সনদ বাস্তবায়ন না হলে সরকারের বৈধতা নিয়েও চ্যালেঞ্জ হতে পারে -ব্যারিস্টার শাহরিয়ার

সংসদ রিপোর্টার: দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর শুরু হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা। আগামীকাল বৃহস্পতিবার শুরু হবে প্রথম অধিবেশন। এ সংসদ প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে বলে সবার প্রত্যাশা। তবে এ সংসদকে নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। সংসদ অধিবেশনের দিনই সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করার বিধান রয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশে। কিন্তু এ অধিবেশন আহ্বান না করায় গণভোটের মাধ্যমে পাস হওয়া জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে ভবিষ্যতে আদালতে চ্যালেঞ্জ হলে বর্তমান সরকারের বৈধতা হারানোর শঙ্কা থেকে যায় বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা। তবে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার দলীয় জোটের সংসদ সদস্যরা যে কোন সময় সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে বলেও মনে করছেন তারা।

এদিকে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথের জন্য গত ১৬ ফেব্রুয়ারির চিঠি কেন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে গণভোট অধ্যাদেশের ৩ ধারা ও তফসিল সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় কেন তা আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, সে বিষয়েও রুলে জানতে হয়েছে। সব মিলিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন অনেকটা অনিশ্চয়তার দিকে যাচ্ছে। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, জুলাই সনদ নিয়ে সংসদে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এ বিষয়ে আদালতের নির্দেশনাও আমলে নেয়ার কথা বলেছেন তিনি।

হাইকোর্টের রুল জারির পর এভভোকেট শিশির মনির বলেছেন, বাংলাদেশে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন আদেশ না থাকলে এবং ঐকমত্যের ভিত্তিতে নেওয়া সংস্কার প্রস্তাবগুলো হোঁচট খেলে নির্বাচন ও সরকারের অস্তিত্বই বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়বে। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক বিষয়কে আদালতের বিষয়বস্তু বানিয়ে সরকার এক ধরনের ‘দ্বিচারিতা’ করছে।

তিনি বলেন, যদি বাংলাদেশে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আদেশ না থাকে, ৩০টি কনসেনসাসের ভিত্তিতে সংস্কার প্রস্তাব না থাকে, গণভোটের প্রশ্নও অবৈধ হয় তাহলে শেষ পর্যন্ত থাকবে কী? শেষ পর্যন্ত নির্বাচন থাকে? সরকার থাকে? নিজের গদি থাকে? সবকিছুই বড় ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন। তো এই দায় দায়িত্ব তাদেরকে বিএনপি নিতে হবে।

তবে আইনজ্ঞরা মনে করেন, এখনো বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখতে পারেন। আর জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে ভবিষ্যতে বর্তমান সরকারের বৈধতা নিয়ে আদালতে চ্যালেঞ্জ হলে বর্তমান সরকার অবৈধ ঘোষিত হওয়ার শঙ্কা থেকে যায়।

এ বিষয়ে ব্যারিষ্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির দৈনিক সংগ্রামকে বলেছেন, সংবিধানের এক অংশ মানবেন, অন্য অংশ মানবেন না তা হতে পারে না। সংসদের প্রথম অধিবেশনেই রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে নব নির্বাচিত স্পীকারকে দায়িত্ব দিয়ে রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেয়া যেতে পারে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীকে চিঠিও দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা এ বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নেয়নি। আর সংসদ অধিবেশনের দিনই সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশণ আহ্বান করার কথা জুলাই সনদ আদেশের ১০ নাম্বার অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেননি। এখন জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে ভবিষ্যতে কেউ আদালতে চ্যালেঞ্জ করলে ৫ম সংশোধনী বাতিল হওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। এ সরকারও অবৈধ ঘোষিত হওয়ার শঙ্কা থেকে যায়। কেননা, রাষ্ট্রপতি কিন্তু বলেছেন, শেখ হাসিনার পদত্যাগ পত্র তার কাছে নেই। সুতরাং বিএনপির সংসদ সদস্যদের এখনো সুযোগ আছে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেয়া।

বিরোধী দলের ভূমিকার বিষয়ে তিনি বলেন, সংসদের প্রথম দিনই বিরোধী দলের উচিত হবে বিএনপির সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেয়ার জন্য আহ্বান জানানো। যদি তারা শপথ না নেয়, তাহলে তারা সংসদ বর্জন করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

আগামীকালের সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিনই নির্বাচিত হবেন স্পীকার ও ডেপুটি স্পীকার। এখনো বিএনপির পক্ষ থেকে স্পীকারের নাম প্রকাশ করা হয়নি। তবে ড. মঈন খান ও এডভোকেট জয়নুল আবেদীনের নাম শোনা যাচ্ছে। এদিকে জামায়াতের পক্ষ থেকে ডেপুটি স্পীকার মনোনয়ন দেয়ার জন্য বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। তবে এ ডেপুটি স্পীকার কী জুলাই সনদে প্রস্তাবিত বিধান অনুযায়ী নাকি বিএনপির ইশতেহারে অনুযায়ী এ বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়। কেননা বিএনপির ইশতিহার দু’জন ডেপুটি স্পীকার দেয়ার কথা বলা হয়েছে।

সংসদের প্রথম অধিবেশনে যেকোনো সংসদ সদস্য স্পিকারের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন বলে জানিয়েছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির। তিনি বলেছেন, যেহেতু স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকারের পদ বর্তমানে খালি আছে, তাই জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদ ও কার্যপ্রণালি বিধি ৮-১০ মোতাবেক যেকোনো সংসদ সদস্য স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।

সংসদের প্রথম অধিবেশন যেভাবে শুরু হবে

সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন সম্পর্কে বলা আছে, ‘কোনো সাধারণ নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকে সংসদ-সদস্যদের মধ্য হইতে সংসদ একজন স্পিকার ও একজন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করিবেন, এবং এই দুই পদের যে কোনটি শূন্য হইলে সাত দিনের মধ্যে কিংবা ওই সময়ে সংসদ বৈঠকরত না থাকিলে পরবর্তী প্রথম বৈঠকে তাহা পূর্ণ করিবার জন্য সংসদ-সদস্যদের মধ্য হইতে একজনকে নির্বাচিত করিবেন।’

সংবিধানে আরো বলা আছে, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের পদ শূন্য হলে বা কোনো কারণে তারা দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য এই দায়িত্ব পালন করবেন। তবে, জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী প্রথম অধিবেশন পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রপতি কাউকে মনোনীত করতে পারেন।

শুরুতেই স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন

স্পিকার-ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধান নির্বাচন কমিশনার সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ অনুসরণ করে সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করান। বিএনপি-জামায়াত-এনসিপিসহ অন্যান্য নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ বাক্য পাঠ করেন। ওইদিন বিকেলে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ হয়। গত সংসদের স্পিকার-ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তির সভাপতিত্বে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হবে। তারপর ওই অধিবেশনেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে।’

নিয়ম অনুযায়ী কোনো একজন সংসদ সদস্য স্পিকার হিসাবে কারো নাম প্রস্তাব করে সংসদ সচিবালয়ের সচিবকে নোটিশ করবেন। অন্য একজন সংসদ সদস্যকে সেই প্রস্তাবে সমর্থন জানাতে হবে। যার নাম প্রস্তাব করা হবে, তিনি স্পিকার হিসাবে দায়িত্ব পালনে সম্মত আছেন, এমন বিবৃতিও নোটিশের সাথে দিতে হবে। এরপর এটি সংসদ সদস্যদের মধ্যে ভোটাভুটিতে যাবে। যদি স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে একাধিক প্রার্থী যদি না থাকে তাহলে কণ্ঠভোটের মাধ্যমেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন। সাধারণত স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর তার সভাপতিত্বে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয়ে থাকে।

নিয়ম অনুযায়ী, এই নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর অধিবেশন মুলতবী ঘোষণা করা হবে। সেই সময়ে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথ পাঠ করাবেন রাষ্ট্রপতি। তারা শপথ নেওয়ার পরই তাদের সভাপতিত্বে শুরু হবে পরবর্তী সংসদের কার্যক্রম।

প্রথম দিন সংসদ মুলতবী করারপর স্পীকার ও ডেপুটি স্পীকারের শপথ গ্রহণ করার পর ওইদিনই আবার অধিবেশনের বৈঠক শুরু হতে পারে।

সংসদীয় রীতি অনুযায়ী, নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনের শুরুতে রাষ্ট্রপতি সংসদে ভাষণ দেন। এই ভাষণে সাধারণত সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, লক্ষ্য এবং দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির একটি রূপরেখা তুলে ধরা হয়। ইতোমধ্যে রাষ্ট্রপতির ভাষণ সংসদে না দেয়ার জন্য বিভিন্ন মহল থেকে দাবি করা হচ্ছে। কেননা এ সংসদটি অতীতের সংসদের মতো গতানুগতিক নয়।

এ ছাড়াও শোক প্রস্তাব ও প্যানেল চেয়ারম্যান মনোনয়ন করা হয়। শোক প্রস্তাবে সংসদের গত মেয়াদের পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত কোনো বর্তমান বা প্রাক্তন সদস্য মারা গিয়ে থাকলে অথবা বিশিষ্ট ব্যক্তি যারা মারা গেছেন তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। আর প্যানেল চেয়ারম্যান হিসেবে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে সংসদ পরিচালনার জন্য কয়েকজনকে প্যানেল চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনীত করা হয়।

প্রথম অধিবেশনের শুরুতেইতেই কার্যউপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হয়। সংসদ অধিবেশন কতদিন চলবে এবং কী কী কাজ হবে তা নির্ধারণ করার জন্য একটি শক্তিশালী 'কার্যউপদেষ্টা কমিটি' গঠন করা হয়।

অধ্যাদেশ উপস্থাপন: নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ হলো সংসদ বিরতিকালে জারি করা অধ্যাদেশগুলো সংসদে উপস্থাপন করা। সংসদ যখন অধিবেশনে থাকে না, তখন জরুরি প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ধারা মোতাবেক যে আইনগুলো জারি করেন, সেগুলোই হলো অধ্যাদেশ। বিগত সরকার ১৩৩টির মতো অধ্যাদেশ ও একটি আদেশ জারি করেছে। এ সবগুলোই অধিবেশনে উঠবে এবং প্রথম অধিবেশন শুরুর ত্রিশ কার্যদিবসের মধ্যে তা পাস হতে হবে। এ বিষয়ে সংবিধানে ‘অধ্যাদেশ প্রণয়ন-ক্ষমতা’ সর্ম্পকে অনুচ্ছেদ ৯৩। (১) ১[সংসদ ভাঙ্গিয়া যাওয়া অবস্থায় অথবা উহার অধিবেশনকাল ব্যতীত] কোন সময়ে রাষ্ট্রপতির নিকট আশু ব্যবস্থাগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি বিদ্যমান রহিয়াছে বলিয়া সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হইলে তিনি উক্ত পরিস্থিতিতে যেরূপ প্রয়োজনীয় বলিয়া মনে করিবেন, সেইরূপ অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও জারি করিতে পারিবেন এবং জারি হইবার সময় হইতে অনুরূপভাবে প্রণীত অধ্যাদেশ সংসদের আইনের ন্যায় ক্ষমতাসম্পন্ন হইবে: (২) এই অনুচ্ছেদের (১) দফার অধীন প্রণীত কোন অধ্যাদেশ জারি হইবার পর অনুষ্ঠিত সংসদের প্রথম বৈঠকে তাহা উপস্থাপিত হইবে এবং ইতঃপূর্বে বাতিল না হইয়া থাকিলে অধ্যাদেশটি অনুরূপভাবে উপস্থাপনের পর ত্রিশ দিন অতিবাহিত হইলে কিংবা অনুরূপ মেয়াদ উত্তীর্ণ হইবার পূর্বে তাহা অননুমোদন করিয়া সংসদে প্রস্তাব গৃহীত হইলে অধ্যাদেশটির কার্যকরতা লোপ পাইবে। সংসদের প্রথম অধিবেশনেই অর্ন্তবর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলো পাস করতে হবে।