বিশেষ ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো হয়নি
এবারের ঈদযাত্রায় ভয়াবহ পরিবহন সংকটে পড়তে যাচ্ছেন গাজীপুরের তৈরি পোশাক ও অন্যান্য খাতের শ্রমিকরা। গাজীপুর থেকে দেশের উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় প্রতি বছর ঈদে তারা গ্রামের বাড়িতে যাতায়াত করেন। তাদের ভোগান্তি এড়াতে ৫০০ বিআরটিসি এবং ৫০০ বেসরকারি কোম্পানির বাস বরাদ্দের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। ১৭ মার্চ থেকে সরকারি ছুটি শুরু হওয়ায় গ্রামের বাড়ির দিকে মানুষে স্রোত নামবে ।
গতকাল রোববার এক বার্তায় সংগঠনটি জানায়, ঢাকা থেকে গাজীপুর হয়ে উত্তরাঞ্চলগামী সবকটি বাসের টিকিট ঢাকায় বিক্রি শেষ হয়ে যাওয়ায় গাজীপুরের চন্দ্রায় অবস্থিত কাউন্টারগুলোতে বিক্রির জন্য কোনো টিকিট বরাদ্দ নেই। বিষয়টি নজরে আসায় সম্প্রতি পুলিশ চন্দ্রার উত্তরাঞ্চলগামী সব বাস কাউন্টার তুলে দিয়েছে।
এছাড়া বিপুল সংখ্যক শ্রমিক অধ্যুষিত গাজীপুর থেকে দেশের উত্তরাঞ্চলে যাতায়াতের জন্য কোনো বাস সার্ভিস এখনো গড়ে ওঠেনি। ফলে আশুলিয়া ইপিজেড, চন্দ্রা, বাইপাইলসহ গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত শিল্পকারখানার প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ লাখ শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের বাড়ি যাওয়ার জন্য কার্যত কোনো যানবাহনের ব্যবস্থা নেই।
এমন পরিস্থিতিতে শ্রমিকেরা এলাকাভিত্তিক সংগঠিত হয়ে ২০ থেকে ৩০ জন মিলে ট্রাক-পিকআপ কিংবা ঢাকা মহানগরীতে চলাচলকারী লক্কড়-ঝক্কড় সিটি সার্ভিসের বাস ও মিনিবাস রিজার্ভ হিসেবে ভাড়া নিচ্ছেন। সরকার প্রতি বছর ঈদে লক্কড়-ঝক্কড় বাস ও খোলা ট্রাক-পিকআপে যাত্রী বহন নিষিদ্ধ করলেও তৈরি পোশাক ও অপ্রতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকসহ নিম্নআয়ের মানুষের কম ভাড়ায় যাতায়াতের পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। এ কারণেই গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার নিম্নআয়ের মানুষ এমন ভয়াবহ ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
সংগঠনের পর্যবেক্ষণ মতে, গণপরিবহন সংকট ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়সহ নানা ভোগান্তি এড়াতে এবারের ঈদে ঢাকা থেকে ৮ লাখ, গাজীপুর থেকে ৩ লাখ এবং নারায়ণগঞ্জ থেকে ২ লাখসহ সারাদেশে ২২ লাখের বেশি পরিবার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মোটরসাইকেলে চড়ে গ্রামের বাড়িতে যাবে। ফলে এবারের ঈদেও সড়ক দুর্ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে গাজীপুরের শ্রমিকদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে অন্তত ৫০০ বিআরটিসি ও ৫০০ বেসরকারি কোম্পানির বাস বরাদ্দের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
এদিকে ঈদ ঘিরে ঘরমুখো মানুষের চাপ সামাল দিতে প্রতিবছরই ‘বিশেষ ট্রেন’ পরিচালনা করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঈদযাত্রায় বিশেষ ট্রেনের সংখ্যা কখনো একরকম থাকে না। প্রতিবারই সেটা ওঠানামা করে, অর্থাৎ কম-বেশি হয়। আসন্ন ঈদুল ফিতরের ঈদযাত্রায় বিশেষ ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো হয়নি। গত বছরের মতোই রাখা হয়েছে পাঁচ জোড়া বিশেষ ট্রেন।
বিশেষ ট্রেনের সংখ্যা কম থাকায় ঈদযাত্রায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ পোহাতে হতে পারে বলে মনে করছেন সাধারণ যাত্রীরা। তারা বলছেন, ঈদকে কেন্দ্র করে ট্রেনে এমনিতেই যাত্রীচাপ বাড়ে। শেষ মুহূর্তে এত বেশি ভিড় হয় যে, টিকিট সংগ্রহ করা যাত্রীরাও অনেক সময় নিজ আসন পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন না । শেষ মুহূর্তের ঈদযাত্রায় ছাদেও ভ্রমণ করতে দেখা যায়। তবে গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার স্পেশাল ট্রেনের সংখ্যা কমানোর কারণে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়তে পারে।
রেল কর্মকর্তারা বলছেন, গত কয়েক বছরে ঈদের ছুটিতে ভিন্নতা আসায় স্পেশাল ট্রেনের যাত্রীসংখ্যা কমেছে । এছাড়া লোকোমোটিভ বা ইঞ্জিন সংকটের কারণে অনেক ট্রেন চালানো যাচ্ছে না। সব দিক বিবেচনা করে এবারও বিশেষ ট্রেনের সংখ্যা কমেছে । তবে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেলে সময় উপযোগী পরিকল্পনার অভাবে কাঙ্খিত যাত্রীসেবা মিলছে না। একদিকে যাত্রীসংখ্যা যেমন বাড়ছে বিপরীতে কমানো হচ্ছে ট্রেন সংখ্যা।
বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২২ সালে ঈদুল ফিতরে ৬ জোড়া বিশেষ ট্রেন চালানো হয়েছিল। এসব ট্রেন তখন চট্টগ্রাম-চাঁদপুর-চট্টগ্রাম, ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ-ঢাকা, খুলনা-ঢাকা-খুলনা, ভৈরববাজার-কিশোরগঞ্জ-ভৈরববাজার ও ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ রুটে চলাচল করে।
২০২৩ সালের ঈদুল ফিতরে বিশেষ ট্রেনের সংখ্যা ছিল ৯ জোড়া। সেবার চট্টগ্রাম-চাঁদপুর-চট্টগ্রাম, ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ-ঢাকা, ময়মনসিংহ-চট্টগ্রাম-ময়মনসিংহ,চাঁদপুর-সিলেট-চাঁদপুর, ভৈরববাজার-কিশোরগঞ্জ-ভৈরববাজার, ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ, জয়দেবপুর-পঞ্চগড়-জয়দেবপুর ও ঢাকা-চিলাহাটি-ঢাকা রুটে এসব ট্রেন পরিচালনা করা হয়।
২০২৪ সালে ৮ জোড়া বিশেষ ট্রেন চালানো হয়। সেগুলো চাঁদপুর-চট্টগ্রাম-চাঁদপুর, ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ-ঢাকা, চট্টগ্রাম-ময়মনসিংহ-চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-চট্টগ্রাম,ভৈরববাজার-কিশোরগঞ্জ-ভৈরববাজার, ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ ও জয়দেবপুর-পার্বতীপুর-জয়দেবপুর রুটে চলাচল করে।
সবশেষ ২০২৫ সালে সংখ্যা কমিয়ে ৫ জোড়া বিশেষ ট্রেন চালানো হয়। এসব ট্রেন চট্টগ্রাম-চাঁদপুর-চট্টগ্রাম, ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ-ঢাকা,ভৈরববাজার-কিশোরগঞ্জ-ভৈরববাজার,ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ এবং জয়দেবপুর-পার্বতীপুর-জয়দেবপুর রুটে চলাচল করে।২০২৬ সালের ঈদযাত্রায়ও ৫ জোড়া স্পেশাল ট্রেন চলাচল করবে।
চট্টগ্রাম-চাঁদপুর-চট্টগ্রাম রুটে চাঁদপুর ঈদ স্পেশাল-১ এবং ২; ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ-ঢাকা রুটে তিস্তা স্পেশাল-৩ এবং ৪; ভৈরববাজার-কিশোরগঞ্জ-ভৈরববাজার রুটে শোলাকিয়া ঈদ স্পেশাল-৫ এবং ৬; ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ রুটে শোলাকিয়া ঈদ স্পেশাল-৭ এবং ৮; জয়দেবপুর-পার্বতীপুর-জয়দেবপুর রুটে পার্বতীপুর ঈদ স্পেশাল-৯ এবং ১০ ট্রেন পরিচালনা করা হবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম বলেন, গত ঈদে ৫ জোড়া স্পেশাল ট্রেন ছিল, এবার একই সংখ্যক ট্রেন রাখা হয়েছে। কয়েক বছর আগেও ঈদে চাহিদা বেশি ছিল, তখন স্পেশাল ট্রেনের সংখ্যাও বেশি রাখা হতো। কিন্তু গত বছর থেকে ঈদের ছুটি বেড়েছে, যাত্রীরা ভ্রমণের জন্য পর্যাপ্ত সময় পাচ্ছেন। এর ফলে বাড়তি ট্রেনের চাহিদা কিছুটা কম। এছাড়া আমাদের লোকোমোটিভ (ট্রেনের ইঞ্জিন) সংখ্যা কম, এজন্য স্পেশাল ট্রেনের সংখ্যা কমানো হয়েছে।
রেল কর্মকর্তারা বলছেন, ‘রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন স্টেশনে অবৈধ যাত্রী অনুপ্রবেশ ঠেকাতে পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু যখন পোশাক কারখানা ও অন্য কর্মস্থলগুলোতে একযোগে ঈদের ছুটি শুরু হয় তখন ঘরমুখো যাত্রীদের চাপ সামাল দেওয়া খুবই কঠিন। তখন কিন্তু এসব পদক্ষেপ আর কাজ করবে না। লোকজন পারলে ট্রেনের ছাদে উঠে যাবে।