নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান ও সুজনের সম্পাদক ড বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ না করে যদি আগের মতোই নির্বাচন করা হয়, তাহলে হয়ত জনগণকে আবার মাঠে নামতে হতে পারে। তিনি বলেন, নির্বাচনে রাজনৈতিক দল, আমলা ও ব্যবসায়ীকদের অংশগ্রহণে বিগত দিনে দুর্বৃত্তায়ন হয়েছে। রাজনীতি এখন ব্যবসায়িক কার্যক্রমে পরিণত হয়েছে। নির্বাচনে জয়ী হলেই অল্প কিছু দিনের মধ্যেই তাদের আয় অনেকগুণ বেড়ে যায়। নির্বাচনী আইন অনুযায়ী যদি স্থানীয় ভাবে পেনেল তৈরি করে নমিনেশন দেওয়ার ব্যবস্থা করা হতো, তাহলে কালো টাকা ও দুর্বৃত্তায়ন রোধ করা কিছুটা হলেও সম্ভব হতো। নির্বাচন কমিশন যদি শক্তিশালী না হয়, নিরপেক্ষ না হয়, তাহলে সকলের কাছে গ্রহণয়োগ্য নির্বাচন করা কঠিন হবে।

গতকাল রোববার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ভয়েস নেটওয়ার্ক আয়োজিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাবনা এবং চ্যালেঞ্জ শীর্ষক সেমিনারে তিনি একথা বলেন। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন নেটওয়ার্কের চেয়ারপারসন ও ডাকসু নির্বাচনের চীফ রিটার্নিং কর্মকর্তা ড. জসিম উদ্দিন এবং সঞ্চালনা করেন নেটওয়ার্কের সদস্য সচিব ও এটিএন বাংলার চীফ রিপোর্টার একরামুল হক সায়েম। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্ট্যাটিস বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সাহাবুল হক। ভয়েস নেটওয়ার্ক সম্পর্কে প্রেজেন্টেশন দেন এ নেটওয়ার্কের জাতীয় সমন্বয়ক রাকিবুল ইসলাম খান। এদিন সংস্থাটির আত্মপ্রকাশ ঘটে।

ড. মজুমদার বলেন, গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য কাঠামোগত সংস্কার খুবই প্রয়োজন। তিনি আশা করেন যে গণভোটে সংস্কার প্রস্তাব হ্যাঁ ভোট পাস হবে এবং কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমেই গণতন্ত্রের পথে উত্তরণ ঘটবে। তিনি ভয়েজ নেটওয়ার্ককে ধন্যবাদ দিয়ে বলেন ভয়েজ নেটওয়ার্ক শুধু পর্যবেক্ষণের মধেই সীমাবদ্দ না থেকে গবেষণা, এডভোকেসি ইত্যদিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে যা গণতন্ত্রকে সংহত করতে সহায়তা করবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়িত্বশীল ভুমিকা ও রাজনৈতিক সমঝোতার কথা বলেছেন তিনি।

নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলি বলেন, নির্বাচন পরিচালনা একটি জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। কোন রাজনৈতিক দলের অধীনে বিগত দিনে কোন নির্বাচন সুষ্ঠু হয় নাই। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আগামী নির্বাচনে অবৈধ টাকা ও বৈধ-অবৈধ অস্ত্র ব্যবহাররোধ করতে হবে। এই ক্ষেত্রে নির্বাচনী বিধিমালা প্রয়োগে কঠোর হওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি সমতল মাঠ প্রস্তুত করে রাজনৈতিক দল ও জনগণের মাঝে দূরত্ব কমানোর জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান।

আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব যুবায়ের বলেন, নির্বাচন কমিশন এখনও নিরপেক্ষ ও দক্ষতার পরিচয় দিতে পারে নাই। প্রশাসন ও নির্বাচন কর্মকতা নিয়োগে নিরপেক্ষতার পরিচয় আমরা এখনও পাই নাই। মানুষ মনে করে যে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন কোন একটি দলের প্রতি পক্ষপাতপূর্ণ আচরণ করছে। তাই প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জাতির প্রত্যাশা অনেক বেশী। তার আলোকে অনেক সংস্কার সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনকে সুষ্ঠু করতে কমিশন ও সরকারের দায়িত্ব অনেক বেশী। তিনি প্রতিজ্ঞা করে বলেন, আমি ও আমার দল এই নির্বাচনে দায়িত্বশীল আচরণ করব। কোন ধরণের অনিয়ম করব না এবং কাউকে অনিয়ম করহে দিবও না যাতে আগামী নির্বাচন ইতিহাসের সেরা নির্বাচন হয়।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভের পরও এই দেশে নির্বাচনী দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ হলো না। উপদেষ্টা পরিষদে যারা আছেন তারা যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন তাহলে নিয়ম অনুযায়ী নির্দিস্ট সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন যে রাজনৈতিক দল ও নেত...বৃন্দের সাথে আলোচনা করে নির্বাচনী সিমানা নির্ধারণ করা উচিত। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনী নিয়োগের ক্ষেত্রে বেসরকারী কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়ার একটি আলোচনা হয়েছিল যা সুষ্ঠু নির্বাচনে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। এভাবে একটু একটু করে গণতন্ত্রের পথে উত্তরণ আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি বলেন, নির্বাচনে সিসি ক্যামেরা প্রয়োজন যাতে কেন্দ্র দখল বন্ধ করা যায়। ভোট কেন্দ্রের পরিবেশ ঠিক রাখার জন্য প্রিজাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসাররা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন না। এই ক্ষেত্রে সিসি ক্যামেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি আশা করেন, অভ্যূত্থান পরবর্তি বাংলাদেশে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে যা কেন্দ্র ভিত্তিক ভোট গণনা ও ফলাফল এলইডির মাধ্যমে প্রদর্শন করা হবে।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওয়ারেসুল করিম বলেন ৭০ এর নির্বাচন ছিল এই অঞ্চলের জন্য মাইলফলক যার মাধ্যমে স্বাধীন রাস্ট্রের জন্ম হয়েছিল। আবার ২০২৬ নির্বাচন এমনি একটি সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু এই সুযোগ কাজে লাগানের ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো পরিকল্পিত প্রপাগান্ডা যার মাধ্যমে ছোট ছোট দলগুলোকে নির্বাচনের আগেই হারিয়ে দেওয়া ও প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভুমিকা রাখতে না পারা। তিনি বিদ্যমান প্রছন্ন লেজিটিমিসি প্রতিরোধের কথা বলেন এবং গনতন্ত্রের বড় শত্রু হিসেবে সো কল্ড মেইনস্ট্রিমিং মিডিয়াকে দায়ী করে তাদের ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সেক্রেটারি সাইফুল হক বলেন, রেফারি হয়ে যদি খেলায় অংশগ্রহণ করে তাহলে সেই খেলা যেমন গ্রহণযোগ্যতা হারায়, তেমনি সরকারের কিছু উপদেষ্টা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে বলে শোনা যাচ্ছে। তা হলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তিনি আরও বলেন, আইন শৃংখলা বাহিনী এখনোও শৃংখলায় ফিরে নাই। তাই ইলেকশন কমিশন ও সরকারকে এই আস্থার জায়গা তৈরি করতে হবে। কালো টাকা, চরদখলের মত কেন্দ্র দখল ঘটে তাহলে সেই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে। সরকার, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দলকে আস্থায় নিতে পারলে আগামী নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করা যাবে।

উন্মোক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি অধ্যাপক দিল রওশন জিন্নাত আরা বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট দল ও সরকারের সাথে যুক্ত যেকোন ব্যক্তিকে আগামী নির্বাচন হতে বিরত রাখতে হবে। তারা নির্বাচন সংশ্লিষ্ঠ সকল প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিগত ১৫ বছরে ধ্বংশ করেছে। এ্ই প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংস্কার করতে হবে। এছাড়াও গণমাধ্যম আগামী নির্বাচনকে সুষ্ঠু করার ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়াও প্রতিটি কেন্দ্রে ক্যামেরার ব্যবস্থা করতে হবে যাতে নাগরিকগণ নিশ্চিন্তে ভোট কেন্দ্রে ভোট দিতে যেতে পারেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে এনায়াত হোসেন জাকারিয়া, স্টিয়ারিং কমিটির সভাপতি শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন এবং অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ারর আশাবাদ ব্যক্ত করেন।