মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও আকাশপথে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে আগামী ৫ মার্চ পর্যন্ত এই অঞ্চলের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ রুটে সব ফ্লাইট বাতিল ঘোষণা করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। গতকাল মঙ্গলবার বিমানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
বিমানের জনসংযোগ বিভাগ জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, আবুধাবি ও শারজা; সৌদি আরবের দাম্মাম; কাতারের দোহা এবং কুয়েত রুটে সব ধরনের ফ্লাইট চলাচল স্থগিত করা হয়েছে।
বিমানের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোসরা ইসলাম জানান, পরিস্থিতির উন্নতি সাপেক্ষে যাত্রীদের বাতিল হওয়া ফ্লাইটের পরবর্তী শিডিউল বা সময়সূচি জানিয়ে দেওয়া হবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান তাদের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। আকাশপথ বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট সূচি তছনছ হয়ে গেছে।
বিমানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আকাশপথের উত্তেজনা নিরসন ও পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই অনিশ্চয়তা কাটছে না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যাত্রীদের নিয়মিত বিমানের কল সেন্টার বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এ পর্যন্ত ১৪৭ ফ্লাইট বাতিল ভোগান্তিতে যাত্রীরা
ঢাকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যে একের পর এক ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার বেলা একটা পর্যন্ত ৩৮টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে বলে জানিয়েছে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। এ নিয়ে গত শনিবার থেকে এ পর্যন্ত মোট ১৪৭টি ফ্লাইট বাতিল হলো।
ফ্লাইট বাতিলের কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন মধ্যপ্রাচ্যগামী যাত্রীরা। বিমানবন্দর সূত্র জানায়, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহর ফ্লাইট পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। তবে চালু আছে সৌদি আরবের রিয়াদ, জেদ্দা ও দাম্মামের ফ্লাইট।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ হামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধসহ উদ্ভূত নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে ফ্লাইট বাতিল করা হচ্ছে।
গতকাল দুপুরে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে স্থানীয় একাধিক সুত্র জানায়, মধ্যপ্রাচ্যগামী অনেক যাত্রীকে বাড়িতে ফেরত যেতে দেখা যায়। আবার অনেকে বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছিলেন। তাঁরা বলছিলেন, বাতিল হওয়া ফ্লাইট আবার কবে কখন চালু হবে, সে ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু জানেন না। তাই অপেক্ষা করছেন।
এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইটে ভারতের মুম্বাই, ওমানের মাসকাট হয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে যাওয়ার কথা ছিল মৌলভীবাজারের দীপু চন্দ্র শীলের। বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটের ফ্লাইট ধরতে তিনি খুব সকালে বিমানবন্দরে হাজির হন। বিমানবন্দরে বোর্ডিং পাসের সময় তাঁকে আটকে দেওয়া হয়। বলা হয়, যাওয়া যাবে না।
দীপু চন্দ্র শীল এ সময় সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, মৌলভীবাজার ট্রাভেলস থেকে টিকিট নিয়েছি। সোমবার রাতেও তারা বলেছে, যাওয়া যাবে। কিন্তু এখানে আসার পর আমাকে বলা হয়েছে, যাওয়া যাবে না। আমার ফ্লাইট নাকি ইন্ডিয়ার পর আর মাসকাট যাবে না। ফ্লাইট বাতিল বলতেছে। এ জন্য বাড়ি চলে যাচ্ছি।
বিমানবন্দরের টার্মিনাল-১-এ প্রবেশের দ্বিতীয় ফটকের বাইরে বসে অপেক্ষা করছিলেন নরসিংদীর রফিকুল ইসলাম। কাতার এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে করে কাতার হয়ে তাঁর সৌদি আরবের রিয়াদ যাওয়ার কথা। সে জন্য তিনি সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে বিমানবন্দরে হাজির হন। কিন্তু এসে জানতে পারেন, তাঁর ফ্লাইট বাতিল। তিনি যেতে পারবেন না।
রফিকুল ইসলাম বলেন, সৌদি আরবের রিয়াদে এমডিসিসি নামের কোম্পানিতে আসবাব তৈরির কাজ করেন তিনি। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি তিনি দেশে এসেছিলেন। ১৭ মার্চ পর্যন্ত তাঁর ভিসার মেয়াদ আছে। আসার সময় আপ-ডাউন টিকিট কেটে দিয়েছিল তাঁর কোম্পানি। ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় এখন কোম্পানির পক্ষ থেকে রিয়াদগামী বিকল্প উড়োজাহাজে তাঁর টিকিটের ব্যবস্থার চেষ্টা করা হচ্ছে। সে জন্য তিনি বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছেন।
এদিকে, চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৩৫টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ একা বার্তায় এ তথ্য জানিয়েছে। চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চার দিনে বাতিল হওয়া মোট ৩৫টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট‘র মধ্যে শুধুমাত্র গতকাল সকালের সাতটি ফ্লাইটও রয়েছে। এর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের দুটি, এয়ার অ্যারাবিয়ার চারটি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। তবে মাস্কাট থেকে আসা সালাম এয়ারের ফ্লাইট গতকাল সকালে চট্টগ্রামে নেমে আবার যাত্রী নিয়ে মাস্কাটের উদ্দেশ্যে ছেড়ে গেছে। একইভাবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এর মদিনা থেকে আসা একটি ফ্লাইট সকালে শাহ আমানতে নেমে পরে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে গেছে।