আজ ২৭ ডিসেম্বর বিশিষ্ট সাংবাদিক, গবেষক, বহু ভাষাবিদ ও প্রাজ্ঞ ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা জুলফিকার আহমদ কিসমতীর ১০ম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৫ সালের এই দিনে ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮০ বছর বয়সে তিনি ইন্তিকাল করেন।

অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা, গবেষণা ও ইসলামী চিন্তাচর্চায় নিবেদিত মাওলানা কিসমতী ছিলেন এক নিষ্ঠাবান ও আদর্শ কলমসৈনিক। বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন জাতীয় দৈনিক দৈনিক সংগ্রাম-এর প্রতিষ্ঠালগ্নে তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং পত্রিকাটির নাম প্রস্তাবনায় তার ঐতিহাসিক ভূমিকা আজও স্মরণীয়। দীর্ঘদিন তিনি পত্রিকাটির সিনিয়র সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সাংবাদিকতায় পুরোপুরি যুক্ত হওয়ার আগে তার কর্মজীবনের সূচনা ঘটে শিক্ষকতা দিয়ে। তিনি কুমিল্লার মনতলী ও কাশিনগর ইসলামিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা এবং বগুড়ার ঠনঠনিয়া আলিয়া মাদরাসায় সুপারিনটেনডেন্ট ও হেড মুদাররিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষা ও চরিত্র গঠনের এই অভিজ্ঞতা তার পরবর্তী লেখনী ও চিন্তাধারায় সুস্পষ্ট প্রভাব ফেলেছে।

তিনি বাংলাদেশ বেতারের বহির্বিশ্ব কার্যক্রমে আরবি সংবাদ পাঠ পর্যালোচক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তার লেখনীতে দেশ-জাতির সংকট, শিক্ষা সংস্কার, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক ন্যায়বোধের বিষয়গুলো গভীরভাবে উঠে এসেছে। বিশেষ করে নারী শিক্ষার প্রসারে মহিলা মাদ্রাসা ও ইবতেদায়ি শিক্ষার গুরুত্ব তিনি সময়ের অনেক আগেই জোরালোভাবে তুলে ধরেন।

পরিবেশ সচেতন চিন্তাবিদ হিসেবেও মাওলানা কিসমতী ছিলেন অগ্রগামী। নদীভাঙন রোধে দেশব্যাপী তালগাছ রোপণের প্রস্তাব তিনি বহু আগেই লেখনীর মাধ্যমে উপস্থাপন করেন, যা আজও প্রাসঙ্গিক।

ইসলামী চিন্তাবিদ হিসেবে তার পাণ্ডিত্য ছিল বহুমাত্রিক। তিনি আরবি, উর্দু ও ফার্সি ভাষা থেকে বাংলায় অনুবাদসহ ৩০টিরও বেশি গ্রন্থ ও পুস্তিকা রচনা করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে

‘আজাদী আন্দোলনে আলেম সমাজের সংগ্রামী ভূমিকা’,‘চিন্তাধারা’, ‘মহানবী (সা.)’, ‘সোভিয়েত ইউনিয়নে মুসলমান’, ‘উপমহাদেশে ইসলামি শিক্ষা-সংস্কৃতির ক্রমবিকাশের ইতিহাস’, ‘এই সময় এই জীবন’, ‘শরীয়তী রাষ্ট্র ব্যবস্থা’, ‘আদর্শ কিভাবে প্রচার করতে হবে’, ‘বাংলাদেশের সংগ্রামী ওলামা পীর-মাশায়েখ’, ‘আল-কুরআনের দৃষ্টিতে সমাজসেবা’ এবং ‘উপসাগরীয় সংকট’।

তার জ্ঞানতাত্ত্বিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগে তার জীবন ও কর্মের ওপর এমফিল গবেষণা সম্পন্ন হয়। তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাব ও বাংলা একাডেমির আজীবন সদস্য এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সম্পাদনা পরিষদের সদস্য ছিলেন। ফ্রাঙ্কলিন পাবলিকেশন্স প্রকাশিত প্রথম বাংলা বিশ্বকোষের কন্টেন্ট প্রদানকারীদের মধ্যেও তিনি অন্যতম।

১৯৩৫ সালে কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রামের বাগৈগ্রাম মোক্তারবাড়ির এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারে জন্মগ্রহণকারী এই গুণী ব্যক্তি ছিলেন ব্যক্তিজীবনে বিনয়ী, কর্মজীবনে পরিশ্রমী এবং আদর্শে অবিচল।

মাওলানা জুলফিকার আহমদ কিসমতী ছিলেন এমন এক মনীষী, যার জীবন ও কর্ম আজও সাংবাদিকতা, শিক্ষাঙ্গন ও ইসলামী চিন্তাচর্চায় অনুস্মরণীয় আদর্শ হয়ে আছে।

১০ম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তার পরিবার, শুভাকাক্সক্ষী ও গুণগ্রাহীদের পক্ষ থেকে মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দেশবাসীর নিকট দোয়া চাওয়া হয়েছে।