ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনী ও সেনাবাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দেশটির বিক্ষুব্ধ জনতার উদ্দেশে ‘রেড লাইন’ ঘোষণা করেছে। গতকাল শনিবার পৃথক বিবৃতিতে এই রেড লাইন ঘোষণা করেছে আইআরজিসি ও সেনাবাহিনী।
শনিবার রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক বিবৃতেতে আইআরজিসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, “গত দু’রাত ধরে সন্ত্রাসীরা সামরিক ও আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর ঘাঁটিগুলো দখলের চেষ্টা করছে, বেশ কয়েকজন নাগরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা-কর্মীকে হত্যা করেছে এবং সরকারি সম্পত্তিতে অগ্নিসংযোগ করছে।”
“ধারাবাহিকভাবে এ ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব, রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির নিরাপত্তার স্বার্থে আইআরজিসি ‘রেড লাইন’ ঘোষণা করছে। রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির ক্ষতির চেষ্টা করলেই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।” এএফপি।
পৃথক এক বিবৃতিতে ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনী জানিয়েছে, “ইরানের জাতীয় স্বার্থ, কৌশলগত অবকাঠামো এবং সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় সেনাবাহিনী প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।”
প্রসঙ্গত, বছরের পর বছর ধরে ইরানের মুদ্রা ইরানি রিয়েলের অবনতি, তার জেরে অসহনীয় মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় ব্যাপকভাবে বাড়তে থাকায় নাভিশ্বাস উঠছিল ইরানের সাধারণ জনগণের। এই পরিস্থিতিতে গত ২৮ ডিসেম্বর মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে ধর্মঘটের ডাক দেন রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন বাজারের পাইকারি ও খুচারা ব্যবসায়ীরা। সেই ধর্মঘট থেকেই বিক্ষোভের সূত্রপাত।
এরপর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে ইরানের ৩১টি প্রদেশের প্রায় সবগুলো শহর-গ্রামে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ এবং দিনকে দিন বিক্ষোভের তীব্রতা বাড়তে থাকে। বর্তমানে পুরো দেশকে কার্যত অচল করে দিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা।
ইরানের ক্ষমতাসীন ইসলামপন্থি সরকারও বিক্ষোভ দমাতে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। রাজধানীসহ দেশের প্রায় সব শহরে মোতায়েন করা হয়েছে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের। গতকাল দেশের ইন্টারনেট ও মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে সরকার।
মার্কিন সাময়িকী টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভের গত ১৩ দিনে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের গুলিতে ইরানে নিহত হয়েছেন ২ শতাধিক মানুষ।
এদিকে, ইরানে বিক্ষোভের শুরু থেকেই ক্ষমতাসীন ইসলামপন্থি সরকারকে ট্রাম্প এই মর্মে হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছেন যে সরকার কঠোর পন্থায় আন্দোলন দমনের উদ্যোগ নিলে দেশটিতে সামরিক অভিযান চালাবেন তিনি। এ পর্যন্ত চারবার এই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
ইরানে বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৬২
ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে ৬২ দাঁড়িয়েছে। রিয়ালের ব্যাপক দরপতন, নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং অসহনীয় জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রতিবাদে গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে এ বিক্ষোভ শুরু হয়। চলমান এ বিক্ষোভ ইরানের রাজধানী তেহরান থেকে শুরু হয়ে এখন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। গত ১৩ দিনের বিক্ষোভে ৪৮ জন বিক্ষোভকারী ও ১৪ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হওয়ার খবর জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
নিহতদের মধ্যে ৯টি শিশু রয়েছে বলে জানায় নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস অর্গানাইজেশন। নিহতের পাশাপাশি অন্তত ২ হাজার ২৭৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানায় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষক সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্ট নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ)।
দ্রব্যমূল্যের লাগামছাড়া ঊর্ধ্বগতি ও অর্থনৈতিক দুরবস্থা নিয়ে শুরু হওয়া বিক্ষোভটি সরকার পতনের ডাক দিলে ইরান সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করে।
ইরানের ভেতরে বিবিসিসহ অধিকাংশ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের ওপর সংবাদ পরিবেশনে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ভবন, মেট্রো স্টেশন, ব্যাংক ছাড়াও বাস, প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইন্টারনেট বন্ধ রেখেছে সরকার।
মাদুরোর মতোই একইভাবে ট্রাম্পকে আটক করা উচিত: ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা
ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও চিন্তাবিদ হাসান রহিমপুর আজঘাদি বলেছেন, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যেভাবে আটক করা হয়েছিলো, ঠিক তেমনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আটক করা উচিত।
আজঘাদির বরাত দিয়ে ইরানি সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনালের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্টের খামখেয়ালি পদক্ষেপ নিয়ে বিশ্বনেতারা নীরব। অন্যদিকে, ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সরব ট্রাম্প, যা মোটেও কাম্য নয়।
ইরানের শীর্ষ এই সরকারি কর্মকর্তা মনে করেন, ক্ষমতায় থাকাকালীন অবস্থায় কিংবা শাসনকাল শেষ হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আটক করে বিচারের আওতায় আনা আবশ্যক।
গতকাল ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেয়া এক ভাষণে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ট্রাম্পকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ১৯৭৯ সালে যেভাবে ইরানে রাজতন্ত্রের পতন হয়েছিল, একইভাবে ‘অহংকারী’ ট্রাম্পও ‘পতনের মুখে পড়বেন’।
খামেনি বলেন, কিছু উসকানিদাতা সরকারি সম্পদ ধ্বংস করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে খুশি করার চেষ্টা করছে।
তিনি আরও বলেন, শত শত মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যারা এই রাষ্ট্রকে ধ্বংস করতে চায়, তাদের কাছে কখনো মাথানত করা হবে না ইরান বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
এর আগে, বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দেন, ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী যদি বিক্ষোভকারীদের হত্যা করে, তাহলে দেশটির বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। পাল্টাপাল্টি এসব বক্তব্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ছে ওয়াশিংটন-তেহরান সম্পর্কে।