• আরো একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ধ্বংসের দাবি
  • ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে মাশুল গুণছে ইসরাইল
  • নিশানা এবার কুর্দি

মুহাম্মদ নূরুল হুদা : ইরানের সঙ্গে ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ১৫টি দেশে ব্যাকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। একদিকে বাড়ছে লাশের সারি অন্যদিকে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ দূতাবাস, থমকে গেছে অর্থনৈতিক চাকা। সমুদ্র সীমায় যুদ্ধজাহাজ ডুবি থেকে শুরু করে আকাশ পথ বন্ধ হওয়া সব মিলিয়ে এক চরম অনিশ্চয়তায় বিশ্ব। চলমান সংঘাতে এ পর্যন্ত ৫৫০’র বেশি মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে। যুদ্ধের মাশুল গুণছে ইসরাইল। এদিকে ইরানের নিশানায় এবার কুর্দিরা এমনই বলা হয়েছে। এছাড়া ইরান আরো একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ধ্বংস করার দাবি করেছে। আবার এক খবরে যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের পক্ষে স্লোগান দেয়ায় মার্কিন সিনেটের প্রার্থীর হাত ভাঙ্গার কথা বলা হয়েছে। আনাদুলো এজেন্সি, বিবিসি, তুরকি টুডে, এপি, মিডল ইস্ট আই, আল-জাজিরা।

যুদ্ধ ছড়িয়েছে ১৫ দেশে, অস্থির পুরো বিশ্ব

ইরানের সঙ্গে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। এ যুদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলের ১৫টি দেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে যাচ্ছে। এতে ভয়াবহ ও দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কাও ক্রমেই বাড়ছে। আজ বুধবার এই যুদ্ধ পঞ্চম দিনে গড়িয়েছে। রাশিয়া ও চীন ইরানে হামলার নিন্দা জানিয়েছে। কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান ও ইরাককে সহায়তা দিতে ভূমধ্যসাগরে রণতরী মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্স। মঙ্গলবার এ তথ্য জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ।

ইরানে মার্কিন-ইসরাইলী হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্তকমিটি। ‘ইউএন ইনডিপেনডেন্ট ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন অন ইরান’ এক বিবৃতিতে বলেছে, “এই হামলাগুলো জাতিসংঘের সনদের পরিপন্থী, যে সনদ যেকোনো রাষ্ট্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ নিষিদ্ধ করে।” মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় কাউন্সিলের সভাপতি আন্তোনিও কস্তা স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের এর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন এবং স্পেনের প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে কস্তা জানান, “স্পেনের সাথে ইইউর পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করার জন্য আমি সানচেজের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছি।”

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে গত শনিবার ইরানে হামলা চালিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার পর থেকেই পাল্টাপাল্টি আক্রমণ অব্যাহত আছে। উপসাগরীয় দেশগুলোয় থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও ইসরাইলে টানা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে চলেছে ইরান। অন্তত ১৭টি মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনায় হামলা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসে ড্রোন হামলা হয়েছে। এরপরই সৌদিতে যুক্তরাষ্ট্রের মিশনগুলোতে সব কনস্যুলার সেবা বাতিল করা হয়েছে।

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে ইসরাইলের অর্থনীতির ক্ষতি প্রতি সপ্তাহে ২৯৯ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। বুধবার ইসরাইলের অর্থ মন্ত্রণালয় এ তথ্য দিয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইসরাইলের হোম ফ্রন্ট কমান্ড ঘোষিত ‘লাল’ বিধিনিষেধের আওতায় কর্মক্ষেত্রে যাতায়াত সীমিত করা হয়েছে এবং স্কুল বন্ধ রাখার পাশাপাশি এবং রিজার্ভ বাহিনীকে একত্রিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রতি সপ্তাহে ৯.৪ বিলিয়ন শেকেল হতে পারে, যা মূলত আগামী সপ্তাহ থেকে শুরু হবে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত গতবুধবার চতুর্থ দিনে গড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস হয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা সদরদপ্তর সতর্ক করে জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে এই হামলা যদি আরও ১০ দিন অব্যাহত থাকে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ বিপজ্জনক পর্যায়ে নেমে আসতে পারে। ইসরাইলের চ্যানেল-১২-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের একাংশ ইসরাইলের মধ্যাঞ্চলীয় শহর পেতাহ তিকভায় আঘাত হেনেছে। ওমানের সালালাহ বন্দর লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে জর্ডান এবং অধিকৃত পশ্চিমতীরের জেরুজালেম-সংলগ্ন এলাকায় ইরানের চারটি ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে জর্ডান।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানায়, ইরানে হামলার জবাবে তারা ১৫টি দেশের ভূখণ্ড অথবা স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। বাহরাইনের শেখ ইসা এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। তারা ওই বিমানঘাঁটিটিতে বড় আকারে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এতে বিমানঘাঁটির প্রধান নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র ও সদর দপ্তর ভবন ধ্বংস হয়েছে। হামলার সময় জ্বালানি ট্যাংকগুলোয় আগুন ধরে যায় বলেও উল্লেখ করেছে তারা। এ বিষয়ে বাহরাইনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। চলমান সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যের ১৪টি দেশ থেকে নিজ নাগরিকদের সরে যেতে বলেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। অন্যদিকে, তেহরানে ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ও ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল ভবনে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল।

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষ হতে কিছুটা সময় লাগলেও তা বছরের পর বছর চলবে না। ফক্স নিউজের ‘হ্যানিটি’ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘আমি বলেছিলাম এটি দ্রুত ও চূড়ান্ত হতে পারে। এতে কিছুটা সময় লাগতে পারে; কিন্তু এটি কোনো অন্তহীন যুদ্ধ নয়। নেতানিয়াহু এই যুদ্ধকে মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে ইসরাইল ও সৌদি আরবের মধ্যে, দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার একটি মোক্ষম সুযোগ হিসেবে দেখছেন। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির স্থায়ী পথ তৈরি হচ্ছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি তাই মনে করি।’ তবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের বিরুদ্ধে চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। আইআরজিসি বলেছে, ওই দুই দেশের জন্য আরও অধিক জাহান্নামের দরজা উন্মুক্ত হবে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে আইআরজিসির মুখপাত্র আলি মোহাম্মদ নাইনি বলেছেন, শত্রুদের জন্য সামনে আরও ভয়াবহ এবং ক্রমাগত শাস্তিমূলক হামলা অপেক্ষা করছে। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ইরানে হামলায় ক্ষয়ক্ষতির একটি তালিকা দিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ইরানের অন্তত ১৫৩টি শহরে হামলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল আঘাত এনেছে ৫০৪ স্থানে। হামলার সংখ্যা ১ হাজার ৩০৯টি। হামলায় ইরানে নিহত হয়েছে ৭৮৭ জন। এর মধ্যে ইরানের কেরমান প্রদেশের একটি সামরিক ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ হামলায় ১৩ জন ইরানি সেনা নিহত হয়েছেন।

যুদ্ধ তীব্র হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের ১৪টি দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের অবিলম্বে সরে যেতে বলেছে দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর। গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এই নির্দেশনা দেয়। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য নিরাপত্তা-সংক্রান্ত হালনাগাদ নির্দেশনায় পররাষ্ট্র দপ্তর বিভিন্ন দেশ ও এলাকার তালিকা দিয়ে বলেছে, এসব জায়গায় গুরুতর নিরাপত্তাঝুঁকি আছে।

তালিকায় উল্লিখিত দেশ ও এলাকাগুলো হলো বাহরাইন, মিসর, ইরান, ইরাক, ইসরাইল, পশ্চিম তীর ও গাজা (ফিলিস্তিন), জর্ডান, কুয়েত, লেবানন, ওমান, কাতার, সৌদি আরব, সিরিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইয়েমেন। গুরুতর নিরাপত্তাঝুঁকি থাকায় সহজে পাওয়া যায় এমন বাণিজ্যিক পরিবহন ব্যবহার করে মার্কিন নাগরিকদের এখনই এসব দেশ ত্যাগ করার জন্য বলা হচ্ছে। ইসরাইল থেকে বের হতে মিসরের সিনাই উপদ্বীপের পথ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন দেশটিতে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি। মঙ্গলবার ভোরে রিয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে দুটি ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়, এর ফলে ভবনটিতে সামান্য আগুন ধরে যায় এবং আংশিক ক্ষয়ক্ষতি হয়। সংঘাতের কারণে পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। রিয়াদে দূতাবাসে ড্রোন হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র শিগগিরই বড় ধরনের পাল্টা পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সংবাদমাধ্যম নিউজনেশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘এই হামলার জবাবে ওয়াশিংটন কী করতে যাচ্ছে, ত আপনারা খুব দ্রুতই দেখতে পাবেন।’ ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মাঝারি ও মাঝারির থেকে কিছুটা উন্নত মানের যেসব সামরিক রসদ মজুদ আছে, শুধু তা দিয়েই চিরকাল যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘আমাদের কাছে এই অস্ত্রের প্রায় অসীম মজুদ আছে। যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্রে সমৃদ্ধ এবং বড় বিজয় নিশ্চিত করতে প্রস্তুত আছে।’

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র ধ্বংস করে দেওয়ার দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড। একই সঙ্গে ইরানের প্রতিরক্ষা ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করার দাবি করেছে তারা। এক্স পোস্টে সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ধারাবাহিক অভিযানে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং সামরিক বিমানঘাঁটি ধ্বংস হয়েছে। ইরানে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া চলছে : নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের এ প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হবে না বলে জানিয়েছেন দেশটির বিশেষজ্ঞ পরিষদের সদস্য আলি মোয়ালেমি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর ইরানের এই বিশেষজ্ঞ পরিষদই নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করবে। আলি মোয়ালেমি বলেন, বিশেষজ্ঞ পরিষদের সদস্যরা শপথ নিয়েছেন যে, নতুন নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক ও দলীয় গোষ্ঠীর প্রতি ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়টি প্রভাব ফেলবে না। তিনি আরও বলেন, বিশেষজ্ঞ পরিষদ অতীতের মতো করেই শহীদ বিপ্লবী নেতার (আয়াতুল্লাহ খামেনি) মতো একজন ব্যক্তিত্বকে নির্বাচন করবে। গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। তার উত্তরসূরি বেছে নেওয়ার কাজটি করবে বিশেষজ্ঞ পরিষদ।

কুয়েতে আকাশে ভূপাতি হয় মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমান। ছবি অনলাইন

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে যুদ্ধ : কোন দেশে কত মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতি

ইরানকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া যুদ্ধ এখন আর নির্দিষ্ট কোনও সীমানায় আটকে নেই। এই যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত আছড়ে পড়ছে। ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত, ড্রোন হামলা আর গোলার ধ্বংসাবশেষে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে এই অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি দেশ। একদিকে যেমন বাড়ছে লাশের সারি, অন্যদিকে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ দূতাবাস, থমকে গেছে অর্থনৈতিক চাকা। সমুদ্রসীমায় যুদ্ধজাহাজ ডুবি থেকে শুরু করে আকাশপথ বন্ধ হওয়া, সব মিলিয়ে এক চরম অনিশ্চয়তায় বিশ্ব।

যুদ্ধের ভয়াবহতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকদের মধ্যপ্রাচ্য ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, জার্মানি ও ভারত তাদের নাগরিকদের সরিয়ে নিতে বিশেষ ফ্লাইটের ব্যবস্থা করেছে। ছয়টি দেশে অবস্থিত দূতাবাস থেকে জরুরি নয় এমন কর্মীদের সরিয়ে নিয়েছে ওয়াশিংটন। আকাশপথ ও সমুদ্রপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থবির হয়ে পড়েছে বিশ্ব বাণিজ্য।

দেশওয়ারি যুদ্ধের প্রভাব : ইরান মৃত্যুপুরীতে পরিণত হওয়া দেশ

ইরানের ফাউন্ডেশন অব মার্টিয়ার্স অ্যান্ড ভেটেরান অ্যাফেয়ার্স-এর তথ্যমতে, দেশটিতে এখন পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৪৫ জন নিহত হয়েছেন। তবে বৃহস্পতিবার ইরানের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ২০০ ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে মিনাব এলাকার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলায় ১৬০ জনের বেশি প্রাণ হারিয়েছে, যাদের অধিকাংশই শিশু। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলী হামলায় ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং তেহরানের সরকারি ভবনগুলো ধ্বংস হয়েছে। এই যুদ্ধে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা নিহত হয়েছেন। দেশটির আকাশপথ বর্তমানে পুরোপুরি বন্ধ।

ইসরাইল ও ফিলিস্তিনী ভূখণ্ড

ইসরাইলী কর্তৃপক্ষের মতে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দেশটিতে ১১ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে তিন ভাইবোন (বয়স ১৬, ১৫ ও ১৩) এবং একজন ফিলিপিনো নার্স রয়েছেন। বেইত শেমেস এলাকায় এক হামলায় ৯ জন নিহত হন। জেরুজালেমের পবিত্র ওল্ড সিটির কাছে একটি ইরানি ওয়ারহেড এসে পড়েছে। সামরিক ঘাঁটির ক্ষয়ক্ষতির তথ্য ইসরাইল গোপন রাখলেও তেল আবিবের অ্যাপার্টমেন্ট ভবন ও জেরুজালেমের রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

লেবানন : সীমান্তে যুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হিজবুল্লাহ ও ইসরাইলের লড়াইয়ে ৭২ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ৭টি শিশু রয়েছে। বালবেক এলাকায় আবাসিক কমপ্লেক্সে হামলায় একই পরিবারের ছয়জন নিহত হন। যুদ্ধের কারণে লেবাননে অন্তত ৮৪ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলী স্থলবাহিনী প্রবেশ করায় উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। বৈরুতে মার্কিন দূতাবাস জনসাধারণের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত

নিরাপদ শহর হিসেবে পরিচিত দুবাই এখন যুদ্ধের কবলে। দুবাইয়ে মার্কিন কনস্যুলেটের পার্কিং লটে ইরানি ড্রোন আঘাত হেনেছে। আমিরাত জানিয়েছে, তারা ৮০০-র বেশি ড্রোন শনাক্ত করেছে যার মধ্যে ৫৭টি ভূখণ্ডে আঘাত হেনেছে। হামলায় একজন বাংলাদেশি, একজন পাকিস্তানি ও একজন নেপালি কর্মী নিহত হয়েছেন।

কুয়েতে মার্কিন অপারেশন সেন্টারে ইরানি হামলায় ৬ মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ১১ বছর বয়সী এক কুয়েতি শিশু ও একজন অভিবাসী কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। কুয়েত সিটির দক্ষিণে অবস্থিত পোর্ট শুয়াইবার মার্কিন দূতাবাস ভবনটি ড্রোন হামলায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।

ভারত মহাসাগরে যুদ্ধজাহাজ ডুবি

শ্রীলঙ্কা উপকূলের কাছে আন্তর্জাতিক জলসীমায় একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ আইআরআইএস ডেনা ডুবিয়ে দিয়েছে মার্কিন সাবমেরিন। ১৮০ জন আরোহী নিয়ে থাকা জাহাজটি থেকে শ্রীলঙ্কান নৌবাহিনী ৩২ জনকে জীবিত উদ্ধার করতে পারলেও ৮৭ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। বাকিরা এখনও নিখোঁজ।

অন্যান্য দেশের অবস্থা

# ইরাক ও সিরিয়া: মার্কিন ও ইসরাইলী হামলায় ইরাকের বিভিন্ন প্রক্সি গোষ্ঠীর সদস্যরা নিহত হয়েছেন। সিরিয়ার দামেস্কের উপকণ্ঠে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে বেশ কয়েকজন শিশু আহত হয়েছে।

# সৌদি আরব: রাজধানী রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসে ড্রোন হামলা হয়েছে। এ ছাড়া বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল শোধনাগার রাস তানুয়ারা লক্ষ্য করে ড্রোন ছুড়েছে ইরান, যা আকাশেই ধ্বংস করা হয়।

# জর্ডান ও তুরস্ক: জর্ডানের আকাশসীমায় ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসের পর সেটির টুকরো পড়ে ৫ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, তুরস্কের দিকে ধেয়ে আসা একটি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূমধ্যসাগরে মোতায়েন ন্যাটো বাহিনী গুলি করে নামিয়েছে।

# মিসর ও ওমান: সুয়েজ খাল দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মিসরের অর্থনীতি বড় ধাক্কা খেয়েছে। ওমানের মাস্কাট উপকূলে ড্রোন হামলায় একজন ভারতীয় নাবিক নিহত হয়েছেন।

# আজারবাইজান: নাখচিভানে ড্রোন হামলার জন্য ইরানকে অভিযুক্ত করেছে আজারবাইজান। বৃহস্পতিবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে এই অভিযোগ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, নাখচিভানের একটি বিমানবন্দরের কাছে একটি ড্রোন বিধ্বস্ত হয়েছে এবং অন্যটি একটি স্কুলের কাছে পড়েছে। এই ঘটনায় দুই বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন।

# সাইপ্রাস: যুদ্ধের মধ্যে ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপটিতে থাকা একটি ব্রিটিশ ঘাঁটি হামলার শিকার হয়েছে।

যুদ্ধ এখন পুরো মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আকাশপথ বন্ধ এবং তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।

আরেকটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ধ্বংসের দাবি ইরানের

দখলদার ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে হামলা করার পর আরেকটি বড় খবর দিয়েছে তেহরান। দেশটির রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে যে, তারা আরো একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ধ্বংস করেছে। তবে এ দাবি নাকোচ করেছে ওয়াশিংটন।

ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এক প্রতিবেদনে জানায়, দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তের কাছে একটি মার্কিন এফ-১৫ ইগল স্ট্রাইক ফাইটার ভূপাতিত করার দাবি করেছে আইআরজিসি।

তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী এ ধরনের প্রতিবেদন ভিত্তিহীন বলে দাবি করছে।

আইআরজিসির বরাত দিয়ে তাসনিম জানায়, দুই আসন বিশিষ্ট যুদ্ধবিমানটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল এবং এটি বিধ্বস্ত হয়েছে। যদিও ঘটনাটি ঠিক কখন ঘটেছে তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড তথা সেন্টকম সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্সে এক পোস্টে জানায়, বুধবার (৪ মার্চ) ভোরে ইরানে একটি মার্কিন এফ-১৫ ইগল স্ট্রাইক যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার যে ‘গুজব’ সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়েছে তা ভিত্তিহীন এবং সত্য নয়।

এর আগে কুয়েতের আকাশে মার্কিন এফ-১৫ ইগল স্ট্রাইক যুদ্ধবিমান ধ্বংসের দাবি করেছিল আইআরজিসি। পরে জানা যায়, অন্তত তিনটি জেট ভূপাতিত হয়। যদিও এগুলো ভুল ক্রমে নিজেদের হামলায় ধ্বংস হয়েছে বলে পরে দাবি করে যুক্তরাষ্ট্র।

ইরানের পক্ষে স্লোগান দেওয়ায় হাত ভাঙল মার্কিন সিনেটর প্রার্থীর

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল হিলে সিনেটের একটি শুনানি চলাকালে ইরানের পক্ষে স্লোগান দেন নর্থ ক্যারোলাইনার সিনেট নির্বাচনে গ্রিন পার্টির প্রার্থী এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক মেরিন সদস্য ব্রায়ান ম্যাকগিনিস। এ সময় তাকে জোরপূর্বক কক্ষ থেকে বের করতে গেলে পুলিশের ধস্তাধস্তিতে ওই সিনেট প্রার্থীর হাত ভেঙে যায়।

বুধবার সিনেট আর্মড সার্ভিসেস সাব-কমিটির শুনানির সময় সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা সাক্ষ্য দিচ্ছিলেন। এ সময় ম্যাকগিনিস হঠাৎ দাঁড়িয়ে বলেন, ইসরাইল এই যুদ্ধের জন্য দায়ী।

স্লোগানের পর ম্যাকগিনিসকে কক্ষ থেকে বের করার জন্য তিনজন পুলিশ কর্মকর্তা এবং মন্টানার রিপাবলিকান সিনেটর টিম শিহি ধস্তাধস্তিতে জড়ান। ম্যাকগিনিস দরজা আঁকড়ে ধরে চিৎকার করে বলেন, ইসরাইলের হয়ে কেউ লড়াই করতে চায় না।

ভিডিওতে দেখা যায়, ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে ম্যাকগিনিসের ডান হাত ভেঙে যায়। সহকর্মীরা আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার করতে থাকেন। পরে ম্যাকগিনিস স্বীকার করেন, তিনি তার বাম হাতে গুরুতর আঘাত পেয়েছেন।

রিপাবলিকান সিনেটর শিহি এক্সের এক পোস্টে লেখেন, তিনি পরিস্থিতি শান্ত করতে এগিয়ে গিয়েছিলেন। কারণ ম্যাকগিনিস সংঘর্ষের উদ্দেশ্যে ক্যাপিটলে এসেছিলেন।

ক্যাপিটল পুলিশ জানায়, ম্যাকগিনিস কর্মকর্তাদের ওপর চড়াও হয়েছিলেন এবং সহিংসভাবে বাধা দিয়েছিলেন। পুলিশ তার বিরুদ্ধে আক্রমণ, বেআইনিভাবে বিক্ষোভ প্রদর্শন এবং কাজের বাধা দেওয়ার অভিযোগে মামলা করেছে।

যুদ্ধে ৫০০ মার্কিন সেনা নিহত

ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলি লারিজানি দাবি করেছেন, চলমান সংঘাতে এখন পর্যন্ত ৫০০–র বেশি মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে। তিনি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানকে ‘অন্যায় যুদ্ধ’ বলেও উল্লেখ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে লারিজানি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর “ভাঁড়ামিপূর্ণ আচরণে” প্রভাবিত হয়েছেন। তার অভিযোগ, নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের জনগণকে ইরানের বিরুদ্ধে একটি অন্যায় যুদ্ধে জড়িয়ে দিয়েছেন।

পোস্টে তিনি লেখেন, ‘মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ৫০০–র বেশি মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে। এখন ট্রাম্পকে হিসাব করতে হবে—যুক্তরাষ্ট্র কি এখনও সবার আগে, নাকি ইসরাইল?’ তবে পেন্টাগনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র ছয়জন মার্কিন সেনার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে, যার মধ্যে চারজন কুয়েতে নিহত হয়েছেন। বর্তমানে লারিজানি ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল–এর প্রধান। এর আগে তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এক সংক্ষিপ্ত বার্তায় তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘গল্প এখানেই শেষ নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইমাম খামেনির শাহাদাতের জন্য আপনাদের বড় মূল্য দিতে হবে, ইনশাআল্লাহ।’ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার মাধ্যমে এই সংঘাত শুরু হয়। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং কয়েকজন উচ্চপদস্থ সামরিক কমান্ডার নিহত হন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

সরকারি হিসাবে, চার দিনের লড়াইয়ে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৫০ জন ইরানি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরে ১৬৫ জন স্কুলশিশুর মৃত্যুর খবর ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেহরানের কেন্দ্রস্থলে নিজের বাসভবনে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অবস্থানকালে হামলার লক্ষ্যবস্তু হন খামেনি। নিহতদের মধ্যে তার স্ত্রী, মেয়ে, পুত্রবধূ, জামাতা ও নাতি-নাতনিও ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে।

খামেনি নিহত হওয়ার পর ইরানের নেতৃত্ব কঠোর প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এর অংশ হিসেবে ইসরাইল এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। সোমবার এক বিবৃতিতে লারিজানি বলেন, ইরান ‘দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।’ তিনি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার যে প্রস্তাব ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল-বুসাইদি দিয়েছিলেন, তা ইরান প্রত্যাখ্যান করেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে দুই দেশের মধ্যে পরোক্ষ পারমাণবিক আলোচনা মধ্যস্থতা করছিল ওমান।

ইরানের নিশানায় এবার কুর্দিরা উত্তর ইরাকে ভয়াবহ বোমাবর্ষণ

ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে কুর্দি গোষ্ঠীর সদর দফতরে তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরান। গতকাল বৃহস্পতিবার সরকারি খবর অনুযায়ী, এ হামলা ইরান ও ইরাকের কুর্দি এলাকায় কুর্দি বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে নেওয়া হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ জানিয়েছে, ‘আমরা ইরাকের বিপ্লব বিরোধী কুর্দি গোষ্ঠীর সদর দফতরে তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছি।’

ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলি লারিজানী কুর্দি বিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, ইরাক থেকে ইরানের মধ্যে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করলে কোনো পরিস্থিতিকেই ক্ষমা করা হবে না। তিনি আরও বলেছেন, দেশের সশস্ত্র বাহিনী পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টেও লারিজানীর এই মন্তব্য প্রকাশিত হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, যারা ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ ভাবছে যে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন কুর্দি বিরোধী গোষ্ঠীকে সামরিক সহায়তা দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সৃষ্টির পরিকল্পনা করছে বলে খবর পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, এই গোষ্ঠীকে মাটির বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করার সম্ভাবনা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ইরান কুর্দি অঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গড়াতে পারে

ইসরাইলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করা যুদ্ধ একটি দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতে পরিণত হতে পারে। এর এজন্য দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগন দ্রুততার সঙ্গে তাদের গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সামরিক এই পরিকল্পনা আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হতে পারে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকো বুধবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড ফ্লোরিডার টাম্পায় তাদের সদর দফতরে অতিরিক্ত সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা মোতায়েনের জন্য পেন্টাগনের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে। এই অতিরিক্ত জনবল ইরানের বিরুদ্ধে অন্তত ১০০ দিন এবং সম্ভাব্য ক্ষেত্রে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অভিযানে সহায়তা করবে।

রাশিয়ার কাছে সামরিক সহায়তা চায়নি ইরান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলী হামলার মুখে থাকা ইরান এখন পর্যন্ত রাশিয়ার কাছে কোনও ধরনের সামরিক সহায়তা চায়নি বলে জানিয়েছে ক্রেমলিন। বৃহস্পতিবার ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে এই তথ্য জানানো হয়েছে। মিত্র দেশ ইরানকে বাস্তবে কোনও সামরিক সহায়তা দেবে কি না মস্কো, এমন প্রশ্নের জবাবে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ‘ইরানি পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনও অনুরোধ আসেনি।’ পেসকভ আরও বলেছেন, ‘আমাদের অবস্থান সবার জানা এবং এতে কোনও পরিবর্তন হয়নি।’ রুশ কর্মকর্তাদের মতে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তেহরানের সঙ্গে মস্কো যে কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি সই করেছে, তাতে সামরিক সহায়তার কোনও বিধান রাখা হয়নি।

ইরান সরকারের ভেঙে পড়ার লক্ষণ নেই দাবি ইসরাইলী নিরাপত্তা বাহিনীর

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ব্যাপক বিমান হামলার মুখে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির শিকার হলেও ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা পতনের কাছাকাছি নেই বলে মনে করছে ইসরাইলী নিরাপত্তা বাহিনী। ইসরাইলী সংবাদমাধ্যম ওয়াল্লা’র এক প্রতিবেদনে এই দাবি করা হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর একটি সূত্র ওয়াল্লা-কে জানিয়েছে যে, ২০২৫ সালের জুন মাসে ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে হওয়া যুদ্ধ থেকে তেহরান শিক্ষা নিয়েছে। ওই সূত্র মতে, বর্তমানে ইরানের সামরিক সক্ষমতা মাঝারি থেকে দুর্বল পর্যায়ে থাকলেও তারা এখনও কার্যকর রয়েছে। সেখানে বড় ধরনের প্রতিকূলতা থাকলেও শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার কোনও লক্ষণ নেই এবং ইরান যেকোনও শূন্যস্থান পূরণে প্রস্তুত রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরাইলকে লক্ষ্য করে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরান সমস্যার সম্মুখীন হওয়ায় তারা এখন আরব উপসাগরীয় দেশগুলোকে বেশি লক্ষ্যবস্তু করছে। এদিকে ইরান যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলী কর্মকর্তাদের মধ্যে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে। শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন যে, এই সন্ত্রাসী শাসকগোষ্ঠী যেন কখনও পারমাণবিক অস্ত্র না পায় সেটিই তার প্রশাসনের নীতি। পরে তিনি ইরানি জনগণকে তাদের সরকার উৎখাতের আহ্বান জানিয়ে বলেন যে, সব জায়গায় বোমা পড়বে এবং কাজ শেষ হলে জনগণ যেন সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেয়।

একই সুরে গত মঙ্গলবার ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, এটি একটি দ্রুত ও চূড়ান্ত পদক্ষেপ হতে যাচ্ছে এবং তারা এমন পরিবেশ তৈরি করবেন যাতে ইরানি জনগণ একটি গণতান্ত্রিক সরকার গঠন করতে পারে। তবে গত চার দিনে মার্কিন প্রশাসনের অবস্থানে কিছুটা পরিবর্তন দেখা গেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন যে, এটি তথাকথিত শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের যুদ্ধ নয়। হামলার খতিয়ান তুলে ধরে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান ব্র্যাড কুপার জানান, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের অভ্যন্তরে ২ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি ইসরাইলী সেনাবাহিনী আরও ১ হাজার ৫০০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করেছে। তবে তেল আবিব ইউনিভার্সিটির অধিভুক্ত থিংক ট্যাংক ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ (আইএনএসএস) জানিয়েছে, ইরান পাল্টা বিপুল সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়তে সক্ষম হয়েছে।

আইএনএসএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান ইসরাইল অভিমুখে প্রায় ২০০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ১০০টি ড্রোন ছুড়েছে। এছাড়া উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর দিকে ইরান প্রায় ৫০০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ২ হাজার ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে, ইরান ইসরাইলকে প্রধান শত্রু মনে করলেও তাদের বেশিরভাগ হামলা নিকটবর্তী প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপরই কেন্দ্রীভূত করছে। এর মধ্যে ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর সবচেয়ে বেশি হামলা চালানো হয়েছে।

পারস্য উপসাগরে মার্কিন তেলবাহী জাহাজে হামলার দাবি ইরানের

পারস্য উপসাগরের উত্তর অংশে একটি মার্কিন তেলবাহী জাহাজে হামলার দাবি করেছে ইরানের আধাসামরিক বাহিনী বিপ্লবী গার্ড। বৃহস্পতিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে এই দাবি করা হয়। বিবৃতিতে হামলার বিষয়ে বিস্তারিত কোনও তথ্য দেওয়া হয়নি। তবে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সেন্টারের একটি রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, দিনের শুরুর দিকে কুয়েত উপকূলের অদূরে একটি ট্যাঙ্কার হামলার শিকার হয়। ইরানের এই দাবি সেই হামলার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আজারবাইজানে ইরানের ড্রোন হামলা

নিজেদের ছিটমহল নাখচিভানে ড্রোন হামলা চালানোর জন্য ইরানকে অভিযুক্ত করেছে আজারবাইজান। বৃহস্পতিবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে এই অভিযোগ করা হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নাখচিভানের একটি বিমানবন্দরের কাছে একটি ড্রোন বিধ্বস্ত হয়েছে এবং অন্যটি একটি স্কুলের কাছে পড়েছে। এই ঘটনায় দুই বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন। আজারবাইজান এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, তারা প্রয়োজনীয় প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার সংরক্ষণ করে। ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে আজারবাইজান সরকার ইরানি রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে। আজারবাইজানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইনের নীতি ও আদর্শের পরিপন্থি এবং এটি এই অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ইরান এখন পর্যন্ত আজারবাইজানকে লক্ষ্য করে হামলার বিষয়টি স্বীকার করেনি। তবে আঞ্চলিক দেশগুলোকে জড়িয়ে যুদ্ধ চলতে থাকায় ইরানের হামলাগুলো অনিয়মিতভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। ভৌগোলিকভাবে নাখচিভান আজারবাইজানের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন একটি ছিটমহল, যা দেশটির মোট আয়তনের প্রায় ৬ শতাংশ। এই ছিটমহল ও আজারবাইজানের মূল ভূখণ্ডের মাঝে আর্মেনিয়ার প্রায় ৪০ কিলোমিটার প্রশস্ত একটি এলাকা রয়েছে। এছাড়া নাখচিভানের সঙ্গে আজারবাইজানের ঘনিষ্ঠ মিত্র তুরস্ক এবং ইরানের সীমান্ত রয়েছে

তুরস্কে হামলার বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করলো ইরান

তুরস্কের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইরান। দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ এক বিবৃতিতে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার তুরস্কের দিকে একটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়, যা ন্যাটো প্রতিরক্ষা বাহিনী তুরস্কে আকাশসীমায় প্রবেশের সময় ভূপাতিত করেছে। ইরানি সেনাবাহিনীর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “ইরানের সশস্ত্র বাহিনী প্রতিবেশী এবং বন্ধুত্বপূর্ণ দেশ তুরস্কের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করে এবং সেদেশের ভূখণ্ডের দিকে কোনও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়নি।” তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতে, ইরাক ও সিরিয়ার উপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার পর ক্ষেপণাস্ত্রটি তুরস্কের আকাশসীমার কাছে পৌঁছে যায় এবং সেখানে সেটিকে প্রতিরোধ করা হয়। তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বলেছেন, তুরস্ক তার ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে পরামর্শ করে ‘প্রয়োজনীয় সকল সতর্কতা অবলম্বন করছে’ এবং ‘পুনরায় অনুরূপ ঘটনা যাতে না ঘটে সেজন্য স্পষ্টভাবে সতর্কতা জারি করছে’।