প্রতিবাদ মূখর ছিল বিরোধী দল

সমঝোতা, বিতর্ক, ‘ওয়াকআউটের’ মধ্য দিয়ে ছয়দিনে ৯১টি বিল পাসের মাধ্যমে ১২০টি অধ্যাদেশের ভাগ্য নির্ধারণ করেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশগুলোর বৈধতা প্রশ্নে জাতীয় সংসদের সাংবিধানিক নিষ্পত্তির কাজ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে ১১৩টি অধ্যাদেশকে ৮৭টি বিল পাসের মাধ্যমে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের পর যেগুলো আইনে পরিণত হবে।

আরও চারটি পৃথক রহিতকরণ বিল পাসের মাধ্যমে সাতটি অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে, এগুলোর মধ্যে ছিল জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ। অন্যদিকে সংসদে বিল আকারে অনুমোদন না পাওয়ায় ১৩টি অধ্যাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে গেছে। যে কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারালো।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে সিংহভাগ (৯১টি) আইন হিসেবে পাস হলেও, বিশেষভাবে সুপারিশকৃত ২০টি অধ্যাদেশ বিল আকারে উত্থাপন বা পাস হয়নি । এর মধ্যে ৪টি অধ্যাদেশ বাতিল এবং ১৬টি আরও শক্তিশালী করে নতুন বিল হিসেবে আনার সুপারিশ করা হয়েছে।

শুক্রবার সংসদে শেষ দফায় ২৪টি বিল পাস হয়। দিনের কার্যসূচি শেষে স্পিকার আগামী ১৫ এপ্রিল বুধবার সকাল ১১টা পর্যন্ত অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করেন। তার আগের দিন বৃহস্পতিবার ৩১টি, বুধবার ১৩টি, মঙ্গলবার ১৪টি, সোমবার ৭টি ও রোববার ২টি বিল পাস হয়।

গত ১২ মার্চ সংসদের প্রথম কার্যদিবসে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করেন। পরে সেগুলো যাচাই-বাছাইয়ের জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে সেখানে পাঠানো হয়। ২ এপ্রিল বিশেষ কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন সংসদে প্রতিবেদন পেশ করেন। ওই প্রতিবেদনে ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু, ১৫টি সংশোধিত আকারে পাসের সুপারিশ করা হয়। আর চারটি অধ্যাদেশ রহিত করার এবং ১৬টি পরবর্তীতে অধিকতর যাচাই-বাছাই করে শক্তিশালী আকারে নতুন বিল হিসেবে আনার সুপারিশ ছিল।

সংসদের চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে ১১৩টি অধ্যাদেশ অনুমোদন পেলেও, সাতটি অধ্যাদেশ রহিত করা হয়েছে। অন্যদিকে গণভোট, পুলিশ কমিশন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার, দুদক অধ্যাদেশসহ ১৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করা হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, যে অধ্যাদেশগুলো সংসদে বিল আকারে আনা হয়নি তা মূলত ফ্যাসিজম বিরোধী অধ্যাদেশ। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এই অধ্যাদেশগুলো পাশ করা হলে সরকার বা কোন দল ক্ষমতার জোরে ফ্যাসিজম কায়েম করতে পারতো না। বিশেষ করে দুদক সংস্কার বিল, পুলিশ সংস্কার বিল, গুম কমিশন বিল, পিএসসি সংস্কার বিল। শক্রবার রাতে জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, যে বিলগুলো আনা হয়নি সেগুলোর সাথে প্রত্যেকটি নাগরিকের ভাগ্য জড়িত। নিরাপত্তা জড়িত। এগুলো দিয়ে অতীতে ফ্যাসিজম কায়েম করা হয়েছে। অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। যেগুলো দিয়ে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করা যায় সেগুলো তারা রেখে দিয়েছে। এভাবে তারা আস্থাহীনতার পরিবেশ তৈরি করেছে।

এদিকে সংসদে পাস হওয়া রহিতকরণ বিলগুলোর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, জাতীয় সংসদ সচিবালয় এবং মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত অধ্যাদেশসহ মোট সাতটি অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে। এই ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশের অধীনে আগে নেওয়া পদক্ষেপগুলোর সুরক্ষা রেখে সেগুলো রহিত করা হয়েছে।

অন্যদিকে সংসদে না তোলায় কার্যকারিতা হারাচ্ছে যে ১৩টি অধ্যাদেশ, সেগুলো হল-গণভোট অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার সংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ, তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ, কাস্টমস (সংশোধন) অধ্যাদেশ, আয়কর (সংশোধন) অধ্যাদেশ, বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) সংশোধন অধ্যাদেশ এবং রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশ।

এসব অধ্যাদেশের অধীনে অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলোর আইনি পরিণতি কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে, গণভোট অধ্যাদেশের অধীনে হওয়া কার্যক্রম, গুমবিরোধী কাঠামো বা পুলিশ সংস্কার কমিশন-সংক্রান্ত উদ্যোগগুলোর অবস্থান এখন আলাদা আইনি ব্যাখ্যার বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তবে সংসদে বিতর্কের সময় আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দুজনেই বলেছেন, বিশেষ কমিটির সুপারিশে যেসব অধ্যাদেশ এখন বিল আকারে তোলা হয়নি, সেগুলো ভবিষ্যতে আবার আনা হবে। তাদের ভাষ্য, ‘ল্যাপস’ মানেই আলোচনার সমাপ্তি নয়; প্রয়োজনে নতুন বিল আকারে সেগুলো আবার সংসদে আসতে পারে।

সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদের কথা তুলে ধরে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংসদে বলেন, ৩০ দিনের মধ্যে অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন করতে হয়; কোনোটি উত্থাপন না করা হলে তা ‘ল্যাপস’ হয়। কোনোটি উত্থাপন করা হয়। যেগুলো ‘ল্যাপস’ হয় সেগুলোকে পরে বিল আকারে অনুমোদন বা অননুমোদন করতে হয়।

প্রতিবাদ মূখর ছিল বিরোধী দল :

প্রথম দিন থেকে সংসদে প্রতিবাদ মূখর ছিল বিরোধী দল। ফলে সংসদ আরও বেশি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। প্রথম দিন ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রপতির ভাষণকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদ করে ওয়াক আউট করে বিরোধী দল। আবার শেষ দিন শুক্রবার বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ এনে আবারো ওয়াক আউট করে। চলতি অধিবেশনে মোট চার বার ওয়াক আউট করে বিরোধী দল। শেষ দিন বিরোধী দলের সাথে আলোচনা না করে বিল পাশ করার অভিযোগ এনে বিরোধী দলীয় চীফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বিষয়টিকে ‘দিনে দুপুরে রাজনৈতিক জোচ্চুরি’ ও ‘প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণের মহোৎসব’ বলে অভিহিত করেন। নাহিদ ইসলাম বলেন, মাননীয় স্পিকার, আপনি জানেন অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশগুলো নিয়ে একটি বিশেষ কমিটি করা হয়েছিল। সেখানে ৯৮টি অধ্যাদেশ সম্পর্কে আমরা ঐক্যমত পোষণ করেছিলাম যে, সেগুলো ‘অ্যাজ ইট ইজ’ (যেভাবে আছে) সংসদে বিল আকারে আসবে এবং পাস হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিলটিও সেই তালিকার অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু আজ বিলটি উত্থাপনের মাত্র আধা ঘণ্টা আগে একটি সংশোধনী দেওয়া হলো। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক সমঝোতা ও কনসেনসাস ভঙ্গ করা হলো।

তিনি আরও বলেন, সরকারি দল চাইলে যেকোনো বিল পাস করতে পারে, তাদের সেই মেজরিটি আছে। কিন্তু এই বিশেষ কমিটি করার তবে প্রয়োজন কি ছিল ? যদি আমাদের কথা বলার সুযোগই না দেওয়া হয়, তবে এই সংসদ আর জনস্বার্থ রক্ষা করবে কীভাবে? দিনে দুপুরে একটা ছলচাতুরী ও জোচ্চুরির মাধ্যমে এই বিলের সংশোধনী পাস করে নেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে ডা. শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, আমরা দেশবাসীকে কথা দিচ্ছি, জনগণের অধিকারের পক্ষে লড়াই করতে গিয়ে আমরা চুল পরিমাণ কোনো ছাড় দেবো না। আমাদের অবস্থান অক্ষুণ্ন থাকবে। আমাদের এই লড়াই জনগণের অধিকার আদায়ের লড়াই। তিনি বলেন, জনগণের গণরায়- গণভোটের রায় বাস্তবায়ন হলেই আমরা মনে করি সব সমাধানের রাস্তা খুলে যাবে। সংসদে আমরা এর সুবিচার পাইনি, ইনশাআল্লাহ জনগণের কাছে সুবিচার পাবো। আমরা জনগণকে নিয়েই সেই দাবি আদায় করে ছাড়ব। গণভোটের গণরায়- ৭০ শতাংশ মানুষের রায়কে অগ্রাহ্য করার মানে হচ্ছে গণতন্ত্রকে, জনগণকে অপমান করা।