যথাযোগ্য মর্যাদায় ঢাকাসহ সারাদেশে ভাষা শহীদদের স্মরণ করলো জাতি। দল মত নির্বিশেষে সব শ্রেণিপেশার মানুষের পদভারে ভাবগম্ভীর পরিবেশে সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হয়। এসময় আগতদের কণ্ঠে ছিল তরুণদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত।
একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মানুষের ঢল নামে। ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে আসা অতিথিদের স্বাগত জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান। এ সময় প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এম. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, অমর একুশে উদযাপন উপলক্ষ্যে গঠিত কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটির সমন্বয়কারী মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মোর্শেদ হাসান খান, যুগ্ম সমন্বয়কারী বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম, ফার্মেসি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সেলিম রেজা এবং সদস্য-সচিব প্রক্টর অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমদসহ শিক্ষকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
একুশের প্রথম প্রহরে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথকভাবে শহীদ বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে মহান ভাষা শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে ভাষাশহীদদের জন্য দোয়া ও মোনাজাত করেন। এরপর তিনি মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের নিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যদের নিয়েও পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন তিনি। এরপর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে নিয়ে তিনি ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পর প্রধান বিচারপতি, তিন বাহিনীর প্রধানগণ পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান ১১ দলীয় জোটের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধার পাশাপাশি ভাষা শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।
ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও কূটনীতিক, নির্বাচন কমিশন, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, ডাকসু নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি শহিদ বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মসূচির অংশ হিসেবে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য আজ শনিবার সকাল সাড়ে ৬টায় ‘স্মৃতি চিরন্তন’ চত্বর থেকে মৌন মিছিল ও প্রভাতফেরি বের করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান এতে নেতৃত্ব দেন। এদিন বাদ আসর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ মসজিদুল জামিয়াসহ সকল হলের মসজিদ এবং আবাসিক এলাকার মসজিদে ভাষা শহিদদের রুহের মাগফেরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়েও শহিদদের আত্মার শান্তি কামনা করে বিশেষ প্রার্থনা করা হয়।
ফুল দিতে এসে দুর্নীতি রুখে একুশের চেতনা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশর (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেছেন, দুর্নীতি একুশের চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থি। একুশের মূল শিক্ষা হলোÑ সব মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা। সকলের সমান মর্যাদা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করাই এই চেতনার মূল উদ্দেশ্য। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, আজ যখন আমরা ভাষার অধিকারের কথা বলি, তখন তা কেবল বাংলা ভাষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে কেন ? ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ শব্দবন্ধটি কোথা থেকে এসেছে ? এর মূল অর্থই হচ্ছেÑপ্রত্যেক মানুষের নিজস্ব মাতৃভাষা চর্চার সমান অধিকার নিশ্চিত করা। তিনি আরও বলেন, আমি মনে করি, সব মানুষের সমান অধিকার এবং নির্বিঘেœ ভাষা চর্চার পথের অন্তরায়গুলো আমাদের চিহ্নিত করতে হবে। আর এই পথের অন্যতম প্রধান অন্তরায় হচ্ছে দুর্নীতি।
জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, লড়াই অব্যাহত থাকবে যতক্ষণ না বাংলাদেশে একটি মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এমন একটি রাষ্ট্র দরকার যেখানে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি নির্মূল হবে এবং সাধারণ মানুষ নিরাপদ জীবন পাবে। তিনি বলেন, বীররা কখনো হারিয়ে যায় না। ৫২-র শহীদরা আমাদের শিখিয়ে গেছেন, সংগ্রাম করলে অধিকার ফিরে পাওয়া যায়।
বাংলাদেশকে বহুভাষিক ও বহুসংস্কৃতির রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও ঢাকা-১১ আসনের সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, দেশে বাংলা ভাষার পাশাপাশি যেসব মাতৃভাষা বিদ্যমান, সেগুলোর প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং সংরক্ষণ করা রাষ্ট্র ও সমাজের অন্যতম দায়িত্ব।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানÑ সবকিছুই একই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার অংশ। এসব আন্দোলনের চেতনা একসূত্রে গাঁথা, যা দেশের গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক ভবিষ্যৎ নির্মাণে প্রেরণা জোগায়।
তিনি আরও বলেন, শহীদদের আদর্শ ধারণ করে বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার লড়াই অব্যাহত থাকবে। এনসিপি আগামী দিনগুলোতে ভাষা আন্দোলনের শহীদ, একাত্তরের শহীদ এবং চব্বিশের আন্দোলনের শহীদদের ত্যাগকে সামনে রেখে রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনা করবে বলেও উল্লেখ করেন।