ডেটা অনুসারে গত বছরের একই মাসের তুলনায় গত মার্চে দিনে গড়ে ডিজেল সরবরাহ কমেছে ১০ শতাংশ, পেট্রোল সরবরাহ কমেছে ১৫ শতাংশ। তবে অকটেন সরবরাহ বেড়েছে ২ শতাংশ। দিনে গড়ে ২৯ টন বেশি অকটেন বিক্রি করা হয়েছে। এবার মার্চে দিনে গড়ে পেট্রোল বিক্রি হয়েছে এক হাজার ২৭১ টন। এপ্রিলে দিনে গড়ে বিক্রি হয়েছে এক হাজার ২৭০ টন। মার্চে প্রতিদিন গড়ে অকটেন বিক্রি হয়েছে এক হাজার ২২২ টন। তবে এপ্রিলের প্রথম কিছুটা কমিয়ে দিনে বিক্রি হয়েছে এক হাজার ১১৪ টন।
সূত্র বলছে, দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েলের ৫৫টি ডিপো রয়েছে। পুলিশের একটি গোয়েন্দা বিভাগ দেশের ১৫টি ডিপোর তথ্যউপাত্ত যাচাই-বাছাই করে চার দিন আগে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। প্রতিবেদন অনুসারে, জ্বালানি তেলের দৈনিক ঘাটতি ৪০.২৩ শতাংশ। এর মধ্যে ডিজেল কম সরবরাহ হচ্ছে ৪০.১০ শতাংশ, অকটেন ৩৮.৮০ শতাংশ এবং পেট্রোল ৪১.৭ শতাংশ।