১৩ নভেম্বর রাজধানীতে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা: পুলিশ
ক্রাস্তার পাশে জ্বালানি তেল বিক্রি বন্ধ: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা
আতঙ্কের কিছু নেই: ডিএমপি কমিশনার
১৩ নভেম্বরকে ঘিরে আগুন সন্ত্রাস চালাচ্ছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগসহ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণার সম্ভাব্য তারিখ ১৩ নভেম্বর। এ দিনটিকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ সারাদেশে উত্তেজনা বিরাজ করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে নানা ধরনের গুজব ও অপপ্রচার। যার মধ্যে রয়েছে গণসমাবেশ ঘটিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, লকডাউন ঘোষণার গুজব, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার আশঙ্কা এবং যানবাহনে অগ্নিসংযোগের প্রচারণা। প্রতিদিনই নিষিদ্ধ দলের নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ করছে। যানবাহনে আগুন দিচ্ছে। ককটেল বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে বিভিন্ন স্থানে। একজন উপদেষ্টার বাসার সামনে এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অফিসের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবারও রাজধানীতে চারটি বাসে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা।
এদিকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ঘোষিত আগামী ১৩ নভেম্বর ‘ঢাকা লকডাউন’ কর্মসূচিকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শক্ত অবস্থান নিয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেছেন, দু-একটি মোটরসাইকেল থেকে ককটেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে, তবে এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব মন্তব্য করেছেন, দেশের গণমাধ্যমগুলো ‘আওয়ামী লীগের আগুন সন্ত্রাস’ লিখতে লজ্জা পাচ্ছে। এদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ আওয়ামী লীগ আগুন সন্ত্রাসের উৎপাদন করছে অভিযোগ করে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ থাকার প্রতি জোর দিয়েছেন। ডিএমপি জানিয়েছে, ১৩ নভেম্বরের কর্মসূচি ঘিরে বৃহস্পতিবার রাজধানীতে প্রায় ১৭ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে। পাশাপাশি সেনাবাহিনী, র্যাব, বিজিবি এবং গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করবেন।
গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ঘোষিত আগামী ১৩ নভেম্বর ‘ঢাকা লকডাউন’ কর্মসূচিকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শক্ত অবস্থান নিয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। গতকার মঙ্গলবার সচিবালয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা জানান। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ১৩ নভেম্বর ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শক্ত অবস্থান নিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শক্ত অবস্থানে থাকবে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকবে। কোনো ধরনের কোনো আশঙ্কা এখানে নেই।
সন্ত্রাসীদের কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘ কোনো সন্ত্রাসীকেই কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। আমরা তাদেরও রিকোয়েস্ট করব যারা জামিন দেয়, তারা যেন অন্তত অ্যাকচুয়াল সন্ত্রাসীদের জামিন না দেয়, বলেন তিনি। বডি ওর্ন ক্যামেরার ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে, ক্রয় প্রক্রিয়া হয়তো কাল-পরশুর ভেতরে সম্পন্ন হবে জানান তিনি। আমাদের নির্বাচনের প্রস্তুতি মোটামুটি সন্তোষজনক উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘আমি বলবো, ভালোই সন্তোষজনক। সব বাহিনীগুলো তাদের ট্রেনিং প্রায় শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। হয়তো কিছু দিনের ভেতরে শেষ হয়ে যাবে। তারপর আমরা হয়তো দুএকটা ডেমনস্ট্রেশন দেবো। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান চলছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, এটা আরও বেগবান করা হবে। যেহেতু কিছু কিছু অস্ত্র এখনো বাইরে রয়ে গেছে, এগুলো যেন খুব তাড়াতাড়ি আমরা উদ্ধার করতে পারি এ জন্য সব ধরনের চেষ্টা করা হচ্ছে। মাদক নির্মূলে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে জাহাঙ্গীর বলেন, ‘যদিও আরাকানের ওদিক থেকে ইয়াবা আসা একটু কমেছে, তারপরও আমি বলবো অতটা আশাবাঞ্জক না। গ্রামে-গঞ্জে এই জিনিসটা ছড়িয়ে পড়েছে। এটা কিন্তু আমাদের সবারই একটা দায়িত্ব, এই মাদকটাকে কীভাবে সমাজ থেকে দূর করা যায়।
সম্প্রতি বিভিন্ন যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাস্তার পাশে তেল বিক্রি, কিছু দিনের জন্য বন্ধ থাকবে। যেহেতু এই তেল দিয়ে অনেক সময় বিভিন্ন ধরনের অঘটনটা ঘটিয়ে ফেলে। কেপিআই এলাকায় নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, যেমন ট্রাইব্যুনাল, মেট্রোরেল, রেলওয়ে এলাকা। গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, সন্ত্রাসী যারা (জেল থেকে জামিনে) বের হয়ে যাচ্ছে, তারা অন্য ধরনের কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে তাদের আবার আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য বলা হয়েছে। হত্যাকাণ্ড, বাসে আগুন ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতা আছে কি না জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, এখানে কোনো ব্যর্থতা নাই। বড় ধরনের মিছিল কোথাও হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, এগুলো যেন না করতে পারে, এ জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ সময় রাজনৈতিক দলগুলোকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা। প্রকাশ্যে গুলির দুটি ঘটনার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, এই দুটি ঘটনা সন্ত্রাসী বাহিনীর মধ্যে হয়েছে। জড়িত ব্যক্তিদের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সীমান্ত রক্ষা বাহিনীকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে কোনো সন্ত্রাসী বাইরে থেকে দেশে ঢুকতে না পারে, জানান তিনি।
আতঙ্কের কিছু নেই: ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেছেন, ঢাকাবাসী আমাদের সঙ্গে আছে- তাই কোনো অঘটন ঘটলে তা মোকাবিলার সক্ষমতা আমাদের রয়েছে। তিনি বলেন, ঢাকা মহানগরীতে বর্তমানে অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে। ঢাকাবাসীর আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। ১৩ নভেম্বর নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেসব গুজব ছড়ানো হচ্ছে, তা ভিত্তিহীন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমরা প্রস্তুত আছি। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত ‘ঢাকা মহানগরীর চলমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সংক্রান্ত’ সাংবাদিক সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। ডিএমপি কমিশনার বলেন, ঢাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেক ভালো। এপ্রিল-মে মাসে যে হারে ছিনতাই ও দিনের বেলায় চাপাতি হামলার ঘটনা ঘটত, এখন তা অনেক কমেছে। বিশেষ করে মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন বিক্ষোভ বা আন্দোলনেও পুলিশ সংযম দেখিয়েছে। আমরা কোনো মারণাস্ত্র বা লাঠি ব্যবহার না করেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছি। ডিএমপির নীতিই হচ্ছে-কোনো নাগরিকের গায়ে হাত তোলা যাবে না। মানুষ যদি দাবি নিয়ে আসে, আমরা তাদের বুঝিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনার পথেই সমস্যা সমাধান চাই। এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের সদস্যরা কি সাম্প্রতিক নাশকতার সঙ্গে জড়িত? জবাবে ডিএমপি কমিশনার বলেন, আমরা সম্প্রতি বেশ কয়েকজন নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের পদধারী ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছি। গত সপ্তাহে শেরেবাংলা নগর এলাকায়ও এমন কিছু গ্রেফতার অভিযান পরিচালিত হয়েছে। সিসি ক্যামেরা স্থাপন প্রসঙ্গে ঢাকাবাসীকে আহ্বান জােিনয় কমিশনার। বলেন, গুলশানের মতো বিভিন্ন এলাকায় যেভাবে সমিতি উদ্যোগে ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে, অন্য এলাকাগুলোর বাসিন্দারাও যদি এভাবে উদ্যোগ নেয়, তাহলে নিরাপত্তা আরও জোরদার হবে। হাইকোর্ট এলাকায় নিরাপত্তা প্রসঙ্গে কমিশনার সাজ্জাত আলী বলেন, মানুষ বিচার পাওয়ার জন্য আদালতে যায়। আমরা কখনোই বিচারপ্রার্থীদের বাধা দিতে চাই না। তবে নির্ধারিত দিনে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হবে।