নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত সংলাপে দেশের বিশিষ্টজনরা বলেছেন, বাংলাদেশের বর্তমান সংকট উত্তরণে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি সুষ্ঠু, কার্যকর গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। নির্বাচন এখন একটি অতি প্রয়োজনীয় বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর যে দল সরকার গঠন করবে, তাদের প্রধান দায়িত্ব হবে রাষ্ট্রকে জবাবদিহিমূলক ও নাগরিকবান্ধব কাঠামোয় রূপান্তর করা।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জাতীয় নির্বাচন ২০২৬ ও নাগরিক প্রত্যাশা শীর্ষক নাগরিক প্ল্যাটফর্মের সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন। সেমিনারে বক্তব্য রাখেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন, সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানিত ফেলো অধ্যাপক রওনক জাহান, দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, রাজনীতিবিদ ডা. তাসনিম জারা, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ কমিউনিটি পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল কাফি রতন, গণফোরামের সভাপতি সুব্রত চৌধুরীসহ আরো অনেকে।

রাজনীতিবিদদের প্রতি আস্থা তৈরির দায়িত্ব রাজনীতিবিদদেরই বলে মন্তব্য করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, আগামীর বাংলাদেশে যারা জবাবদিহিতাকে ধারণ করতে পারবেন না, তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যত থাকবে না। জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারলে সংস্কার স্বয়ংক্রিয়ভাবেই হয়ে যাবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির এ সদস্য বলেন, রাজনীতিবিদরা অনেক কথা বলেন, কিন্তু জবাবদিহিতা গুরুত্বপূর্ণ। দেশে অনির্বাচিত সরকার ছিল, এখনও আছে। সংসদীয় সরকার পাইনি। সংসদে গেলে একটা জবাবদিহিতার জায়গা তৈরি হয়। এমনকি সংসদের বাইরে সুশীল সমাজ, এনজিও তাদের কাছেও জবাবদিহিতা আছে। সুশীল অংশীজনদের মাধ্যমে কিভাবে জবাবদিহিতা করা হবে সেটা নিয়েও ভাবছে বিএনপি।

আমীর খসরু বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশে এমন একটি পরিবেশের প্রয়োজন ছিল, যেখানে ভিন্নমতের মানুষ একসঙ্গে বসে মুক্তভাবে কথা বলতে পারবে। সেই পরিবেশ এখন তৈরি হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তবে এই অগ্রগতি ধরে রাখতে হলে সরকারকে একক সিদ্ধান্তের পথ থেকে সরে এসে অংশীদারিভিত্তিক শাসনব্যবস্থায় যেতে হবে।

ক্ষমতায় গেলে রাজনীতিকদের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার প্রবণতার কথাও তুলে ধরেন আমীর খসরু। তিনি বলেন, সরকার গঠনের পর অনেক সময় একটি ‘আইসোলেশন বাবল’ তৈরি হয়, যেখানে ক্ষমতা মানুষের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা এখন অনেক উঁচুতে পৌঁছেছে। এই পরিবর্তন যারা বুঝতে পারবে না, তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড.দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, বাংলাদেশের বর্তমান সংকট উত্তরণের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি সুষ্ঠু, কার্যকর গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। নির্বাচন এখন অত্যন্ত একটি প্রয়োজনীয় বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর যে দল সরকার গঠন করবে, তাদের প্রধান দায়িত্ব হবে রাষ্ট্রকে জবাবদিহিমূলক ও নাগরিকবান্ধব কাঠামোয় রূপান্তর করা।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই একটি সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা। জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ, আত্মত্যাগ এবং বৈষম্যবিরোধী আকাঙ্খাই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নির্মাণের নৈতিক ভিত্তি গড়ে দেয়।

তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর সেই চেতনার ধারাবাহিকতায় একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলাই ছিল জাতির লক্ষ্য। তবে পাঁচ দশকের পথচলায় নানা উত্থান-পতন, আশা-নিরাশার মধ্য দিয়ে দেশ এগোলেও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন রয়ে গেছে অসম ও ভঙ্গুর। বিশেষ করে গত দেড় দশকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়া, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন এবং নাগরিক পরিসর সংকুচিত হওয়ার ফলে গভীর শাসন-সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে ধরে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বৈষম্য, বঞ্চনা ও সুশাসনের ঘাটতির পুঞ্জীভূত বাস্তবতাই শেষ পর্যন্ত সামনে আনে জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান। এটি ছিল ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে কর্তৃত্ববাদী শাসন, ভয়-ভীতি ও জবাবদিহিহীনতার বিরুদ্ধে এক প্রকাশ্য ও জোরালো প্রত্যাঘাত। এই আন্দোলনের মাধ্যমে একটি স্পষ্ট উপলব্ধি জন্ম নেয় এটাই সময় অংশগ্রহণ, জবাবদিহিতা ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তার ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে নতুনভাবে গড়ে তোলার।

তিনি আরো বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় সুশাসন, স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা, নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং দক্ষ ও পেশাদার প্রশাসন গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি। একই সঙ্গে বৈষম্যকে কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে তার আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সমাধানের আহ্বান জানান।

জনগণ ভোট দিয়ে সরকার গঠনের সুযোগ দিলে ভবিষ্যতে নারীদের নির্বাচনে আনা হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা-১২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাইফুল আলম খান।

সাইফুল আলম বলেন, আমরা কিন্তু লোকাল নির্বাচনে মেয়েদের অংশগ্রহণ করিয়েছি। তারা নির্বাচিত হয়েছে, তারা কাজ করেছে। আপনারা দোয়া করেন, জাতীয় সংসদেও আমরা নিয়ে আসব।’

তিনি বলেন,এ বিষয়ে আমরা একা পিছিয়ে আছি তা না। আমাদের বড় দলও পিছিয়ে আছে। আমরা একসঙ্গে এগোব ইনশা আল্লাহ।

আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, দেশের ডিসি-এসপিরা যদি সৎ হয় তাহলে রাষ্ট্রের প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ কাজ সুন্দরভাবে চলবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে যদি কোনো এমপি না থাকে। শুধু আমাদের যে রাষ্ট্র কাঠামো ব্যবস্থাপনা আছে। ডিসিরা যদি সৎ হয়, এসপি যদি সৎ হয়। বিভিন্ন বিভাগ, পরিদফতর, অধিদফতর যে যেখানে আছে। হেলথ সেক্টর, এডুকেশন সেক্টর, তারা যদি সৎ হয় তাহলে রাষ্ট্রের শতকরা ৬০-৭০ ভাগ সুন্দরভাবে চলবে।

তিনি বলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমাদের ন্যাচারাল কজ হচ্ছে তেলে মাথায় তেল দেওয়া। এই নানা সংকটে দাঁড়িয়ে পৃথিবীতে যত নতুন রাজনীতি হয়েছে নিশ্চয়ই অনেক ত্যাগ হয়েছে। আমি একমত হলাম বদলাবো, তবে বদলানোর জন্য ঐক্যবদ্ধতা থাকতে হবে।

পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামো পরিবর্তনের আকাক্ষা থেকেই এনসিপি থেকে সরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে করছেন বলে জানিয়ে তাসনিম জারা বলেন, দেশের বিদ্যমান ব্যবস্থায় জবাবদিহিতার কাঠামো অত্যন্ত দুর্বল। সব জায়গায় জটিলতা। যে যার জবাবদিহি করবে, সেই তার নিয়োগকর্তা।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে যে সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা চলমান রাখা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে যারা ক্ষমতায় থাকবে, তাদের জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করতে হবে।

তাসনিম জারা বলেন, জনগণ পরিবর্তন চায়। তারা পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত আর গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়। এই পরিবর্তনের আকাক্ষা থেকেই আমি আমার দল থেকে সরে এসে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে বলে মন্তব্য করেছেন গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সুব্রত চৌধুরী। তিনি বলেন, আমাদের জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন। এখন যে সরকার বর্তমানে ক্ষমতায় আছে সেই অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ঐকমত্যের ভিত্তিতে কিছু হবে না। কারণ, তারাও আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে।

সুব্রত চৌধুরী বলেন, এতগুলো ঐকমত্য কমিশন করে কী হয়েছে? শেষ পর্যন্ত হ্যাঁ এবং না ভোটের মধ্যে চারটা দফা দিয়ে দিয়েছে। বাকিগুলো কোথায় গেলো?