কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে কন্টেন্ট ক্রিয়েটর রাকিব হাসান হত্যাকা-ের নেপথ্যে নারী ও মাদক নিয়ে দ্বন্দ্বের তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশ ও নিহতের স্বজনদের কাছ থেকে প্রাথমিক এ তথ্য জানা গেছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হত্যাকা-টি পূর্বপরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছে। নেপথ্যে এক তরুণীকে নিয়ে বিরোধের প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেলেও জড়িত আসামীদের গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। তাদের গ্রেফতার করা গেলে হত্যার কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। ঘাতকদের ধরতে ইতোমধ্যে শাহবাগ থানার একাধিক টিম কাজ করছে।
এ বিষয়ে ডিএমপির রমনা বিভাগের উপ পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলম বলেন, “শহীদ মিনারে এমন নৃশংস হত্যার ঘটনাটি আমরা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি। তবে, এখনও হত্যার মোটিভ বলার মতো অবস্থা তৈরি হয়নি। হত্যার ঘটনায় জড়িত আসামীদের গ্রেফতারে আমরা অভিযানে আছি।”তিনি আরও বলেন, “হত্যার পেছনে নারী গঠিত দ্বন্দ্ব থাকতে পারে বলে আমরা মনে করছি। তবে, ওই নারীর পরিচয় এখনও আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি। আমাদের কাজ চলছে।”
গতকাল রবিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে শহীদ মিনারের ভেতরে রাকিব হাসানকে প্রথমে কুপিয়ে জখম ও পরে গুলী করে পালিয়ে যায় ঘাতকরা। ওই সময় উপস্থিত পথচারীরা ধাওয়া করে হত্যাকা-ে জড়িত শিহাব উদ্দিন নামে এক তরুণকে আটক করে। পরে তাকে শাহবাগ থানা পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
স্বজনরা বলছেন, জান্নাত নুর নামের খুলনার এক নারী কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ও তার বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে মাদক সংক্রান্ত দ্বন্দ্বের জেরে একাধিকবার হত্যার হুমকি পেয়েছিলেন রাকিব।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক শিহাব পুলিশকে জানিয়েছেন, এক তরুণীর ডাকে খুলনা থেকে রবিবার সকালে তিনি ঢাকায় আসেন। এরপর বিকাল ৩টা থেকে শহীদ মিনারে অপেক্ষা করতে থাকেন। তাকে ডেকে আনা তরুণীর সঙ্গে দেখা না হলেও শহীদ মিনারে বসে গাঁজা সেবনরত তিন যুবকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তবে, তাদের নাম পরিচয় জানেন না বলে দাবি করেন তিনি।
শিহাব পেশায় বাস চালক। তিনি খুলনা শহর থেকে সাতক্ষীরা রুটে চলাচল করা লোকাল বাসের চালক বলে দাবি করেন। আব্বাস পরিবহনের একটি বাসের বদলি চালক হিসেবে ঢাকায় এসেছেন বলে জানান এ তরুণ।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে শিহাব জানায়, মাত্র তিন দিন আগে ফেসবুকের মাধ্যমে ‘সুমাইয়া’ নামের এক তরুণীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সেই সুমাইয়ার ডাকেই তিনি ঢাকা আসে এবং দেখা করতে শহীদ মিনারে যান। সেখানে অবস্থানকালে কয়েকজন যুবকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়, যারা টাকার বিনিময়ে তাকে একটি বিশেষ কাজে সহায়তার প্রস্তাব দেয়। তারা শিহাবকে বলে, ‘আমরা এখানে একটি ছেলেকে মারবো, তুমি শুধু আমাদের সঙ্গে থেকে ওই ছেলেকে ধরতে সাহায্য করবা।’
শাহবাগ থানা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, হত্যার উদ্দেশে কন্টেন্ট ক্রিয়েটর রাকিবের ওপর হামলার সময়ে আটক শিহাব ছুরিকাঘাত করার কথা স্বীকার করেছে। তাকে হত্যায় জড়িত বাকিদের পরিচয় সম্পর্কে কোনও তথ্য জানে না বলে জানান তিনি।
এদিকে, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া রাকিবের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেছে পুলিশ। সুরতহাল প্রতিবেদনে দেখা যায়, রাকিবের শরীরে ডান পাশের বগলের নিচে ধারালো অস্ত্রের কোপে সাড়ে পাঁচ ইঞ্চি পরিমাণ গভীর ক্ষত হয়েছে। এর ঠিক কিছুটা নিচে রয়েছে আরও একটি সাত ইঞ্চির ক্ষত। এছাড়া পেটের ডান পাশে পাঁচ ইঞ্চি ও বাম পাশে আড়াই ইঞ্চির কোপসহ শরীরের অন্তত পাঁচটি স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। শরীরের এসব ক্ষত ছাড়াও রাকিবের পেটের বাম পাশে এবং পিঠে গুলীর চিহ্ন শনাক্ত করা হয়েছে।
নিহত রাকিবের মা রাজিয়া বেগম হাসপাতালের মর্গের সামনে সন্তানকে হারিয়ে আহাজারি করছিলেন। তিনি বলেন, “আমার ছেলে পরশু বিকালে আমার কাছে এসে ভাত চায়। তখন আমি রান্না করছিলাম। অপেক্ষা করতে বলায় বাসা থেকে বের হয়ে যায়। আমার ছেলেটা অনহারে আমার কাছ থেকে চলেই গেলো। আমার ছেলেটাকে সন্ত্রাসীরা কেড়ে নিলো। তার সঙ্গে কারও কোনও শত্রুতা ছিলো না। কোনও ঝগড়া বিবাদ ছিলো না। কেন আমার ছেলেকে তারা কেড়ে নিলো।”তিনি আরও বলেন, “আমার এক ছেলে এক মেয়ে। আমি শেখ বোরহানউদ্দিন পোষ্ট গ্রাজুয়েট কলেজের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক শাখায় চাকরি করি। আমার স্বামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কুয়েত মৈত্রী হলে অফিস সহায়ক হিসেবে চাকরি করেন। শেখ বোরহানউদ্দিন পোস্ট গ্রাজুয়েট কলেজেই আমার ছেলেকে ভর্তি করিয়েছি। সে সেখানে ডিগ্রী ২য় বর্ষে পড়াশোনা করছে। ২০২১ সালে আমার ছেলে বিয়ে করেছে। তার স্ত্রীসহ একসঙ্গে থাকে। আমার ছেলের রক্ত দিয়া শহীদ মিনার লাল করছে। আমি এ হত্যার বিচার চাই।”