দেশের তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের অধীনে থাকা ১২২টি কারখানা এখনো শ্রমিকদের ফেব্রুয়ারি মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধ করেনি। এখনো ঈদ বোনাস দিতে পারেনি ৭২৩টি পোশাক কারখানা। জানুয়ারি বা তারও আগের বেতন বকেয়া রয়েছে ৩০টি কারখানায়। শিল্প পুলিশ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। শিল্প পুলিশের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএ এবং বেপজার অধীন মোট দুই হাজার ৮৯০টি পোশাক কারখানা বর্তমানে চালু রয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা পর্যন্ত ফেব্রুয়ারির বেতন পরিশোধ করেছে দুই হাজার ৭৬৮টি প্রতিষ্ঠান। আরও ৩০টি কারখানার শ্রমিকদের জানুয়ারি বা তার পূর্ববর্তী মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে। চলতি মার্চের জন্য ৪২২টি কারখানা শ্রমিকদের অর্ধেক বেতন অগ্রিম পরিশোধ করেছে।

শ্রমিকদের বেতন পরবর্তী মাসের প্রথম সাত কর্মদিবসের মধ্যে পরিশোধের কথা থাকলেও এখনো কিছু কারখানা তা মানতে পারেনি। যদিও শ্রম আইন অনুযায়ীই এ বিধি রয়েছে।

তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের ২ হাজার ১৬৭টি কারখানা এরই মধ্যে ঈদুল ফিতরের বোনাস পরিশোধ করেছে। এখনো ৭২৩টি কারখানা ঈদ বোনাস পরিশোধ করতে পারেনি, যা মোট কারখানার প্রায় ২৫ শতাংশ।

অন্যদিকে, সরকারের বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধ না করায় ১২টি কারখানার মালিকের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার। এসব কারখানার মালিকরা শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধ না করা পর্যন্ত বিদেশ যেতে পারবেন না।

ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে তিনটি পোশাক কারখানাকে ১২ কোটি ২৩ লাখ ৩৫ হাজার ৫৩৪ টাকা দিয়েছে সরকার। অন্যদিকে অসন্তোষ থাকা টিএনজেডের এক কারখানা গাড়ি বিক্রি করে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ করেছে।

বৃহস্পতিবার শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন এ কথা জানান।

উপদেষ্টা বলেন, ‘রোয়ার ফ্যাশন নামের প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে তাদের শ্রমিকদের কথা বিবেচনায় নিয়ে পাওনাদি পরিশোধের জন্য এরই মধ্যে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় তহবিলের আপদকালীন হিসাব থেকে এক কোটি ২৩ লাখ ৩৫ হাজার ৫৩৪ টাকা দেওয়া হয়েছে। তবে এ উদ্যোগ অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রসারিত করা যাবে না।’

তিনি বলেন, ‘শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় আয়োজিত শ্রম অসন্তোষ নিরসন বিষয়ে গত ২৫ মার্চের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী টিএনজেড গ্রুপের অ্যাপারেলস ইকো লিমিটেড গাড়ি বিক্রি করে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করেছে। এটা এর আগে বাংলাদেশে হয়েছে কি না আমার জানা নেই। মালিক অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে আছেন।’

এছাড়া শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে মাহমুদ গ্রুপের দুটি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক নগদ সহায়তা বাবদ ১১ কোটি টাকা ছাড় করেছে বলেও জানিয়েছেন শ্রম উপদেষ্টা।

পোশাক শ্রমিকদের উদ্দেশে উপদেষ্টা বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি, যার যা পাওনা পেয়ে যাবেন। বাকিরা যারা না পান আজ বা কাল সকালে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করবো। প্রায় সব সমস্যাই সমাধান হয়ে গেছে।’

‘এই ঈদ অন্যান্য ঈদ থেকে অনেক ভালো। অন্যান্য বছরের তুলনায় শ্রমিক অসন্তোষ কম। পোশাক খাতের অনেকেই ভালো করছে। এই শিল্পটা বসে যায়নি, পোশাক শিল্পে ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে’, বলেন উপদেষ্টা।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যারা বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে পারছে না তাদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। আমরা শ্রম আইন অনুযায়ী এদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেবো- বলেন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন।

এদিকে অসন্তোষ থাকা পোশাক কারখানার শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধে সরকারের দেওয়া টাকা আটকে রেখেছে বেসরকারি প্রিমিয়ার ব্যাংক। টাকা পরিশোধ না করলে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কাজ করছেন ধরে নিয়ে প্রিমিয়ারের এমডিকে শাস্তির মুখে পড়তে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন।

বৃহস্পতিবার আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে শ্রমিকদের বেতন, বোনাসসহ যাবতীয় পাওনাদি পরিশোধে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ বিষয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে উপদেষ্টা এ কথা জানান।

বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য সরকারের দেওয়া টাকা টিএনজেড অ্যাপারেলস লিমিটেডের কর্মীদের না দিয়ে প্রিমিয়ার ব্যাংক তাদের ঋণ সমন্বয় করছে বলে জানিয়েছেন সাখাওয়াত হোসেন। বেতন-ভাতার দাবিতে গত কিছুদিন ধরে আন্দোলন করে আসছিলেন এই কারখানার শ্রমিকরা।

প্রিমিয়ার ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) উদ্দেশে উপদেষ্টা বলেন, ‘এই টাকাটা আপনাকে ছাড় করতে হবে। আপনি যদি টাকা ছাড় না করেন, আপনি এর দায়দায়িত্ব নেবেন। ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত হবেন।’

তিনি বলেন, ‘ওনাদের এখন লোন অ্যাডজাস্টের কোনো সুযোগ নেই। এই টাকাটা আমরা সরকারিভাবে বের করে দিয়েছি। টাকা লোন দিয়েছেন তখন মনে ছিল না, এই টাকা শ্রমিকদের টাকা। শ্রমিকদের কাছেই টাকা দেবেন, যদি টাকা না দেন আপনিও আছেন আমিও আছি। যদি বেঁচে থাকি ব্যাংক, শাখা, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ম্যানেজারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।’

সাখাওয়াত হোসেন আরও বলেন, ‘প্রিমিয়ার ব্যাংক যদি টাকাটা না দেয় তবে আমি ধরে নেব তারা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কাজ করছেন। সরকারের বিরুদ্ধে কাজ করছেন। সেটার জন্য যা করার আমি করব। আমি যে কথা বলি, এতদিন আপনারা দেখেছেন সেটা আমি করি। প্লিজ টাকাটা দিন আমাদের উত্ত্যক্ত করবেন না। এটা সরকারের টাকা, আপনারা সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন না।’

অন্যায্য ও অযৌক্তিক দাবির নামে গার্মেন্টস শিল্পে অস্থিরতা সৃষ্টি, অবরোধ করে যান চলাচল বন্ধ, নৈরাজ্য ও সহিংসতা সৃষ্টি করা হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর ব্যবস্থা নেবে বলে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গতকাল বৃহস্পতিবার এক বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গার্মেন্টস শিল্পে নৈরাজ্য ও সহিংসতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তা কখনোই মেনে নেওয়া হবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় সরকার তা কঠোরভাবে প্রতিহত করবে। গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন শিল্প কলকারখানায় সুষ্ঠু ও নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখা এবং দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে সরকার এ বিষয়ে মালিকপক্ষ ও শ্রমিকপক্ষ উভয়ের সহযোগিতা কামনা করছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন শিল্প কলকারখানায় সুষ্ঠু ও নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখা এবং দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আজ এক বিবৃতি দেওয়া হয়েছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন শিল্প কলকারখানার শ্রমিকদের পাওনা বেতন-ভাতাসহ যৌক্তিক দাবিগুলোর ব্যাপারে সরকার অত্যন্ত আন্তরিক ও একমত। শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবিগুলো বাস্তবায়নে সরকার কাজ করে যাচ্ছে এবং এ ব্যাপারে সরকারের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এ বিষয়ে মালিকপক্ষ ও বিজিএমইএকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং তাদের কর্মকাণ্ড মনিটর করা হচ্ছে।