শুরু হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। অধিবেশনের প্রথম দিন প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধীদলীয় নেতাদের বক্তব্যে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে জাতীয় সংসদ। উভয় পক্ষ থেকেই ইতিবাচক কথাবার্তা দিয়ে শুরু হওয়ায় প্রসংশা কুড়ায় বিশিষ্টজনদের। বিশেষ করে প্রথম দিনেই ফ্যাসিবাদের দোসর রাষ্ট্রপতির ভাষণের বিরোধিতা করে কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১ দলের সংসদ সদস্যরা। তারা রীতিমত হৈ চৈ ফেলে দেন জাতীয় সংসদে। তাদের এই ভূমিকা দেশজুড়ে আলোচনা ফেলে দিয়েছে। সারাদেশে সবখানে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা চলছে। বিশেষ করে ১১ দলীয় জোট যে আগের মতো গৃহপালিত কিংবা আজ্ঞাবহ হবে না তার প্রমাণ প্রথম দিনেই রাখতে পেরেছে।

গতকাল শুক্রবার সকালে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জাতীয় সংসদের নবনিযুক্ত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম বলেছেন, সংসদে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। সংসদ পরিচালনায় আমার ভূমিকা হচ্ছে ক্রিকেট খেলায় আম্পায়ারের মত নিরপেক্ষ। তিনি আরও বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত এ সরকার মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্যসমূহ সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার বাস্তবায়ন ও জনগণের আশা আকাক্সক্ষা পূরণের মাধ্যমে একটি সুখী-সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠন করবে বলে বিশ্বাস করি এবং সংসদ হবে তার কেন্দ্রবিন্দু।

এর আগে বৃহস্পতিবার প্রথম দিনেই অবশ্য নবনির্বাচিত স্পিকার হাফিজ উদ্দীন আহমদ বীর বিক্রম বলেন, "রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র হবে জাতীয় সংসদ। এসময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পিকারকে বলেন, “আজ থেকে আপনারা আর কোনো দলের নয়। আপনারা এই সংসদের স্পিকার। এরপর বক্তব্য রাখেন বিরোধী দলের প্রধান বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমরী শফিকুর রহমান। স্পিকারকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, আপনি ইতোমধ্যে বিএনপি থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। এখন আপনি সকলের। আমরা মনে করি, আপনার কাছে সরকারি দল ও বিরোধী দল আলাদা কিছু হবে না।

প্রথম দিনে জাতীয় সংসদে শোক প্রস্তাব নিয়ে স্পিকারের ঘোষণায় কিছু অসঙ্গতি দেখা দিলে তা ধরিয়ে দেন বিরোধী দলীয় নেতা, চীফ হুইপ এবং ১১ দলের সংসদ সদস্যরা।

বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ফ্লোর নিয়ে বলেন, এবারের সংসদের মাধ্যমে সব ধরনের অন্যায়-অসঙ্গতির অবসান ঘটবে। তিনি বলেন, সংসদীয় আলোচনায় ব্যক্তিগত আক্রমণ বা চরিত্র হননের পরিবর্তে জনগণের কল্যাণমূলক বিষয়গুলো প্রাধান্য পাওয়া উচিত।

তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, সংসদের মাধ্যমে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সব ধরনের অন্যায়-অসঙ্গতির অবসান ঘটবে। এবারের সংসদে অনেক তরুণ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং তারা অতীতে দায়িত্ব পালনকারী অভিজ্ঞ সংসদ সদস্যদের কাছ থেকে শিক্ষা নিতে পারবেন। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সংসদীয় আলোচনায় ব্যক্তিগত আক্রমণ বা চরিত্র হননের পরিবর্তে জনগণের কল্যাণমূলক বিষয়গুলো প্রাধান্য পাওয়া উচিত। অতীতের অনেক সংসদে এ সব কারণে সময় অপচয় হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। সংসদ কখনোই ব্যক্তিকে হেয় করার স্থান হওয়া উচিত নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

শোক প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের নিয়ে আলোচনার সময় সংসদের শোক প্রস্তাবে ওসমান হাদি, আবরার ফাহাদ ও ফেলানি খাতুনের নাম অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। “ফ্যাসিস্টের দোসর” কেউ যেন সংসদে বক্তব্য দিতে না পারে, সেই আহ্বানও জানান তিনি।

দুপুরের বিরতির পর যখন রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদের ভাষণ দেওয়া শুরু করেন তখন চরম বিরোধিতা শুরু করেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। তারা নানাভাবে এর প্রতিবাদ করা শুরু করেন। তারা সভ্য দেশসমূহের আদলে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রপতির ভাষণের বিরোধিতা শুরু করেন। এক পর্যায়ে তারা জাতীয় সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন।

কার্যকর সংসদের সংগায় বলা হচ্ছে এমন কার্যকর জাতীয় সংসদ একটি প্রাণবন্ত, দায়িত্বশীল ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে সরকার ও বিরোধী দল উভয়েই গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটায়, আইনের শাসন সুনিশ্চিত করে এবং স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের মাধ্যমে জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে। এটি কেবল আইন প্রণয়ন নয়, বরং জনগণের আস্থা অর্জনে কাজ করে।

জাতীয় সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিন সরকার এবং বিরোধী দলের নেতাদের বক্তব্যে ফুটে ওঠে জনগণের অধিকার ও আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলননের কথা। তারা বলেন জাতীয় সংসদে সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়া ও অধিকার নিয়ে আলোচনা করা হবে। বিরোধীদলীয় নেতা জানিয়ে দেন কেবল বিরোধিতা নয়, বরং জনস্বার্থে কার্যকর, প্রাণবন্ত ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখা হবে। সরকারের কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই হবে বিরোধী দলের ভূমিকা।