ক্রমেই আতঙ্কে রূপ নিচ্ছে ডেঙ্গু। দিন যতই যাচ্ছে প্রাণহানির দুঃসংবাদ আসছে হাসপাতালগুলো থেকে। মৃতের সংখ্যা বাড়ছে ক্রমেই। আর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে নতুন রোগীতে ভরে যাচ্ছে হাসপাতালগুলো। এর ধারাবাহিকতায় গতকাল রোববার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে পাঁচ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২৪ ঘন্টা সময়ের মধ্যে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮৩৯ জন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, একদিনে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার রোগীর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ২৮৭ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৭৯ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১০০ জন, খুলনা বিভাগে ১৫৯ জন, রাজশাহী বিভাগে ৭১ জন, রংপুর বিভাগে ২৩ জন, বরিশাল বিভাগে ১১৭ জন এবং সিলেট বিভাগে ৩ জন রয়েছেন।
আতঙ্কের বিষয় হলো -- বহুল ব্যবহৃত এডিস মশা মারার ওষুধের (মশানাশক) বেশির ভাগেই আর কাজ হচ্ছে না। এসব ওষুধে প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস। ঢাকা ও চট্টগ্রামে তিন শ্রেণির ছয়টি মশানাশক পরীক্ষা করে পাঁচটির বিরুদ্ধেই প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রমাণ পেয়েছেন গবেষকেরা। কোনো কোনো মশানাশকের মাত্রা ১০ গুণ বাড়ানোর পরও ৮৪ শতাংশ পর্যন্ত এডিস মশা বেঁচে ছিল। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে জাপানের ইনস্টিটিউট অব হেলথ সিকিউরিটির গবেষকদের সহযোগিতায় পরিচালিত এক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। গবেষকেরা মশার শরীরে কীটনাশক প্রতিরোধের সঙ্গে যুক্ত দুটি জিনগত পরিবর্তনও শনাক্ত করেছেন।
এদিকে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হলেই তাঁর বাড়ি ও আশপাশে গিয়ে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার নতুন উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। এ জন্য ডেঙ্গু রোগী বেশি ভর্তি হয়, এমন হাসপাতাল থেকে নিয়মিত রোগীদের তথ্য সংগ্রহ করার কথা সিটি করপোরেশনের কর্মীদের। কিন্তু উদ্যোগের শুরুতেই সমন্বয় ও নজরদারির ঘাটতি দেখা গেছে। রাজধানীর দুটি হাসপাতালে গিয়ে নির্ধারিত তথ্য সংগ্রহকারীদের পাওয়া যায়নি। কোনো হাসপাতালে কয়েক দিন ধরে সিটি করপোরেশনের কাউকে দেখেননি কর্মীরা।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) জানিয়েছে,গত দুই সপ্তাহে বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি বাড়ার কথাও জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। তারা বলছেন, আগে একবার ডেঙ্গু হওয়া কোনো ব্যক্তি যদি পরে অন্য সেরোটাইপে আক্রান্ত হন, তাহলে মৃত্যুঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
চলতি বছরের শুরু থেকে গতকাল রোববার পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৮ হাজার ৯২৯ জন। তাদের মধ্যে ২৬ হাজার ৮৯৬ জন ডেঙ্গুরোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। বর্তমানে হাসপাতালে ১ হাজার ৯৫১ জন চিকিৎসাধীন। এছাড়া এই সময়ের মধ্যে মারা গেছেন ৮২ জন। কীটতত্ত্ববিদরা বলছেন, বর্ষা এলেই বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন; কেউ সহজেই সুস্থ হয়ে ওঠেন, আবার কারও ক্ষেত্রে অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। কেউ কেউ মৃত্যুর কোলেও ঢলে পড়েন।
চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গুতে অনেক সময় একটি ভুল ধারণার কারণে কেউ কেউ বিপদে পড়েন। জ্বর কমে গেলে মনে করেন রোগী সুস্থ হয়ে গেছেন। বাস্তবে ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে জ্বর কমে যাওয়ার সময়টিই অনেক সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। জ্বর সাধারণত কয়েকদিন থাকার পর কমতে শুরু করে। এ সময় কিছু রোগীর শরীরের রক্তনালির ভেতর থেকে তরল বেরিয়ে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। ফলে রক্তচাপ কমে শক, শ্বাসকষ্ট, পেটে পানি জমা, রক্তক্ষরণ বা অন্যান্য অঙ্গের জটিলতা দেখা দিতে পারে। তবে জ্বর দীর্ঘস্থায়ী হলে বা ডেঙ্গুর সতর্কতামূলক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। কারণ দ্রুত রোগ শনাক্ত ও সময়মতো চিকিৎসা শুরু করাই গুরুতর জটিলতা ও মৃত্যু এড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
ডেঙ্গু বাড়ছে উত্তরাঞ্চলে :
রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী। গবেষণা বলছে রাজশাহী নগরীতেই দুই মাসের ব্যবধানে এডিস মশার প্রজনন ঘনত্ব বেড়েছে দ্বি-গুণ। একই সময়ে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালেও বেড়েছে ডেঙ্গু রোগীর চাপ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালেও প্রতিদিনই ভর্তি হচ্ছেন নতুন ডেঙ্গু রোগী। ফলে দুই জেলাতেই ডেঙ্গুর ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ কীটতাত্ত্বিক জরিপে রাজশাহী নগরীর পাঁচটি এলাকায় এই সূচক পাওয়া গেছে ৬১ দশমিক ৩৩। গত মে মাসে একই এলাকায় এ সূচক ছিল ৩০ দশমিক ৬৬। অর্থাৎ দুই মাসের ব্যবধানে এডিস মশার প্রজনন ঘনত্ব দ্বিগুণ হয়েছে। গত ৩ থেকে ১০ আগস্ট রাজশাহী নগরীর কাজিহাটা, চণ্ডিপুর, উপরভদ্রা, নামোভদ্রা ও হাজরাপুকুর এলাকায় এ জরিপ চালানো হয়। এ সময় ৭৫টি বাড়ি পরিদর্শন করে ২৪টিতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়। একই সময়ে ৬৮টি পানি ধারণকারী পাত্র পরীক্ষা করে ৪৬টিতেই এডিসের লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
জরিপে বিভিন্ন প্রজননস্থল থেকে ৬৮৫টি মশার লার্ভা সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে ৫০৫টি ছিল এডিস অ্যালবোপিকটাস এবং ৮৬টি এডিস ইজিপ্টি। বাকি ৯৪টি ছিল অন্য প্রজাতির মশার লার্ভা। ফুলদানি, প্লাস্টিক ও সিরামিকের টব, মাটি ও টিনের পাত্র, নারকেলের খোসা, সিমেন্টের টব, ড্রাম, জলমগ্ন মেঝে, রঙের বালতি ও প্লাস্টিকের বালতিতে এসব লার্ভা পাওয়া গেছে।