• পেট্রোলপাম্পে দীর্ঘ লাইন
  • রসিদ দেখিয়ে তেল নিতে হবে

দেশে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। কাল রোববার থেকে সারাদেশে রেশনিং পদ্ধতিতে জ্বালানি তেল বিক্রি করার ঘোষণা দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর পরীবাগের একটি পেট্রোল পাম্প পরিদর্শন শেষে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, জ্বালানি তেলের মজুদ যেন কোনোভাবেই সংকটে না পড়ে, সেজন্য আগেভাগেই এই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে পেট্রোল পাম্পগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে খুব দ্রুতই লিখিত চিঠি পাঠানো হবে। সরকারের এই পদক্ষেপের ফলে সাধারণ মানুষ সুশৃঙ্খলভাবে জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিকভাবে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমে গেছে। এতে দেশেও জ্বালানি তেলের সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মানুষ আতঙ্কিত হয়ে ফিলিং স্টেশনে ভিড় করছে এবং বেশি বেশি তেল কিনছে। তাই ফিলিং স্টেশন থেকে তেল সরবরাহের সীমা বেঁধে দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। শুক্রবার বিপিসির এক নির্দেশনায় বলা হয়, একটি মোটরসাইকেলে দিনে ২ লিটার পেট্রল বা অকটেন নিতে পারবে। ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে নেওয়া যাবে ১০ লিটার তেল।

স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকেল বা এসইউভি (যা জিপ নামে পরিচিত) ও মাইক্রোবাস দিনে পাবে ২০ থেকে ২৫ লিটার তেল। পিকআপ বা লোকাল বাস দিনে ডিজেল নিতে পারবে ৭০ থেকে ৮০ লিটার। আর দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান বা কনটেইনার ট্রাক দৈনিক ২০০ থেকে ২২০ লিটার তেল নিতে পারবে।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, দেশের ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশ বিদেশ হতে আমদানি করতে হয়। বৈশ্বিক সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশের জ্বালানি তেলের আমদানি ব্যবস্থাপনা মাঝেমধ্যে বাধাগ্রস্ত/বিলম্বিত হয়। চলমান বৈশ্বিক সংকট পরিস্থিতিতে বিভিন্ন গণমাধ্যম/সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জ্বালানি তেলের মজুত পরিস্থিতি নিয়ে নেতিবাচক সংবাদ প্রচার হওয়ায় ভোক্তা/গ্রাহকদের মধ্যে অতিরিক্ত চাহিদার প্রবণতা লক্ষ্যে করা যাচ্ছে। অতিরিক্ত চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে ডিলারেরা বিগত সময়ের চেয়ে অতিরিক্ত পরিমাণ জ্বালানি তেল ডিপো থেকে সংগ্রহের চেষ্টা করছেন।

নির্দেশনায় আরও বলা হয়, কিছু কিছু ভোক্তা ও ডিলার ফিলিং স্টেশন হতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে অননুমোদিতভাবে মজুত করার চেষ্টা করছেন মর্মে খবর প্রকাশ হচ্ছে, যা জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং বিপিসিসহ সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হয়েছে।

জনগণের আতঙ্ক কমানোর লক্ষ্যের কথা জানিয়ে নির্দেশনায় বলা হয়, দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য বিদেশ হতে আমদানি কার্যক্রম/সূচি নির্ধারিত রয়েছে। নিয়মিতভাবে চালান দেশে আনা হচ্ছে। পাশাপাশি ডিলারদের সাময়িকভাবে প্রধান স্থাপনা হতে সারা দেশের সব ডিপোতে নিয়মিতভাবে রেল ওয়াগন/ট্যাংকারের মাধ্যমে তেল পাঠানো হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে, স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশে জ্বালানি তেলের বাফার স্টক (পর্যাপ্ত মজুত) গড়ে উঠবে।

এদিকে রাজধানীর পেট্রোল পাম্পগুলোতে প্রাইভেট গাড়ি ও মোটরবাইকের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। সাধারণত দাম বৃদ্ধির খবর ছড়লে এমন দীর্ঘ লাইন দৃশ্যমান হতো। ইরান যুদ্ধের আবহে দাম বেড়ে যেতে পারে সেই আতঙ্ক কাজ করছে সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে। রাজধানীর আসাদগেট, শাহবাগ, মৎস্য ভবনে অবস্থিত পেট্রোল পাম্প ঘুরে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। পরিবাগে অবস্থিত মেঘনা অয়েল কোম্পানির পেট্রোল পাম্পে বাইকের লাইন ইন্টারকন্টিনেন্টাল সিগন্যালে পর্যন্ত দেখা গেছে।

মেঘনা মডেল পাম্পের ম্যানেজার হাবিবুল্লাহ বলেছেন, সকাল থেকেই বাড়তি চাপ দেখা যাচ্ছে। বাইকচালকরা সাধারণত দুই-চার লিটার করে তেল নিলেও আজকে সকলেই ট্যাংকি ফুল করে নিচ্ছেন। দৈনিক ১৫ হাজার লিটার জ্বালানি তেল বিক্রি হয়, আজকে হয়তো ২০ হাজার লিটার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের পাম্পের তেলের ধারণ ক্ষমতা রয়েছে ৩০ হাজার লিটার। অস্বাভাবিক চাপ দেখা গেছে মৎস্যভবন এলাকায় অবস্থিত পেট্রোল পাম্পেও। পাম্পাটিতে তেল নিতে আসা বাইকের লম্বা লাইন দেখা গেছে। পাশাপাশি প্রাইভেট গাড়ির সংখ্যাও অন্যদিনের তুলনায় অনেক বেশি ছিল।

সাধারণ রাজধানীর সিএনজি ফিলিং স্টেশনেগুলোতে এমন ভিড় দেখা যায়। কিন্তু পেট্রোল পাম্পে এমন ভীড় খুবই অস্বাভাবিক। অতীতে দেখা গেছে রাত ১০ টায় দাম বৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, কয়েক ঘণ্টা পরে কার্যকর হবে এমন সময়ে উপচে পড়া ভিড় দেখা যেতো। কিন্তু সারাদিনেই এমন যানবাহনের চাপ খুবই অস্বাভাবিক।

সুজন নামে একজন গাড়ি চালক বলেন, ইরান যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বেড়ে যেতে পারে। তাই আগে-ভাগে ট্যাংক ফুল করে নিচ্ছি। তেল পাওয়া যায় কি-না এমন শঙ্কার কথাও কেউ কেউ বলা বলি করছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা রকম গুজব দেখা যাচ্ছে। অনেকেই জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার বেড়ে যাওয়া, হরমুজ প্রণালি বন্ধের খবর শেয়ার দিচ্ছেন। এতে করে যানবাহন ব্যবহারকারিদের মধ্যে এক ধরণের আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) একটি সুত্র দাবি করেছে, দাম বেড়ে যাওয়ার গুজব ছড়িয়ে পড়েছে, অনেকেই ফোন করে জানতে চাইছেন দাম বাড়ছে না-কি! দাম সমন্বয় করা হয় প্রতি মাসের শেষ দিন, অর্থাৎ এখন মাত্র ৫ তারিখ। দাম সমন্বয় হলেও তা হবে ৩১ মার্চ। সে কারণে আন্তর্জাতিক বাজারদর বাড়লেও সহসা সমন্বয় হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

বিপিসি চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজানুর রহমান বলেছেন, জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে, জনগণকে আতঙ্কিত না হওয়ার অনুরোধ করবো। শুধু চলতি মাস নয়, আগামী জুন পর্যন্ত তেল সরবরাহ নিশ্চিত রয়েছে। পরিশোধ তেল যেসব উৎস থেকে আসবে, ইরান যুদ্ধের কোন প্রভাব নেই ওইসব অঞ্চলে। এগুলো আসবে চীন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া থেকে। বর্তমানে ডিজেল ১৪ দিন, অকটেন ২৮ দিন, পেট্রোল ১৫ দিন, ফার্নেস ৯৩ দিন ও জেড ফুয়েল ৫৫ দিনের মজুত রয়েছে। নিরবিচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখতে ২ মার্চ পর্যন্ত ৭টি জাহাজের এলসি সম্পন্ন হয়েছে।

পেট্রোল পাম্প পরিদর্শনকালে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত প্রতিমন্ত্রী সাম্প্রতিক সময়ে জনগণের মধ্যে তৈরি হওয়া জ্বালানি আতঙ্ক নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চলমান যুদ্ধাবস্থার কারণে সাধারণ মানুষের মনে কিছুটা দুশ্চিন্তা কাজ করছে, যা স্বাভাবিক। তবে দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে এবং ভয়ের কোনো কারণ নেই। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, গত কয়েক দিনে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি তেল সরবরাহ করা হয়েছে, যা ক্রেতারাও স্বীকার করেছেন।

জ্বালানি তেলের দামের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, যা সরকারের ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে। তবে সরকার চেষ্টা করছে এই মুহূর্তে দাম না বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে। পরিস্থিতি যদি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যেখানে দাম সমন্বয় করা ছাড়া কোনো উপায় নেই, তবে তা সরাসরি জনগণের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

জনসাধারণের ভোগান্তি কমাতে সরকার সর্বদা সচেষ্ট রয়েছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত দেশবাসীকে ধৈর্য ধরার এবং সরকারি সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানান। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল মজুদ না করলে সরবরাহ ব্যবস্থা আরও দ্রুত স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে। এ বিষয়ে তিনি সকল মহলের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেছেন।

রসিদ দেখিয়ে তেল নিতে হবে :

ফিলিং স্টেশন থেকে ভোক্তাকে তেলের ধরন, পরিমাণ ও দাম উল্লেখ করে রসিদ দিতে হবে এবং প্রতিবার তেল কেনার সময় আগের রসিদ দেখাতে হবে বলে উল্লেখ করা হয় নির্দেশনায় বিপিসি বলেছে, ডিলারেরা বরাদ্দ ও ভোক্তার ক্রয় রসিদ গ্রহণ করে তেল সরবরাহ করবে। ফিলিং স্টেশনগুলো জ্বালানি তেলের মজুত ও বিক্রির তথ্য ডিপোতে প্রদান করে জ্বালানি তেল গ্রহণ করবে। ডিলারদের জ্বালানি তেল সরবরাহের আগে বর্তমান বরাদ্দ ও মজুতের তথ্য পর্যালোচনা করে সরবরাহ করা হবে এবং কোনো অবস্থায় বরাদ্দের চেয়ে বেশি তেল দেওয়া যাবে না বলেও উল্লেখ করেছে বিপিসি।

রাজশাহীর ফিলিংস্টেশনে জ্বালানি তেলের সংকট

রাজশাহী ব্যুরো : রাজশাহী জেলার বিভিন্ন ফিলিংস্টেশনে পেট্রল ও অকটেনের সংকট দেখা দিয়েছে। চাহিদামতো তেল না পাওয়ার ফিলিংস্টেশনেগুলোতে বাইকারদের দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় কয়েকটি ফিলিং স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধও হয়ে গেছে বলে জানা গেছে।

তথ্যমতে, রাজশাহীতে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে নগরীর বেশিরভাগ ফিলিং স্টেশন বাইকারদের চাহিদামতো তেল দেওয়া বন্ধ করে দেয়। কোনো কোনো স্টেশনে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা এবং কোথাও ৫০০ টাকার তেল দেওয়া শুরু হয়। শুক্রবারও একই চিত্র দেখা গেছে। সকাল থেকেই রাজশাহী নগরের বিভিন্ন ফিলিংস্টেশনে বাইকারদের দীর্ঘ সারি লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটর্স, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় মোট ২৭৯টি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। গত তিন দিন ধরে এসব স্টেশনে পেট্রল ও অকটেন সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটর্স, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের রাজশাহী বিভাগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল গণমাধ্যম কে বলেন, ইরান যুদ্ধের প্রভাবের কারণে সরবরাহে সমস্যা দেখা দিয়েছে। গত তিন দিন ধরে ফিলিং স্টেশনগুলো চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছে না। ফলে পাম্পগুলো চাহিদামতো তেল বিক্রি করতে পারছে না। ইতোমধ্যে কয়েকটি ফিলিং স্টেশন তেল না থাকায় বন্ধ হয়ে গেছে। যেগুলোতে তেল রয়েছে, সেগুলোতে অল্প অল্প করে দেওয়া হচ্ছে।